উপন্যাস-বৃষ্টির ওপাশে আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
০৩, জুলাই ২০২৬
পর্ব–৫ : বৃষ্টির ওপাশে আলো
ওই রাতে অভিকের ঘুম হয় নাই ঠিকমতো। বুকের ভিতর কেমন চাপ চাপ লাগতেছিল। কয়েকবার পাশ ফিরল। নিশি টের পাইছিল, কিন্তু কিছু কয় নাই। অভিকও না।
ভোরে আজান হইতেই উইঠা পড়ল। গামছাটা কাঁধে নিতেই নিশি বলল, “আজ না গেলেই হয় না?”
অভিক জুতা পরতে পরতে কইল, “এক দিন না গেলে কিছু হয় না। কিন্তু ওই দিনের টাকাটা আর আসে না।”
নিশি আর কিছু কইল না। শুধু দরজায় দাঁড়ায়ে থাকল। অভিক গলির মোড় পেরোলেই ভিতরে গেল।
গ্যারেজে ঢুকতেই রহমত চাচা কইল, “কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ... চলতেছে।”
লোকটা কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকায়ে থাকল। তারপর চুপচাপ রিকশার চাবিটা দিল।
সকালটা মোটামুটি গেল। দুই-একটা ভালো ভাড়া পাইল। দুপুরের পর আবার বৃষ্টি।
একটা ছোট ছেলে মায়ের পাশে বইসা রিকশা থিকা হাত বাড়ায়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতেছে। দেখে অভিকের মাইশা আর মিমের ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। ওরাও এমন করত। তখন বকত। আজ মনে হইল, ওই বকাগুলাও কত আপন ছিল।
রিকশা চলতেছে। হঠাৎ বুকের মাঝখানে এমন ব্যথা উঠল যে হ্যান্ডেলটা শক্ত কইরা ধরা লাগল। মনে মনে কইল, আরেকটা ভাড়া... তারপর বাড়ি।
কিন্তু শরীর মানল না। চোখের সামনে সব ঝাপসা। তাড়াতাড়ি রিকশাটা সাইডে থামাইল। নামতেই হাঁটু ভাইঙা বইসা পড়ল।
বৃষ্টি পড়তেছে। মুখ ভিজতেছে। কীসের পানি, বুঝা যায় না।
রহমত চাচা দৌড়ায়ে আসল। “অভিক! কী হইছে?”
অভিক শুধু বুকের উপর হাত চাইপা ধরল। কথা বাইর হইল না।
কয়েকজন আগায়ে আসল। একজন মোবাইল বের করল। আরেকজন কইল, “তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেন।”
খবর পাইয়া নিশিরা হাসপাতালে পৌঁছাইতে বিকাল। অভিক তখন স্ট্রেচারে। চোখ খুইলা নিশিরে দেইখা দুর্বল গলায় কইল, “ভয় পাইছ?”
নিশি শুধু মাথা নাড়ল। কথা কইতে পারল না।
ডাক্তার বাইরে আইসা কইল, “আপাতত বিপদ কাটছে। কিন্তু আর রিকশা চালানো যাবে না। ওনার হার্ট এইটা নিতে পারবে না।”
কথাটা শুইনা চারজনই চুপ। হাসপাতালের করিডোরে খালি বৃষ্টির শব্দ।
বাড়ি ফিরতে দুই দিন লাগল। অভিক এখন বেশির ভাগ সময় বারান্দায় বইসা থাকে। প্রথম দিকে খুব অস্বস্তি লাগত। মনে হইত, কিছুই করতে পারতেছে না।
একদিন সকালে দেখল নিশি সেলাই করতেছে। মাইশা টিউশনি পড়াইতে বাইর হইতেছে। মিম ল্যাপটপ খুইলা অনলাইনে ক্লাস নিতেছে।
ঘরটা আগের মতোই ছোট। কিন্তু সবাই নিজের মতো সংসারটা ধইরা রাখার চেষ্টা করতেছে।
বিকালে মাইশা চা আইনা বাপের পাশে বসল। “একটা কথা কমু?”
“ক।”
“সবসময় তুমি আমাগো ধইরা রাখছ। এইবার আমাগোরেও একটু রাখতে দাও।”
অভিক কিছু কইল না। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠতেছে। শুধু মেয়ের মুখের দিকে তাকায়ে থাকল।
মিমও আইসা পাশে বসল। হাইসা কইল, “তুমি খালি ওষুধগুলা টাইমমতো খাইবা। বাকিটা আমরা দেইখা নিমু।”
অভিক এইবার হাইসা ফেলল। চোখ ভিজা উঠছিল। লুকানোর চেষ্টাও করল না।
সন্ধ্যার দিকে আবার বৃষ্টি। বারান্দায় দাঁড়ায়ে চারজনই বাইরে তাকায়ে আছে। কেউ কিছু কয় না। তাও নীরবতাটা আগের মতো ভারী লাগে না।
অভিক আস্তে কইরা নিশির হাতটা ধরল। কইল, “এতদিন ভাবতাম, সংসারটা আমি একাই টানতেছি।”
নিশি হালকা হাসল, “সংসার কখনো একজনের না। এই কথাটাই বুঝতে দেরি হইয়া গেছে।”
দূরে মাইশা আর মিম বৃষ্টিতে ভেজা কাপড় তুলতেছে। হাসতে হাসতে নিজেদের মধ্যে কী জানি কয়।
অভিক চুপচাপ ওদের দিকে তাকায়ে থাকল। মনে হইল, বৃষ্টি এখনো পড়তেছে। কিন্তু আগের মতো আর ভয় লাগতেছে না।
কারণ জানে, এই বাড়িতে এখন কেউ একা না।
---------------------------সমাপ্ত---------------------------
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।