অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ৫: যে চিঠিগুলো কেউ লিখত না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় দরজার নিচ দিয়ে একটা নীল খাম গলে আসত। ডাকটিকিট নেই। প্রেরকের নাম নেই। ঠিকানা শুধু এক লাইন: অভিক, ১৩/বি, কলাবাগান। কাগজটা খসখসে, একটু পুরোনো গন্ধ। মনে হতে পারে বহু বছর কোনো স্টিলের আলমারির ভেতর পড়ে ছিল।
অথচ গত মাসে কুদ্দুস চাচা গেটে সাইকেল থামিয়ে বললেন, বাবা, আমি এই এলাকায় বিশ বছর ধরে চিঠি বিলি করি। তোমার নামে একটা পোস্টকার্ডও তো কোনোদিন আসেনি। রেজিস্টারে তোমার নামই নেই, পুরোনো খাতায় দেখেছি।
প্রথম চিঠি। ছয় মাস আগের কথা।
কলিং বেল বাজেনি। দরজার নিচে পড়ে ছিল। আমি তুলে নিলাম। খামের মুখ আঠা দিয়ে বন্ধ না, শুধু ভাঁজ করা। আঙুলের ছাপ লেগে আছে কোণায়।
ভেতরে একটা কাগজ। এক লাইন। হাতের লেখা আমার না। একটু কাঁপা কাঁপা, বয়স্ক মানুষের মতো টান।
আজ ছাতা নিস। ভিজে যাবি।
সকালে আকাশ ফকফকা। জুন মাসের গরম। নিশি হাসল, পাগল। ছাতা নিয়ে কে বের হয় এখন?
তবু নিয়েছিলাম। অফিস ব্যাগের সাইড পকেটে গুঁজে রাখলাম। কারওয়ান বাজারের সিগন্যাল জ্যাম।
দুপুর দুইটায় অফিসের কাঁচের জানালা সাদা হয়ে গেল। ঝুম বৃষ্টি। সাথে দমকা বাতাস। নিচে রিকশাগুলো পলিথিন টানছে। যারা ছাতা আনেনি, তারা ক্যান্টিনে আটকা পড়ল। আমি শুকনো শরীরে বাসায় ফিরলাম। জুতাটাও ভেজেনি।
সেদিন রাতে চিঠিটা আবার পড়লাম। বুকের ভেতর কেমন শিরশির করল। কে আমার এত খেয়াল রাখে? কলিগরা জানে না আমি বৃষ্টিতে ভিজতে চাই না।
এরপর প্রতি বৃহস্পতিবার। ঠিক চারটায়। সেকেন্ডের কাঁটা মিলে যায় ঘড়ির সাথে।
মিটিংয়ে আজ কম কথা বলিস। সাহেবের মুড খারাপ। কফি ছলকে পড়তে পারে।
সেদিন জিএম স্যার সত্যিই তিনজনকে ধমকেছিলেন। প্রজেক্ট ফাইল ছুড়ে ফেলেছিলেন। আমি চুপ ছিলাম, রিপোর্টটা পরে মেইল করেছিলাম।
নিশির জন্য বেলি ফুল নিস। ওর মন খারাপ। মায়ের ওষুধ শেষ।
নিশি সেদিন মায়ের সাথে ফোনে ঝগড়া করে অফিস থেকে ফিরেছিল। বেলি ফুলের মালাটা খোঁপায় গুঁজে ও প্রথমবার আমার বুকে মাথা রেখে কেঁদেছিল। গন্ধটা এখনো মনে আছে।
আমি নিশিকে বললাম। ও প্রথমে উড়িয়ে দিল।
তোমার কোনো গোপন ফ্যান। ক্রাশ খেয়েছে। অফিসের নতুন ইন্টার্ন মেয়েটা হতে পারে।
আমি হাসলাম। কিন্তু বুকের ভেতর খচখচ করছিল। কে? কেন? কী চায়?
বাবাকে দেখালাম একদিন। বাবা চশমার উপর দিয়ে খামটা ধরলেন। ডান হাতে কাঁপুনি। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন হাতের লেখার দিকে। টেবিলে রাখা চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেল। তারপর আস্তে করে বললেন, এই লেখাটা... আমি চিনি। অনেক বছর আগে... তোর দাদার ডায়েরিতে দেখেছি মনে হয়।
কার লেখা বাবা?
বাবা চশমা খুলে চোখ মুছলেন। লেন্স ঘোলা হয়ে গেছে। না। ভুল হচ্ছে আমার। বয়স হয়েছে। বাদ দে। প্রেশারের ওষুধটা দে।
সমস্যা শুরু হলো যেদিন পোস্ট অফিসে গেলাম। নীলক্ষেত পোস্ট অফিস।
কুদ্দুস চাচা রেজিস্টার খাতা বের করলেন। মোটা খাতা। ধুলো পড়া। পাতাগুলো হলদে।
এই দেখো বাবা। ১৩/বি। গত দুই বছরে শুধু বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, আর ব্র্যাক ব্যাংকের চিঠি। তোমার নামে পার্সোনাল চিঠি একটাও না। আমরা রেকর্ড রাখি, সিল মেরে রাখি। ভুল হয় না।
আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। গরমে ঘেমে গেছি।
আপনি মিথ্যা বলছেন! আমি নিজের হাতে পাই! প্রতি সপ্তাহে! এই বৃহস্পতিবারও পেয়েছি!
চাচা শান্ত গলায় বললেন, বাবা, আমি মরা মানুষ নিয়ে মিথ্যা বলি না। আল্লাহ সাক্ষী। গত মাসে আমার বউ মারা গেছে।
বাসায় ফিরলে নিশি দরজা আটকাল। চোখ লাল।
অভিক, সত্যি করে বলো তো। তুমি ভোরে হাঁটতে যাও। ছয়টায়। ফিরে এসে বলো ‘চিঠি এসেছে’। আমি তো কোনোদিন দেখিনি কেউ দিয়ে গেছে। দারোয়ানও দেখেনি। সিসি ক্যামেরা লাগাব? তুমি নিজেই লিখে নিজেই দরজার নিচে রাখো না তো? স্ট্রেস থেকে?
আমি চিৎকার করলাম, আমি পাগল? আমি নিজে লিখে নিজে পড়ব? আমার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই?
বাবা সেদিন প্রথম আমার গায়ে হাত তুললেন না, কিন্তু চোখে জল নিয়ে বললেন, তোর মায়ের মতো হোস না বাবা। দয়া কর। ডাক্তার দেখা। আমার বয়স হয়েছে, আর নিতে পারি না।
মা। মা মারা গেছেন দশ বছর। সিজোফ্রেনিয়া ছিল। শেষ বয়সে বলতেন, দেয়ালে ছায়া হাঁটে। বাথরুমের আয়নায় অন্য কেউ তাকায়।
আমার পায়ের নিচ থেকে মেঝেটা সরে গেল।
ডা. সাবরিনা ইউসুফ। তিন মাস সেশন। গ্রিন রোডে চেম্বার।
আমি চিৎকার করতাম, আমি দেখেছি! বৃষ্টি মিলেছে! বসের রাগ মিলেছে! ফুলের কথা মিলেছে! এটা কো-ইনসিডেন্স না!
ডাক্তার শান্ত গলায় বলতেন, অভিক, আপনার ব্রেইন খুব বুদ্ধিমান হতে পারে। একে বলে ডিসোসিয়েটিভ অটোমেটিক রাইটিং। আপনি স্ট্রেসে থাকেন। একাকিত্বে ভোগেন হয়তো। আপনার অবচেতন মন আপনার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল হয়ে যায়। সে আপনাকে চিঠি লেখে। তারপর আপনার কনশাস মাইন্ড সেটা ভুলে যায়। আপনি ভাবেন অন্য কেউ লিখেছে। ডায়েরি লেখার মতো, কিন্তু মনে থাকে না।
প্রেডিকশন?
প্যাটার্ন। আপনি সকালে অফিসের গ্রুপে দেখেছেন বস @all লিখে রাগের ইমো দিয়েছে। আপনি খেয়াল করেননি। কিন্তু অবচেতন মন করেছে। সে-ই আপনাকে ওয়ার্ন করেছে। আবহাওয়া অ্যাপে আপনি না তাকালেও ‘হিউমিডিটি ৮০%’ লেখাটা চোখের কোণে পড়েছে। ব্রেইন হিসাব করেছে। বৃষ্টি হবে।
আমি মানতাম না। ওষুধ দিলেন। রিসপেরিডন ২ মিগ্রা। সাথে ঘুমের ওষুধ।
প্রথম দুই সপ্তাহ আমি মানুষ ছিলাম না। ঝাপসা। সারাদিন ঘুম পায়। বুকের ভেতর হাহাকার। মনে হতো আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। রাতে ঘুম ভাঙত। দরজার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। অপেক্ষা করতাম।
চিঠি আসত না। বৃহস্পতিবারগুলো খালি। নিঃশব্দ। ঘড়ির টিকটিক শব্দটা বেশি জোরে লাগত।
তৃতীয় সপ্তাহে আমি ওষুধ ফেলে দিলাম কমোডে। ফ্লাশ করলাম।
বৃহস্পতিবার বিকেল চারটা। খুট করে একটা শব্দ। খুব মৃদু। দরজার নিচে নীল খাম।
আমি কাঁপা হাতে তুললাম। খুলে পড়লাম: এতদিন কই ছিলি? চিন্তা হচ্ছিল। শরীর খারাপ? পানি খা।
আমি মেঝেতে বসে পড়লাম। হাসছি, কাঁদছি। টাইলস ঠান্ডা। আমি পাগল না। ও আছে। ও সত্যি আছে। আমার ব্রেইন আমাকে ভুলে যায়নি।
নিশি আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখে পানি। ঠিক আছে। আমি কাল তোমার সাথে ভোরে হাঁটব। আমরা একসাথে দেখব কে দেয়। দারোয়ানকে বলব জেগে থাকতে।
পরদিন ভোর পাঁচটা। আমরা হাঁটলাম। ধানমন্ডি লেকের পাড়। গলির চায়ের দোকান খুলেছে। ফেরিওয়ালা হাঁক দিচ্ছে। কেউ না। কেউ আমার দিকে তাকাল না। ফুলওয়ালা গোলাপ বেচছে।
বাসায় ফিরলাম ছয়টায়। দরজার নিচে নীল খাম। শুকনো। নতুন। ভাঁজে কোনো ধুলা নেই।
নিশির মুখ কাগজের মতো সাদা। অভিক... আমরা তো একসাথে ছিলাম। তুমি কখন... হাতে তো কিছু ছিল না।
আমি নিজেও জানি না। আমার পকেটে কলম নেই। বাসায় নীল কাগজ নেই গত ছয় মাস। শুধু এফোর সাদা কাগজ।
সেদিন থেকে নিশি আর তর্ক করেনি।
আরও ছয় মাস।
আমি এখন মানি। ডাক্তার ঠিক। আমিই লিখি। হয়তো ঘুমের মধ্যে। স্লিপওয়াকিং। হয়তো জেগে থেকেই, কিন্তু মেমরি সেভ হয় না। ব্রেইনের কোনো একটা অংশ ডিসকানেক্ট হয়ে যায়।
ওষুধ এখন অর্ধেক ডোজ। রিসপেরিডন ১ মিগ্রা। চিঠি আসে মাসে একবার। শেষবার লিখেছিল: তোর প্রমোশন হবে। মিষ্টি কিনিস। দই। সত্যি প্রমোশন হয়েছে। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ।
নিশি চিঠিগুলো একটা কাঠের বাক্সে রাখে। শান্তিনগর থেকে কেনা। ও বলে, এটা তোমার সাবকনশাস। ও তোমাকে আমার চেয়েও ভালো বোঝে। ওকে ভয় পেও না। ওকে বন্ধু ভাবো।
আমি সুস্থ। অফিস করি। হাসি। বাবা এখন নিশ্চিন্ত। রায়ান হয়েছে আমাদের। দুই বছর বয়স। বাবা ওকে নিয়ে ছাদে ঘুড়ি ওড়ায়।
গত বৃহস্পতিবার। শেষ চিঠি।
আমি বুঝেছিলাম এটাই শেষ। কারণ আমার আর গাইড দরকার নেই। আমি নিজেকে সামলাতে শিখেছি। থেরাপি কাজ করেছে। খামটা হাতে নিয়ে বারান্দায় বসলাম। রেলিংয়ে কাক বসে ছিল।
বুক কাঁপছিল। বিদায় জানাতে কষ্ট হয়। সে আমার বন্ধু, আমার বাবা, আমার মা, সব। আমার হারিয়ে যাওয়া অংশ।
খুললাম।
এক লাইন। হাতের লেখা আমার। প্রতিটা টান, প্রতিটা মাত্রা আমার। কলেজের খাতার লেখার মতো। আমি চোখ বন্ধ করেও এই লেখা চিনব। আঙুল বুলিয়ে বুঝব।
কিন্তু আমি লিখিনি। গত এক সপ্তাহে আমি কলম ধরিনি। কসম। ল্যাপটপে টাইপ করি সব।
লেখা:
তুই এখন সত্যিটা জেনে গেছিস। আমার আর দরকার নেই। বিদায়। নিজের খেয়াল রাখিস।
আমার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল। হাওয়া নেই, তবু কাগজটা উড়ে গিয়ে ফ্যানের নিচে পড়ল। চরকির মতো ঘুরল।
নিশি ছুটে এল। কী হয়েছে? কী লেখা? মুখে আটা মাখা।
আমি কথা বলতে পারছিলাম না। শুধু জানালা দিয়ে বাইরে দেখালাম। গলা শুকিয়ে গেছে।
গলির মোড়ে কুদ্দুস চাচা। হাতে পুরোনো চামড়ার ব্যাগ। কাঁধে ঝোলানো। পরনে খাকি ড্রেস, একটু ফ্যাকাসে। সাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে হাসলেন। দাঁত নেই সামনে। ডান হাতটা তুলে নাড়লেন। যেন বলছেন, কাজ শেষ। এবার যাই। ডিউটি শেষ।
তারপর সাইকেল ঘুরিয়ে গলির ভেতর ঢুকে গেলেন। বেল বাজাননি।
নিশি ফিসফিস করল, কে উনি? নতুন দারোয়ান?
আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। পানি খেতে হবে।
কুদ্দুস চাচা। আমাদের পুরোনো ডাকপিয়ন। বিশ বছর চিঠি দিয়েছে।
নিশি আমার হাত চেপে ধরল। ওর হাত ঠান্ডা। কিন্তু... কিন্তু উনি তো...
হ্যাঁ। উনি তো দুই বছর আগে মারা গেছেন। হার্ট অ্যাটাক। সকালে বাজারে যাওয়ার পথে। পোস্ট অফিসের নতুন পিয়ন মিজান ভাই মিলাদের দিন আমাকে নিজে বলেছিল। জিলাপি দিয়েছিল।
আর আজ? আজ শনিবার। বৃহস্পতিবার না। ক্যালেন্ডারে লাল দাগ দেওয়া।
আমি আর নিশি দৌড়ে নিচে নামলাম। সিঁড়ি ভেঙে। গলি ফাঁকা। সাইকেলের টায়ারের দাগও নেই। রোদ চড়া। বৃষ্টি হয়নি, তবু রাস্তার এক কোণে একটুখানি পানি। ড্রেনের পাশে। তার পাশে ভেজা স্যান্ডেলের ছাপ। একটা।
শুধু একটা। যেন কেউ এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাম পায়ের ছাপ। বুড়ো আঙুলের দাগ স্পষ্ট।
(চলবে… গল্প ৬: যে কথাগুলো শুধু ছেলেটা শুনত)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।