সময় হলে বলা যায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৫ জুন, ২০২৬
অভিকের বাবা একটা কথা প্রায়ই বলতেন। “রাগ হলে আগে চুপ থাক। পরে যা বলার বলিস।”
ছোটবেলায় কথাটা শুনলে মেজাজ খারাপ হতো। অন্যায় দেখলে তখনই জবাব দেওয়া দরকার, তাই না? অপেক্ষা মানেই তো হার মেনে নেওয়া। বড় হয়ে অবশ্য বুঝেছিল, সব জায়গায় গলা চড়ালে কাজ হয় না। বরং কখনও কখনও শব্দ যত বাড়ে, কান ততই বন্ধ হয়ে যায়।
বাবার পুরোনো ছাপাখানাটা এখন আর আগের মতো চলে না। শহরে পোস্টারের কদর কমেছে। লিফলেটের অর্ডার আসে মাসে দু-একটা, তাও নির্বাচন এলে। তবু রফিক চাচা প্রতিদিন সকাল সাতটায় শাটার তোলেন। হাইডেলবার্গ মেশিনটার গায়ে হাত বুলিয়ে ধুলো ঝাড়েন। দেখলে মনে হয়, অসুস্থ বন্ধুর খোঁজ নিচ্ছেন।
বাবা চলে যাওয়ার পর প্রেসটা অভিকই দেখে। ব্যবসা বলতে যা বোঝায়, সেটা নেই। মাস শেষে কর্মচারীর বেতন আর বিদ্যুৎ বিল মিটিয়ে হাতে থাকে কয়েক হাজার। তবু ছাড়তে পারেনি। দেওয়ালে ঝোলানো বাবার কালি-লাগা অ্যাপ্রনটা এখনও আছে। ওটার গন্ধে বাড়ির কথা মনে পড়ে।
এক বিকেলে ক্যাশবই ঘাঁটতে গিয়ে কেমন খটকা লাগল। গত দুই মাসে কাগজ কেনার খরচ লাফিয়ে বেড়েছে। ৭০ গ্রাম ডিমাই সাইজের রিম গত মার্চে ছিল ৪২০ টাকা, মে মাসে দেখাচ্ছে ৫৮০। প্রথমে ভেবেছিল লিখতে ভুল হয়েছে। কিন্তু ভুলটা পাতায় পাতায়। রফিক চাচা হিসাব দেখে কপাল কুঁচকালেন। “আমারও কয়দিন ধরে সন্দেহ হচ্ছিল রে।” অভিক কিছু বলেনি। খাতা তিনটা ব্যাগে ভরে বাসায় নিয়ে এল।
রাতে ভাত খাওয়ার পর ডাইনিং টেবিলে ক্যালকুলেটর নিয়ে বসল। নিশি জলের গ্লাস হাতে এসে দাঁড়াল। “আবার অফিসের কাজ?”
“অফিস না। প্রেসের।”
“কিছু গন্ডগোল?”
চোখ না তুলেই বলল, “হতে পারে।”
নিশি চেয়ার টেনে বসল। “তোমার এই ‘হতে পারে’ শুনলে গা জ্বলে।”
অভিক হেসে ফেলল। “না জেনে বলি কী করে?”
“তুমি কোনোদিনই বলো না।”
গলায় বিরক্তি ছিল। অভিক টের পেল। তবু চুপ করে রইল।
পরের কয়েক সপ্তাহ সে প্রায় কথা বন্ধ করে দিল। পুরোনো চালান বের করল। ব্যাংক স্টেটমেন্টের সাথে মিলিয়ে দেখল ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে গরমিল। পাইকারি কাগজের দোকান নিউ মার্কেটের ‘মিতালী পেপার’-এ গিয়ে খোঁজ নিল। আস্তে আস্তে ছবিটা পরিষ্কার হতে লাগল, তবে পুরোটা না-ও হতে পারে।
প্রেসের একজন পুরোনো লোক, নাম জলিল। বাবার আমলের কম্পোজিটর। সে-ই হয়তো বিলের মধ্যে হাত ঘুরিয়েছে। খুব অল্প করে। মাসে দুই-তিন হাজার। একবারে ধরার মতো না। কিন্তু দুই বছরের হিসাব জোড়া দিলে অঙ্কটা দাঁড়ায় প্রায় সত্তর হাজারের কাছাকাছি।
রাগ হয়েছিল। জলিলকে বাবা চাচা ডাকতেন। ঈদে বাসায় পাঠাতেন সেমাই-চিনি।
এক সন্ধ্যায় নিশি দেখল বারান্দায় দাঁড়িয়ে অভিক সিগারেট ধরায়নি, শুধু হাতে নিয়ে গুঁজে রেখেছে। কাছে গিয়ে বলল, “মাথা গরম?”
“হয়েছে একটু।”
“তাহলে কাল গিয়ে বলো।”
“এখন না।”
নিশি এবার সত্যিই রেগে গেল। “তোমার সমস্যা কী জানো? তোমাকে দেখলে মনে হয় কিছুই যায় আসে না।”
অভিক তাকাল। “আসে। খুব বেশি আসে।”
“তাহলে চেঁচাও না কেন?”
কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকল। রিকশার বেল, বাচ্চাদের চিৎকার। তারপর বলল, “চেঁচালে মনে হয় কথাটা হালকা হয়ে যায়।”
নিশি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “তোমাকে বোঝা যায় না।”
“আমি নিজেই কি সবসময় বুঝি?”
কথাটা শুনে নিশির ঠোঁটের কোণে হাসি এল। রাগটা পুরো কাটেনি, তবে ধার কমে গেল।
আরও বারো দিন পর সব কাগজ গুছিয়ে জলিলকে ডাকল। ছোট অফিসঘর। টেবিলের কোনায় বাবার সাদা-কালো ছবি, ফ্রেমে কালির ছিটা লেগে আছে। জলিল প্রথমে অস্বীকার করল। “আমি ক্যান করমু স্যার?” অভিক কথা বাড়াল না। একটা একটা করে চালান, ব্যাংকের ডেবিট স্লিপ, আর নিজের হাতে করা হিসাবের নোট সামনে রাখল। ঘরটা ভারী হয়ে এল। ফ্যানের শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
অভিক গলা চড়ায়নি। গালিও দেয়নি। শুধু বলেছিল, “প্রথম দিন এসে বললে হয়তো ব্যাপারটা এতদূর গড়াত না।”
জলিল মাথা নিচু করে বসে রইল। ওঠার সময় দেখল, লোকটার লুঙ্গির কোণ ভেজা। চোখে জল, নাকি ঘাম—বোঝা গেল না।
রফিক চাচা পরে বললেন, “মামলা করতে পারতি।”
অভিক জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। “পারতাম।”
“করলি না ক্যান?”
একটু চুপ করে থেকে বলল, “শাস্তির আগে মানুষটা কেমন, সেটা দেখতে চেয়েছিলাম।”
চাচা আর কিছু বলেননি। শুধু মেশিনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলেন, “তোর বাপের মতোই হইছস।”
সেদিন বাসায় ফিরতে রাত সাড়ে দশটা। নিশি দরজা খুলে দিল। “মিটেছে?”
জুতা খুলতে খুলতে বলল, “হ্যাঁ।”
“কী করলে?”
“বাকিটা সময়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।”
নিশি আর ঘাঁটাল না। চুপচাপ চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। আদা দেওয়া, কড়া লিকার।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিল অভিক। রাস্তায় সোডিয়াম লাইট। একটা ভাঙা সিএনজি ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে দুজন। হঠাৎ মনে পড়ল স্কুলের ঘটনা। ক্লাস সেভেনে পড়ে। কে যেন টিফিন কেড়ে নিয়েছিল। বাড়ি এসে বাবাকে বলেছিল, “কাল ওরে দেখে নেব।” বাবা তখন মেশিনে কালি লাগাচ্ছিলেন। হাতের তালু কালো। হেসে বলেছিলেন, “দেখে নিস। সমস্যা নাই। কিন্তু আগে ঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানাস না।”
সেদিন বোঝেনি। আজ রাতে, কাগজের হিসাব মেলাতে মেলাতে কথাটার ভার টের পেল। সব জবাব সঙ্গে সঙ্গে দিতে নেই। কিছু উত্তর সময়ের হাতে ছেড়ে দিলে হয়তো ওজন বাড়ে।
চায়ের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছিল। দেয়ালের ছবিটার দিকে তাকালে মনে হলো, বাবা তাকিয়ে আছেন। আর তার চোখে কালি-লাগা হাসিটা এখনও স্পষ্ট।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।