শ্বাসের ভেতর ফিরে আসা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০৮, ২০২৬
অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম—এই অভিজ্ঞতাটা লিখব। ইচ্ছে ছিল, কিন্তু লিখিনি। সময়ের অভাব বললে পুরোটা বলা হয় না; কিছু জিনিস আছে, লিখে ফেললেই যেন আবার সেগুলোর ভেতর দিয়ে হাঁটতে হয়। হয়তো সেই কারণেই দেরি। তবু আজ মনে হলো, না লিখলে বিষয়টা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
সেদিনের সকালটা আলাদা ছিল—এই কথাটা সহজ, কিন্তু ব্যাখ্যা করা কঠিন। সময় ছিল সকাল ১১টার অপারেশন। তার আগের কয়েক ঘণ্টা যেন একধরনের অপেক্ষা, যেখানে শব্দ কম, ইঙ্গিত বেশি। ঘরের ভেতর মানুষ—আত্মীয়, পরিচিত মুখ। কেউ চুপচাপ, কেউ অকারণে ব্যস্ত। কথাবার্তা হচ্ছিল, কিন্তু স্বাভাবিক ছিল না। মনে হচ্ছিল, সবাই কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছে—সরাসরি বললে হয়তো ভারী হয়ে যাবে।
সকাল আটটার দিকে একজন এসে শরীরের লোম শেভ করে দিলেন। কাজটা নিয়মিত, তবু তখন অদ্ভুত লাগছিল। নিজের শরীরটাকে নিজের মনে হচ্ছিল না—বরং একটা প্রস্তুত করা জিনিস, যেটাকে একটু পরেই অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া হবে।
নয়টার পর হঠাৎ একটা সীমা টানা হলো। দেখা নয়, কথা নয়। এই অংশটা খুব স্পষ্ট। এখান থেকেই আলাদা হয়ে যাওয়া শুরু—পুরোপুরি না, কিন্তু ধীরে ধীরে।
নার্স এসে অপারেশনের পোশাক দিলেন। দ্রুত গোসল করতে বললেন। পানি গায়ে পড়ছিল, কিন্তু মন অন্য কোথাও। একসাথে দুটো অনুভূতি হচ্ছিল—শান্তি আর ফাঁকা লাগা। এই দুইটা একসাথে থাকলে ঠিক আরামদায়ক লাগে না। গোসল শেষে প্রার্থনার জন্য সময় দিলেন। দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিছু বলেছিলাম নিশ্চয়ই—কিন্তু এখন মনে পড়ে না। মনে থাকার কথাও না।
দশটার দিকে একটা ওষুধ দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মাথা ভারী হয়ে এলো। চিন্তাগুলো ছিল, কিন্তু তাদের ধার কমে যাচ্ছিল—যেন সবকিছু একটু দূর থেকে দেখা।
দশটা ত্রিশে আমাকে ট্রলিতে তোলা হলো।
সামনে নার্সরা, পেছনে আমার পরিবার। স্ত্রী, দুই মেয়ে, আরও কয়েকজন। আমি তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু ভেতরে সাড়া খুব কম। এটা ভয় না—অথবা ভয়টা তখন কাজ করছিল না। হয়তো মাথা নিজেই কিছু অনুভূতি বন্ধ করে দেয়—নিজেকে বাঁচানোর জন্য।
অপারেশন থিয়েটারের সামনে থামানো হলো। বলা হলো, কিছু বলার থাকলে বলুন।
আমি তাকালাম। ছোট মেয়ে মাথায় হাত রাখল। বড় মেয়ের চোখ ভেজা। আমার স্ত্রী—চেষ্টা করছিল নিজেকে সামলাতে, কিন্তু পুরোটা পারছিল না।
আমার বলার মতো তেমন কিছু ছিল না। শুধু বললাম, “ওদের দেখ।”
কথাটা খুব আস্তে বের হয়েছিল—নিজের কাছেই ঠিক শোনা যাচ্ছিল কি না, নিশ্চিত নই।
তারপর দরজা খুলে গেল।
ভেতরে ঢোকার পর প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ল, তা আলো। খুব উজ্জ্বল, স্থির, প্রায় নির্দয়। আমাকে টেবিলে তোলা হলো। চারপাশে মানুষ—কিন্তু এখানে কেউ ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত না। সবাই নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এই জায়গায় আপনি মানুষ হিসেবে না, বরং একটি কেস হিসেবে উপস্থিত।
একজন ডাক্তার এগিয়ে এলেন। মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “ভয় লাগছে?”
আমি বললাম, “না।”
সত্যি বলেছি, না কি সহজ উত্তর দিয়েছি—এখন আর আলাদা করা কঠিন।
তিনি বললেন, “ভয় নেই, কষ্ট পাবেন না।”
তারপর গলার রগে ক্যানোলা বসাতে শুরু হলো। এখানে ব্যথা টের পেয়েছি—স্পষ্টভাবে। চাপ, টান, তারপর একধরনের জ্বালা। মনে হচ্ছিল, শরীরটা শেষবারের মতো প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। সেলাই করা হয়েছিল কি না—দেখিনি, তবে সেইরকম একটা টান অনুভব করেছিলাম।
ডান হাতে ইনজেকশন দেওয়া হলো। শরীরের ভেতর দিয়ে উষ্ণ কিছু ছড়িয়ে পড়ল—অস্বস্তিকর, কিন্তু দ্রুতই ছড়িয়ে গেল।
আলোগুলো একটু একটু করে ঝাপসা হয়ে এলো। শব্দগুলো দূরে সরে যাচ্ছিল—পুরোপুরি না, কিন্তু যেন পানির নিচে শোনা যাচ্ছে এমন। তারপর একসময় সবকিছু কেটে গেল।
চেতনা ফেরার সময়টা স্পষ্ট না। প্রথমে যা বুঝলাম, বাম হাতের আঙুলটা একটু নড়ছে। শরীরের বাকি অংশ তখনও যেন অনুপস্থিত।
কেউ বলল, “চোখ খুলুন, আস্তে।”
চোখ খুলে দেখি—আমার স্ত্রী। খুব কাছে দাঁড়িয়ে। দৃশ্যটা বাস্তব, কিন্তু মাথা সেটা বিশ্বাস করতে একটু সময় নিচ্ছিল।
ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, “চিনতে পারছেন?”
বলতে চাইলাম—পারলাম না। মুখের ভেতর একটা বড় নল। শব্দ আটকে গেল। আঙুল নেড়ে ইশারা করলাম।
তখনই বুঝলাম—বেঁচে আছি, কিন্তু পুরোপুরি নিজের ভেতরে ফিরে আসিনি।
গলার ভেতরের নলটা প্রচণ্ড অস্বস্তি দিচ্ছিল। আর পিপাসা—যেটা খুব দ্রুত প্রধান অনুভূতি হয়ে উঠল। শরীর পানি চাইছে, কিন্তু সেটা সম্ভব না।
একজন নার্স বললেন, “আপনি লাইফ সাপোর্টে আছেন।”
কথাটা কানে গেল, কিন্তু তখনও এর মানে পুরোটা ধরতে পারিনি।
পরে ধীরে ধীরে বুঝেছি—ওই মেশিনটা আমার হয়ে শ্বাস নিচ্ছিল। গলার ভেতরের টিউব দিয়ে অক্সিজেন ঢুকছে, বের হচ্ছে। নিজের ফুসফুস তখন একা কাজ করছিল না—অথবা পুরোটা পারছিল না।
এখানে একটা ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করে, লাইফ সাপোর্ট মানে মৃত মানুষকে চালিয়ে রাখা। অভিজ্ঞতা থেকে বলি, বিষয়টা বরং শরীরকে সময় দেওয়া—সে নিজে থেকে ফিরতে পারে কি না, সেটা দেখার জন্য।
অপারেশন শেষে আমাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল। ভেন্টিলেটরের সাহায্যে ধীরে ধীরে কিছু পরিবর্তন হচ্ছিল—অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ছিল, শরীর সাড়া দিচ্ছিল। এগুলো মনিটরে দেখা যাচ্ছিল, আমি শুধু অনুভব করছিলাম—ধীরে ধীরে ফিরে আসছি।
তিন দিন পর ভেন্টিলেটর সরানো হলো।
তিন দিন—শুনতে কম লাগে। ভেতর থেকে সময়টা একটু দীর্ঘই মনে হয়। আর এই সময়টার পর একটা জিনিস আলাদা করে টের পাওয়া যায়—শ্বাস নেওয়া আসলে কতটা মৌলিক।
এখন মাঝে মাঝে শ্বাস নেওয়ার সময় খেয়াল করি—এটা স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে। কোনো শব্দ নেই, কোনো মেশিন নেই।
এই নিঃশ্বাসটা তখনকার মতো ধার করা না—নিজের।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।