সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-১০
শেষ সাক্ষী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯ জুলাই, ২০২৬
খবরটা ছড়াতে বেশি সময় লাগেনি।
পাড়ার পুরোনো বাড়িটায় একজন ব্যবসায়ীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। সকাল থেকেই বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়। পুলিশ আসছে, যাচ্ছে। সবাই একটাই প্রশ্ন করছে—কী হয়েছে?
ঘটনাটা নিজের চোখে দেখেছিল মাত্র একজন।
আট বছরের একটা ছেলে।
তার নাম রিদম।
পুলিশ যতবার জিজ্ঞেস করেছে, সে ততবার একই কথাই বলেছে।
— উনি এখনো এখানেই আছেন।
কথাটা শুনে কেউ ভয় পেয়েছে, কেউ আবার হেসে উড়িয়ে দিয়েছে।
একজন পুলিশ সদস্য বিরক্ত হয়ে বললেন,
— বাচ্চাটা ভয় পেয়ে যা-তা বলছে।
সেদিন বিকেলে খবর পেয়ে অভিক আর নিশি সেখানে গেল। নিহত মানুষটার ছোট ভাইকে অভিক আগে থেকেই চিনত।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই চাপা একটা অস্বস্তি টের পাওয়া গেল। কেউ জোরে কথা বলছে না। সবাই যেন অপেক্ষা করছে, কিন্তু কিসের জন্য, সেটা কেউ জানে না।
রিদম এক কোণে বসে ছিল। মাথা নিচু।
নিশি গিয়ে তার পাশে বসল।
— তোমার নাম রিদম?
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
— সবাইকে একই কথা বলছ কেন?
রিদম ধীরে তাকাল।
— কারণ উনি এখনো এখানেই আছেন।
— কোথায়?
সে সিঁড়ির দিকেই আঙুল তুলল।
— ওপরে।
পুলিশ ইতিমধ্যে পুরো বাড়ি তল্লাশি করেছে। কেউ নেই।
তবু রিদম নিজের কথাই বলে যাচ্ছে।
বাড়ি ফেরার পথে অভিক বলল,
— যদি সত্যিই কিছু দেখে থাকে?
নিশি একটু ভেবে বলল,
— বাচ্চারা অনেক সময় ঠিক জিনিসটা দেখে, কিন্তু বড়দের ভাষায় বলতে পারে না। আমাদের বুঝতে হয়, ওরা আসলে কী বলতে চাইছে।
পরদিন তারা আবার গেল।
এবার নিশি রিদমকে একটা কাগজ আর রঙপেন্সিল দিল।
— যা মনে আছে, এঁকে দেখাও।
কিছুক্ষণ পরে রিদম একটা ছবি আঁকল।
একটা ঘর।
একটা আলমারি।
আলমারির পাশে একটা ছায়ার মতো দাগ।
ছবির ওপর লিখল—
"উনি এখানেই।"
নিশি ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,
— তুমি কি মানুষটাকে দেখেছিলে?
রিদম মাথা নাড়ল।
— না।
— তাহলে বলছ উনি এখানেই?
ছেলেটা একটু বিরক্ত গলায় বলল,
— মানুষটা না...
ওনার গন্ধ।
ঘরে হঠাৎ সবাই চুপ হয়ে গেল।
রিদম বলল,
— ওই কাকুর গায়ে সব সময় একটা ওষুধের গন্ধ থাকত। সেদিনও ছিল। ওই আলমারির পাশেই।
নিশি কথাটা তদন্ত কর্মকর্তাকে জানাল।
প্রথমে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।
তবু আলমারিটা আবার সরানো হলো।
পেছনে একটা সরু লুকোনো দরজা।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ নথি।
আর একটা জ্যাকেট।
জ্যাকেটে এখনো একই রাসায়নিকের গন্ধ লেগে আছে।
তদন্তকারীরা পরে জানতে পারলেন, নিহত ব্যক্তির ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়মিত সেই ওষুধ ব্যবহার করতেন। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জ্যাকেটটা সেখানেই ফেলে গিয়েছিলেন।
সেই সূত্র ধরেই তদন্ত নতুন দিকে মোড় নিল।
কয়েক দিন পর সব শান্ত হলে অভিক আবার রিদমের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
উঠোনে বসে খেলছিল ছেলেটা।
অভিক হেসে বলল,
— সবাই তো বলছিল, তুমি ভুল বলছ।
রিদম কাঁধ ঝাঁকাল।
— আমি তো ভুল বলিনি।
একটু থেমে আবার বলল,
— মানুষ চলে গেলেও... তার রেখে যাওয়া সবকিছু তো সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় না।
অভিক কিছু বলল না।
বাড়ি ফেরার পথে নিশি ধীরে বলল,
— আমরা বড়রা একটা ভুল খুব করি।
— কী?
— শিশুদের কথা শুনি। কিন্তু বুঝতে চেষ্টা করি না।
অভিক জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, সত্যি অনেক সময় বড়দের চোখ এড়িয়ে যায়।
কারণ তারা উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত থাকে।
আর শিশুরা...
তারা শুধু যা দেখে, সেটাই বলে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।