সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-৮
পলকহীন চোখ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯, জুলাই, ২০২৬
প্রথম দিন লোকটাকে দেখে অভিকের কিছুই অস্বাভাবিক লাগেনি।
অফিস থেকে ফেরার পথে নতুন একটা কফিশপে ঢুকেছিল। ভেতরে লোকজন খুব একটা ছিল না। জানালার ধারের টেবিলে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ চুপচাপ চা খাচ্ছিলেন।
বিল মিটিয়ে বেরিয়ে আসবে, এমন সময় লোকটা ডাকলেন।
— আপনি কি অভিক?
অভিক থেমে গেল।
— জি... কিন্তু আপনি?
লোকটা একটু হাসলেন।
— চিনবে না। তোমার বাবার সঙ্গে অনেক বছর কাজ করেছি।
বাবার কথা উঠতেই অভিক দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটা এমন দু-একটা ঘটনার কথা বললেন, যা সত্যিই বাইরের কারও জানার কথা নয়।
তবু একটা জিনিস বারবার চোখে লাগছিল।
লোকটা একবারও চোখের পলক ফেলছিলেন না।
প্রথমে অভিক ভেবেছিল, হয়তো খেয়াল করছে না। কিন্তু কথাবার্তা চলতেই থাকল।
পাঁচ মিনিট।
তারপর আরও কিছুক্ষণ।
লোকটার চোখ একইভাবে তার দিকে স্থির।
একবারও বন্ধ হলো না।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে কথাটা নিশিকে বলল।
নিশি হেসে উড়িয়ে দিল।
— তুমি হয়তো ঠিকমতো খেয়াল করোনি। মানুষ এতক্ষণ পলক না ফেলে থাকতে পারে?
অভিকও আর তর্ক করল না।
কিন্তু দুদিন পর আবার দেখা হয়ে গেল।
লোকটা আগের মতোই হাসলেন। আগের মতোই কথা বললেন।
আর আগের মতোই একবারও চোখের পলক ফেললেন না।
এবার অস্বস্তিটা সত্যিই গায়ে লেগে রইল।
বিদায় নেওয়ার আগে লোকটা একটা কাগজে ঠিকানা লিখে দিলেন।
— তোমার বাবার কিছু কাগজপত্র আমার কাছে আছে। সময় পেলে একদিন এসো।
রাতে অভিক বলল,
— যাব ভাবছি।
নিশি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— যাও। তবে আগে মানুষটা সম্পর্কে একটু খোঁজ নিয়ে নিও।
পরদিন অভিক বাবার এক পুরোনো সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলল।
নাম শুনেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— মানুষটা খুব ভালো। তবে কয়েক মাস আগে বড় একটা স্ট্রোক হয়েছিল।
— এখন কেমন আছেন?
— মোটামুটি। কিন্তু স্ট্রোকের পর মুখের এক পাশের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চোখও পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেন না। তাই বারবার ড্রপ দিতে হয়।
কথাটা শুনে অভিক চুপ হয়ে গেল।
সেদিন বিকেলেই সে ঠিকানায় গেল।
লোকটা বারান্দায় বসেছিলেন।
পাশেই একটা ছোট্ট আই ড্রপের বোতল।
মাঝে মাঝেই চোখে ওষুধ দিচ্ছিলেন।
অভিককে দেখে হেসে বললেন,
— আমার চোখ দেখে ভয় পেয়েছিলে, তাই না?
অভিক অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করল।
লোকটা মৃদু হেসে বললেন,
— সবাই প্রথমে তাই ভাবে।
তারপর ড্রপটা হাতে নিয়ে যোগ করলেন,
— চোখের পলক ফেলতে পারি না। তাই শুকিয়ে যায়।
অভিকের আর কিছু বলার ছিল না।
লোকটা ধীরে ধীরে আলমারি খুলে একটা পুরোনো খাম বের করলেন।
ভেতরে কয়েকটা চিঠি।
অভিকের বাবার হাতের লেখা।
আর একটা পুরোনো ছবি।
ছোট্ট অভিক বাবার কাঁধে বসে আছে। দুজনেই হাসছে।
লোকটা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তোমার বাবা বলেছিলেন, কোনো দিন যদি তোমার সঙ্গে দেখা হয়, এগুলো যেন তোমাকে দিয়ে দিই।
একসময় ভাবতাম দেব। তারপর বছর কেটে গেল। আর সাহস হয়নি।
আজ দিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম।
ফেরার পথে নিশি ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
অভিক জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— আমি ভেবেছিলাম মানুষটার চোখের মধ্যেই রহস্য আছে।
আসলে রহস্য ছিল আমার মাথার ভেতর।
নিশি হালকা হেসে বলল,
— আমরা অনেক সময় মানুষের একটা অস্বাভাবিক দিক দেখি। তারপর বাকি গল্পটা নিজেরাই বানিয়ে ফেলি।
অভিক ছবিটার ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
তার মনে হলো, সব অদ্ভুত জিনিস ভয়ের নয়।
কিছু কিছু শুধু মানুষের নীরবে বয়ে বেড়ানো কষ্টের চিহ্ন।
আর মানুষকে বুঝতে হলে শুধু তার চোখের দিকে তাকালেই হয় না।
তার জীবনের দিকেও একবার তাকাতে হয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।