উপন্যাস-বৃষ্টির ওপাশে আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
০৩, জুলাই ২০২৬
পর্ব–৩ : ফোসকা পড়া হাত
বৃষ্টি থামে না।
তিন দিন হইল অভিক রিকশা চালায়। শরীর এখনো নিতে পারতেছে না। সকালে উঠলেই কোমর ধরা। হাতের তালুতে ফোসকা। পানি লাগলেই জ্বলে। তাও বের হওয়া লাগে। সংসার তো কারো জন্য বইসা থাকে না।
নিশি ভাত গরম করতেছিল। অভিক হাত ধুইতে গিয়া মুখ কুঁচকায়ে ফেলল। নিশি দেখল। “হাতটা দেখি।”
“আরে, কিছু না।”
“দেখাও।”
হাত বাড়াইতেই নিশির বুকের মধ্যে কেমন করল। চামড়া উইঠা লাল হয়ে আছে কয়েক জায়গায়। মলম আইনা আস্তে আস্তে লাগায়ে দিল।
অভিক অস্বস্তি নিয়া বলল, “এইগুলা দিয়া কী হবে? কাল আবার ধরা লাগবে।”
নিশি কাজ থামাইল না। “লাগা লাগবে দেইখাই লাগাইতেছি।”
অভিক চুপ।
পাশের ঘরে মাইশা আর মিম বই খুইলা বইসা আছে। পাতা উল্টায়, কিন্তু পড়া হয় না।
মিম আস্তে কইল, “আপু... আব্বুর খুব কষ্ট হইতেছে, না?”
মাইশা একটু থাইমা বলল, “হইতেছে।”
“আমরা কিছুই করতে পারি না।”
মাইশা শ্বাস ফেলল। “পড়ালেখা শেষ করলে হয়তো পারব।”
মিম আর কথা কইল না। জানালার কাঁচ বাইয়া পানি নামতেছে। ওইদিকে তাকায়ে থাকল।
দুপুরে বৃষ্টি একটু কমতেই অভিক বাইর হইল। এখন রিকশা আগের চেয়ে একটু ভালো চালাইতে পারে। কিন্তু শরীরের সাথে যুদ্ধটা যায় নাই।
একজন যাত্রী উইঠা বলল, “ভাই, একটু তাড়াতাড়ি যাবেন?”
“দেখি।”
কিছুদূর যাইতেই বুকের মধ্যে ব্যথা। গতি কইমা গেল। পিছন থেকে লোকটা বিরক্ত, “এত আস্তে গেলে তো দেরি হইয়া যাবে।”
অভিক শুধু বলল, “শরীরটা আজকে ভালো না।” লোকটা আর কিছু কইল না। নাইমা ভাড়া দিয়া চইলা গেল।
অভিক রিকশা সাইডে থামায়ে বইসা থাকল। মনে হইতেছিল বুকের ভিতর কেউ চাইপা ধরছে। একটু দম নিয়া আবার হ্যান্ডেল ধরল। শক্ত কইরা ধরল, যাতে পইড়া না যায়।
ফেরার উপায় নাই। বাসায় মাইশার সেমিস্টারের টাকা দেওয়া লাগবে। মিমের খাতাও কেনা হয় নাই এখনো।
ওদিকে বিকালে নিশি সেলাই মেশিনে বসল। সালেহা আপা দুইটা ব্লাউজ দিয়া গেছে। অনেক দিন পর ঘরে আবার মেশিনের শব্দ।
অভিক ফিরা অবাক, “কাজ নিছ কবে?”
নিশি একবার তাকায়ে আবার সেলাইয়ে মন দিল। “আজকে।”
“আমারে বললা না?”
“বললে করতে দিতা?”
অভিক জবাব দিতে পারল না। মনে হয় না দিত।
রাতে খাইতে বইসা মিম বলল, “আব্বু, কাল ভার্সিটিতে প্রোগ্রাম আছে। সবাই নতুন জামা পরবে। আমি গত বছরেরটাই পরব।” একদম স্বাভাবিক কইরা বলল। অভিযোগ না। তাও অভিকের হাত থাইমা গেল।
“নতুন জামাও হবে। একটু সময় দে।”
মিম হাসল, “আমি তো এমনি বললাম।”
খাওয়ার পর মাইশা ঘরে গিয়া ব্যাগ খুলল। একটা খাম বের করল। দুই মাস টিউশনি কইরা যা জমাইছে। গুইনা আবার খামে ঢুকায়ে রাখল। এখন দিবে না। যেদিন বাবার খুব দরকার পড়বে, ওইদিন।
রাত অনেক। ঘুম আসে না অভিকের। হাতের তালু জ্বলতেছে। পাশে তাকায়ে দেখে নিশিও জাইগা।
“ঘুমাও নাই?”
নিশি হাসল, “তুমিও তো না।”
দুইজনেই চুপ। তারপর অভিক আস্তে কইল, “যদি না পারি?”
নিশি সাথে জবাব দিল না। ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়া কিছুক্ষণ চুপ কইরা থাকল। তারপর বলল, “এতদিন আমরা তোমার ভরসায় ছিলাম। এইবার আমাদের উপর একটু ভরসা করো।”
অভিক কিছু কইল না। শুধু নিশির হাতটা আরেকটু শক্ত কইরা ধরল।
জানালার বাইরে আবার বৃষ্টি। ঘরের ভিতরও অনেক কিছু পাল্টাইতেছে। অভিক প্রথমবার বুঝল, সব বোঝা একা টানা লাগে না। পাশে একটা মানুষ থাকলেই রাস্তাটা একটু সহজ লাগে।
(চলবে... পর্ব–৪ : যে হারটা আর গলায় উঠল না)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।