উপন্যাস-বৃষ্টির ওপাশে আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
০৩, জুলাই ২০২৬
পর্ব–২ : প্রথম দিনের ভাড়া
সকালেও বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙল অভিকের। ছাদের দিকে তাকায়ে শুয়ে থাকল কিছুক্ষণ। আজকে কোথাও যাওয়ার তাড়া নাই। তাও শরীরটা আগের মতোই ভোরে উঠে গেছে। অভ্যাস সহজে যায় না।
নিশি চা দিয়ে সামনে রাখল। “আজ বের হবা?”
“হুঁ, একটু।”
“চাকরির জন্য?”
অভিক মাথা নিচু করে রইল। নিশি আর ঘাঁটল না।
চা খেয়ে শার্টটা গায়ে দিল। দরজার কাছে নিশি শুধু বলল, “দুপুরে একটা ফোন দিও।”
“আচ্ছা।”
বাসা থেকে বের হয়ে সোজা রাস্তার ওপারের রিকশা গ্যারেজে গেল। কালকে দূর থেকে দেখছিল। আজ ঢুকে পড়ল।
রহমত চাচা একটা রিকশার চাকা দেখতেছে। অভিক একটু থেমে বলল, “চাচা... একটা কথা।”
লোকটা তাকাইল। “কন।”
“একটা রিকশা... ভাড়ায় মিলবে?”
চাচা কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকায়ে থাকল। “আগে চালাইছেন?”
অভিক মাথা নাড়ল। “না।”
“পারবেন?”
এইটার জবাব অভিকের কাছে নাই।
রহমত চাচা হালকা হাসল। “কেউই চালানো শিখে জন্মায় না। চেষ্টা করেন।” কোণার একটা পুরান রিকশা দেখায়ে দিল। “এইটা নেন।”
হ্যান্ডেল ধরতেই বুকের মধ্যে কেমন লাগল। কিছুদিন আগেও এই হাত কিবোর্ডে চলত। আজ রিকশা টানবে।
প্রথমে খালি রিকশা নিয়া কয়েক চক্কর দিল। ব্যালেন্স থাকে না। একবার তো ড্রেনে উঠায়ে ফেলছিল প্রায়।
পাশ দিয়া এক রিকশাওয়ালা যাইতেছিল। হাইসা বলল, “নতুন নাকি ভাই?”
অভিকও হাইসা ফেলল। “বুঝা যায়?”
“যায় তো।” খোঁচা নাই হাসিতে। মনে হইল, লোকটাও একদিন এমনই শুরু করছিল।
বেলা বাড়তে প্রথম যাত্রী। এক বয়স্ক মহিলা।
“বাজারে যাবেন?”
“উঠেন।”
টানতে শুরু কইরা কয়েক মিনিটেই হাঁপায়ে গেল। পা ভারী লাগতেছে। শার্ট ভিজা। বৃষ্টিতে না। ঘামে।
বাজারে নামায়ে দিল। মহিলা পঞ্চাশ টাকার নোট দিল। অভিক চল্লিশ টাকা ফেরত দিতে গিয়া হিসাব গুলায়ে ফেলল।
মহিলা টাকা গুইনা হাসল, “বাবা, দশ টাকা বেশি দিতেছ।”
অভিক লজ্জা পাইল। “খেয়াল করি নাই।”
“প্রথম দিন?”
একটু চুপ থেকে বলল, “হুঁ।”
মহিলা আর কিছু বলল না। নামার সময় শুধু বলল, “আল্লাহ ভরসা।” কথাটা সারাদিন কানে বাজল।
ওদিকে বাসায় নিশি আলমারি থেকে একটা পুরান বাক্স নামাইল। ভিতরে বিয়ের গয়না। একজোড়া দুল। চিকন একটা চেইন। লাল কাপড়ে মোড়ানো হার।
হারটা হাতে নিয়া বইসা থাকল কিছুক্ষণ। তারপর আবার রাখে দিল। এখনই না। আরেকটু দেখি।
বিকালে পাশের বাসার সালেহা আপার কাছে গেল। “আপা, শুনলাম সেলাইয়ের লোক লাগবে?”
সালেহা আপা অবাক। “তুমি কাজ করবা?”
নিশি ছোট করে হাসল, “দিলে... চেষ্টা করি।”
বাসায় আইসা কাউরে কিছু বলল না।
সন্ধ্যার আগে মিম বারান্দায় দাঁড়ায়ে ছিল। দূরে একটা রিকশা আইসা থামল। নামল অভিক। হাঁটাটা আজ অন্যরকম। আস্তে আস্তে আসতেছে। মনে হইতেছে শরীরের সব জোর রাস্তায় ফালায়ে আসছে।
ঘরে ঢুইকা হাসার চেষ্টা করল। “কী রে, সবাই কই?”
মাইশা তাড়াতাড়ি পানি আনল। অভিক এক নিশ্বাসে শেষ করল।
গ্লাস নামাইতেই মিমের চোখ গেল বাবার হাতে। তালুর চামড়া উইঠা গেছে। কয়েক জায়গায় লাল। কিছু বলল না। চুপচাপ ফার্স্ট এইড বক্সটা আইনা টেবিলে রাখল।
অভিক তাকায়ে থাকল। মিম আস্তে বলল, “ওষুধটা লাগায়ে নিও, আব্বু।”
অভিক শুধু মাথা নাড়ল। তখন মনে হইল, বড় হইতে সবসময় বয়স লাগে না। কিছু সংসার মানুষরে তাড়াতাড়ি বড় বানায়ে দেয়।
বাইরে আবার বৃষ্টি। অভিক জানালার দিকে তাকায়ে রইল। হাতের ফোসকা একদিনেই উঠছে। বুঝল, জীবন পাল্টাইতে সবসময় বেশি দিন লাগে না। এক দিনই অনেক।
(চলবে... পর্ব–৩ : ফোসকা পড়া হাত)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।