সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-৭
দেয়ালের ওপাশে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯, জুলাই, ২০২৬
রাত তিনটা।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল অভিকের।
একদম স্পষ্ট শুনল—
— অভিক...
শব্দটা খুব জোরেও না, আবার এত আস্তেও না যে ভুল শোনা যায়।
মনে হলো, পাশের দেয়ালের ওপাশ থেকেই কেউ ডাকল।
সে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইল।
তারপর উঠে পুরো ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখল।
ড্রয়িংরুম।
বারান্দা।
রান্নাঘর।
কোথাও কেউ নেই।
নিশি তখনও ঘুমিয়ে।
সকালে নাশতার সময় কথাটা বলতেই নিশি হেসে ফেলল।
— স্বপ্ন দেখেছ হয়তো।
অভিকও আর তর্ক করল না।
নিজেকেও সেটাই বোঝাল।
কিন্তু পরের রাতেও ঠিক তিনটায় আবার সেই ডাক।
— অভিক...
এবার সে লাফ দিয়ে উঠে দেয়ালে কান লাগাল।
কিছুই নেই।
এক মুহূর্ত আগের শব্দটা যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
তৃতীয় রাতেও একই ঘটনা ঘটল।
এরপর আর ঠিকমতো ঘুমই হলো না।
অফিসে বসে একই মেইল দুবার পাঠিয়ে দিল।
সহকর্মী জিজ্ঞেস করল,
— কী ব্যাপার? শরীর ঠিক আছে?
অভিক শুধু বলল,
— ঘুমটা হচ্ছে না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে নিশিকে বলল,
— ব্যাপারটা আর কল্পনা মনে হচ্ছে না।
নিশি এবার আর হাসল না।
শুধু বলল,
— ঠিক আছে। আজ আমিও জেগে থাকব।
সেই রাতে দুজনেই অপেক্ষা করছিল।
ঘড়িতে তিনটা বাজতেই আবার—
— অভিক...
নিশি হঠাৎ সোজা হয়ে বসল।
তারপর আস্তে বলল,
— আমিও শুনেছি।
দুজনেই দরজা খুলে পাশের ফ্ল্যাটে গেল।
অনেকক্ষণ বেল বাজানোর পর এক বৃদ্ধ দরজা খুললেন।
ঘুমজড়ানো গলায় বললেন,
— কিছু হয়েছে?
অভিক একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
— চাচা... রাতে কোনো ডাক বা শব্দ শুনতে পান?
বৃদ্ধ অবাক হয়ে মাথা নাড়লেন।
— না তো।
ফিরে আসার সময় করিডোরের শেষ মাথায় একটা বন্ধ দরজায় চোখ গেল নিশির।
দরজায় ধুলো জমে আছে।
মনে হলো, অনেক দিন কেউ খোলেনি।
পরদিন কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বলতেই জানা গেল, ওটা আগে একটা ফ্ল্যাটের অংশ ছিল।
পরে দেয়াল তুলে আলাদা করে স্টোররুম বানানো হয়েছে।
অনুমতি নিয়ে দরজাটা খুলতেই পুরোনো কাঠ আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ বেরিয়ে এল।
ঘরের এক কোণে দেয়ালের নিচে ছোট্ট একটা বাতাস চলাচলের ফাঁক।
ওপাশেই পাশের ফ্ল্যাটের পুরোনো শোবার ঘর।
ঠিক তখনই খুব আস্তে একটা গলা ভেসে এল।
— ...আবিদ...
অভিক আর নিশি দুজনেই থেমে গেল।
আবিদ।
অভিক নয়।
কেয়ারটেকার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— পাশের ফ্ল্যাটের আন্টি অনেক দিন ধরে স্মৃতিভ্রংশে ভুগছেন।
রাত হলেই ছেলেকে ডাকেন।
ছেলের নাম ছিল আবিদ।
দশ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
এখন কথাও ঠিকমতো বলতে পারেন না।
অনেক সময় "আবিদ" শুনতে "অভিক" মনে হয়।
আর এই পুরোনো ফাঁক দিয়ে শব্দটা সোজা এদিকে চলে আসে।
বিকেলে অভিক আর নিশি দেখা করতে গেলেন।
বৃদ্ধা জানালার পাশে বসে ছিলেন।
অভিককে দেখেই বললেন,
— আবিদ... তুই এলি?
পাশে বসা বৃদ্ধ মানুষটা স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
— কিছু মনে করবেন না।
রাত হলেই উনি ছেলেকে খোঁজেন।
অভিক মাথা নাড়ল।
— না চাচা।
বরং... আজ একটা জিনিস বুঝলাম।
সেদিন রাতেও ঠিক তিনটায় অভিকের ঘুম ভাঙল।
দেয়ালের ওপাশ থেকে আবার একটা ডাক এল।
কিন্তু এবার আর সে উঠে দাঁড়াল না।
চোখ বন্ধ করেই শুনল।
সব শব্দের পেছনে রহস্য থাকে না।
কিছু শব্দ শুধু এমন একজন মানুষের অপেক্ষা হয়ে বেঁচে থাকে, যে আর কোনো দিন দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকবে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।