শেষ রায়ের পরও কান্না থামেনি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প
১৩ জুলাই, ২০২৬
অভিক আর নিশির সংসারটা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। আকাশছোঁয়া কোনো স্বপ্ন ছিল না তাদের। দুটো মানুষ একসাথে থাকবে, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেবে, এটুকুই ছিল চাওয়া।
কয়েক বছর পর সেই সংসারে এলো দুই মেয়ে। বড় মেঘ, ছোট মিশি। ওদের ছোট ছোট হাসি, কান্না আর আবদারে ঘরটা ভরে উঠল। অভিক চাকরি করত, নিশি সংসার সামলাত। মাসের শেষে টানাটানি লেগেই থাকত, তবু সংসারটা চলছিল। অনেকদিন শুধু ডাল-ভাত খেয়েও তারা ভাবত, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
মেঘ পড়াশোনায় ভালো ছিল। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজের শেষ দিনে বন্ধুদের সাথে হাতে মেহেদি পরেছিল। সেই রাঙা হাতের দিকে তাকিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিল মেয়েটা। তখনও বোঝেনি, জীবনের রং মেহেদির মতো এত সহজে গাঢ় হয় না।
ঠিক সেই সময় অভিক হাসপাতালের বিছানায়। ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। বুকের সেলাই তখনও শুকায়নি। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে উঠত। তবু মেয়ের সামনে কষ্টটা কখনো দেখাত না। শুধু বলত, "তোরা ভালো থাকলেই আমি ভালো আছি।"
কিছুদিন পর মেঘের বিয়ে হলো। মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় নিশি কান্নায় ভেঙে পড়ছিল। অভিক জামাইয়ের হাত ধরে শুধু একটা কথাই বলেছিল, "আমার মেয়েটাকে কষ্ট দিও না।"
সেদিন কথাটা খুব সহজ মনে হয়েছিল। পরে বোঝা গেল, সব কথা সবাই রাখে না।
বিয়ের প্রথম কয়েক মাস মোটামুটি ভালোই কেটেছিল। তারপর ধীরে ধীরে সব পাল্টে গেল। স্বামীর নেশা, রাগ, অপমান, অকারণ সন্দেহে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছিল মেঘ। অনেক রাত কেঁদে কাটিয়েছে। অনেকবার বাবার বাড়িতে ফোন করতে গিয়েও করেনি। বাবার হার্টের কথা মনে পড়ত।
দুই বছর পর একদিন ডিভোর্সের কাগজ হাতে পেল। খামটা খুলে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। কান্নাও আসছিল না।
ওদিকে অভিকের শরীরও ভেঙে পড়ছিল। মেয়ের সংসার ভাঙার কষ্ট, টাকার চিন্তা, নিজের অসুস্থতা, সব মিলিয়ে আবার হার্ট অ্যাটাক হলো। ছোট মেয়ে মিশির বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল, টাকার অভাবে সেটাও থেমে গেল।
এরপর মেঘ সিদ্ধান্ত নিল, আর চুপ করে থাকবে না। সে পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণ আর দেনমোহরের মামলা করল।
মামলা করা যতটা সহজ মনে হয়, চালিয়ে যাওয়া তার চেয়ে অনেক কঠিন। একটা তারিখ, তারপর আরেকটা তারিখ। মেঘ টিউশনি করে যে টাকা পেত, তার বেশিরভাগই চলে যেত মামলার পেছনে। দুই বছরে প্রায় নব্বই হাজার টাকা খরচ হয়ে গেল।
কাবিননামায় দেনমোহর ছিল আট লাখ টাকা। কিন্তু সেখানে গয়নার নামে পাঁচ লাখ সাতষট্টি হাজার টাকা উসুল দেখানো হয়েছিল। অথচ সেই গয়না বিয়ের পর কোনোদিনই সে হাতে পায়নি।
এদিকে কোর্টের রায় মেঘের পক্ষে যায়। কোর্ট মেঘের গয়না না থাকার জবানবন্দি নিয়েও মেঘকে মাত্র ৫,৮৩,০০০ টাকার রায় দেয়।
এর মধ্যে কোর্টের পেশকার দাবি করে তাকে ৩৫,০০০ টাকা দিতে হবে।
তাহলে মেঘের হাতে থাকে ৫,৮৩,০০০ - ৯০,০০০ - ৩৫,০০০ = ৪,৯৩,০০০ টাকা। আর সারাজীবনের কান্না আর অসহ্য যন্ত্রণা।
তাহলে কি মেঘের সারাজীবনের দাম ৪,৯৩,০০০ টাকা? আর চেয়ারে বসে পেশকারের আয় ৩৫,০০০ টাকা?
এমন কত হাজারো মেঘ আদালতে যায় ন্যায় পাবার আশায়। আর সেখানে পেশকার চেয়ারে বসে মাসে কামায় গড়ে যদি রোজ ২৫,০০০ টাকা হয়, তাহলে মাসের কর্মদিবস যদি হয় ২২ দিন, তাহলে পেশকারের মাসিক ইনকাম ৫,৫০,০০০ টাকা।
তাহলে আইন কোথায়? সরকারের রাষ্ট্রযন্ত্র কোথায়? দুদক কোথায়?
বিচার আস্থার জায়গা কিন্তু সেখানেও যদি টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয়, তাহলে আস্থার জায়গাটা আর কোথায় থাকলো?
একজন পেশকারের এক মাসের আয় একটি মেয়ের সারাটা জীবনের দাম? এ জবাব কে দেবে? অসুস্থ অভিক, নিশি, সমাজ, নাকি বিবেক?
রায়ের কাগজটা হাতে নিয়েও মেঘলার মনে হলো, সে যেন কিছুই পায়নি। একটা ভাঙা সংসার কি টাকায় মেরামত হয়? দুই বছরের অপমান কি কয়েক লাখ টাকায় মুছে যায়?
অভিক সেদিন বিছানায় শুয়ে ছিল। রায়ের কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না।
নিশি রান্নাঘরে গিয়ে চুপচাপ চোখ মুছল। মিশি বই খুলে বসেছিল, কিন্তু একই লাইন বারবার পড়েও কিছুই মনে রাখতে পারছিল না।
বাড়িটা তখন অদ্ভুত নীরব। কেউ কাঁদছে না, তবু মনে হচ্ছিল পুরো বাড়িটাই কান্নায় ভরে আছে।
রাত হলে অভিক ঘুমাতে পারে না। নিশি নামাজ শেষে চুপচাপ দোয়া করে। মিশি আবার বই নিয়ে বসে, নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করে। আর মেঘ বুঝে যায়, আদালতের রায়ে মামলা শেষ হতে পারে, কিন্তু মানুষের বুকের ভেতরের ক্ষত এত সহজে শেষ হয় না।
কিছু ক্ষত কাগজে লেখা থাকে না। সেগুলো মানুষ বয়ে বেড়ায়, বেঁচে থাকা পর্যন্ত।
বিঃদ্রঃ এটা মেঘলার কেস যে আদালতে বিচার হলো, পেশকার সেই আদালতের। অন্য কোনো পেশকারকে উদ্দেশ্য করে এ লেখাটি নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।