অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ১: রাত দুটোর নক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
রাত দুইটা।
টক। টক। টক।
এবারের শব্দটা কেমন যেন ভারী ঠেকল। দেয়ালের পুরনো পলেস্তারার একটা কোণ খসে পড়ল কি না কে জানে।
অভিকের ঘুমটা ঠিক ভাঙল না। ছিঁড়ে গেল। পাশ ফিরে দেখে, নিশি সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ বড় বড়। দুজনের কেউই নিশ্বাস নিচ্ছে বলে মনে হয় না। শব্দ করলেই যদি ওপাশের লোকটা টের পেয়ে যায়, এমন একটা ভয় ঘরের ভেতর জমে আছে।
আবার নক।
টক। টক।
দুইবার। থেমে থেমে। অপেক্ষা করছে হয়তো।
নিশির ঠোঁট নড়ল। গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না।
শুনলে?
অভিক শুধু মাথা নাড়ল। কাঁথাটা বুকের কাছে টেনে ধরল। এসি ২৪-এ চলছে। তবু নিশির কপালের পাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম। টেবিলের উপর রাখা পানির জগটায় বাইরের দিকে জল জমেছে।
ড্রয়িংরুম থেকে বাবার গলা ভেসে এল। রোজকার মতোই। ক্লান্ত, কিন্তু গলায় একটা নিশ্চিত সুর।
আসছি। দাঁড়াও বাবা, আসছি।
‘বাবা’। লোকটাকে তিনি বাবা ডাকেন।
অভিক আর শুয়ে থাকতে পারল না। ভয়ের চেয়ে বিরক্তিটা এখন বেশি লাগে। তিন মাস ধরে এক ঘটনা। দুইটা বাজবে, দরজায় শব্দ হবে, বাবা উঠে গিয়ে ফাঁকা করিডোরের সাথে হেসে কথা বলবেন।
সে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। পায়ে চটিটা খুঁজে পায়নি।
বাবা দরজা পুরো খুলে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে সেই চেনা হাসি।
আরে, কতদিন পর? ভিতরে আসো। ভিজে গেছ তো একেবারে।
অভিক সিঁড়ির দিকে তাকায়। লোডশেডিংয়ের পর জ্বলে ওঠা বাল্বটা মিটমিট করছে। করিডোর খালি। শুধু টিউবওয়েলের পাশের মেঝেটা ভেজা। কালচে ছোপ। অথচ বৃষ্টি হয়নি তিনদিন। ছাদের ট্যাঙ্কিও উপচে পড়েনি।
অভিকের গলাটা নিজের অজান্তেই চড়ে গেল।
বাবা, এখানে কেউ নাই। কেউ নাই তো!
বাবা অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। তারপর দরজার বাইরে হাত বাড়িয়ে বললেন,
নাই মানে? এই তো দাঁড়ায়ে। তুমি দেখো না? দেখো, ওর কালো ছাতাটা থেকে এখনো পানি পড়তেছে টপ টপ করে।
আঙুল দিয়ে মেঝেটা দেখালেন। শুকনো। এক ফোঁটা পানির দাগও নেই। শুধু ঘরের কোণে রাখা প্লাস্টিকের বালতিতে গতকাল ভেজানো গামছার একটা সোঁদা গন্ধ।
দরজার আড়ালে নিশি দুই হাত বুকের কাছে চেপে ধরেছে। বিয়ের কাচের চুড়িগুলো একবার ঝনঝন করে উঠেই থেমে গেল। তার মনে হলো ঘরের সব বাতাস কেউ একটানে টেনে নিয়েছে।
সকালের নাশতা পড়ে আছে। পরোটা ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেছে। ডিম ভাজিটা তেল চুপচুপে। কেউ ছুঁচ্ছে না।
অভিক চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। কাপের কানায় চিনির দানা লেগে আছে।
বাবা, আমার এক বন্ধু আছে। শফিক। ডাক্তার। ওর সাথে একবার কথা বলবা?
বাবা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। একটা রিকশা টুংটাং করে চলে গেল। আস্তে করে ঘুরলেন।
তোমরা ভাবো আমি পাগল হয়ে গেছি?
না। সেরকম না বাবা।
বাবা হাসলেন। হাসিতে রাগ নেই। কেমন একটা ফাঁকা ক্লান্তি লেগে আছে। না কইলেও বুঝি রে। কিন্তু পোলাটা রোজ আসে। আমার লগে বসে। তোমাদের অফিসের খবর নেয়। কয়, আপনার পোলাডার অনেক চাপ। রাত জাগতে মানা কইরেন। শুধু তোমরাই ওরে দেখো না।
নিশি প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। গলার কাছে কী যেন দলা পাকিয়ে আছে। গত মাসে নিউমার্কেট থেকে কেনা ফুল তোলা কাঁচের প্লেটটা হঠাৎ অচেনা লাগে।
ডাক্তারের চেম্বার। বাবা প্রথমে ঢুকতেই চান না।
ডাক্তার শফিকুর রহমান। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হতে পারে। চশমাটা মোটা ফ্রেমের। অনেকক্ষণ কথা বললেন বাবার সাথে। বাবা এক কথাই বলে গেলেন।
ও আসে। আমারে বাবা ডাকে। ওর ছাতাটা ভিজা থাকে। প্যান্টের নিচে কাদা লাগানো।
ডাক্তার পরে অভিক আর নিশিকে পাশের রুমে ডাকলেন। টেবিলের উপর একটা কালো পাথরের পেপারওয়েট।
দেখুন, উনি যা দেখতেছেন, শুনতেছেন, ওনার মস্তিষ্কে সেটা সত্যি বলেই মনে হওয়ার কথা। আমাদের ব্রেইনের কিছু সংকেত মাঝে মাঝে এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। তখন নাই জিনিসকেও আছে বলে ধরে নিই আমরা। ওষুধে এটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভয় পাবেন না। সময় লাগতে পারে।
রোগের নামটা তিনি বললেন না। অভিক বাসায় ফিরে রাতে ফোনে খুঁজল। সিজোফ্রেনিয়া। বানানটা তিনবার দেখতে হলো। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
ওষুধ শুরু হলো।
প্রথম ছয় সপ্তাহ একরকম নরক।
বাবা ওষুধ খাবেন না। ছুঁড়ে ফেলে দেবেন। চেঁচাবেন, তোমরা ওরে ঢুকতে দেও না! পোলাটা বৃষ্টিতে ভিজতেছে বাইরে! জ্বর আইব তো।
নিশি রোজ রাতে বাবার হাত ধরত। নিজের হাত কাঁপে, কিন্তু গলা শক্ত করে বলত,
খায়া নেন বাবা। আপনার বন্ধুরে কইয়া দিমু, আজকে আপনে অসুস্থ। কাইল আইসেন।
এক রাতে দুইটার দিকে অভিক উঠে দেখে বাবা বিছানায় বসে আছেন। দরজার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু উঠছেন না। ঘরের ডিমলাইটের আলোয় চোখের নিচের কালিটা স্পষ্ট।
বাবা?
বাবা ফিসফিস করে বললেন, আজ আসে নাই। রাগ করছে মনে হয়। ওষুধের গন্ধ পছন্দ করে না। কয় ন্যাপথালিনের মতো গন্ধ।
অভিক সেদিন ভোর পর্যন্ত বাবার পাশে বসে থাকল। মশারির একটা দিক ছেঁড়া। সেখান দিয়ে মশা ঢুকছে।
তিন মাস পর।
রাতের নক থেমে গেছে।
বাবা এখন ছাদে যান। টবের গাঁদা ফুল গাছে পানি দেন। রাত আটটার খবরে আলু-পেঁয়াজের দাম দেখে ভ্রু কুঁচকান। চা খেতে খেতে অভিককে বলেন, এত রাত করিস না অফিসে। গ্যাসের ব্যথা হইব।
এক বিকালে বাবা বললেন, বুঝলি, ওষুধ খাওনের পর থাইকা ওর গলাটা কম শুনি। আগে একদম পরিষ্কার শুনতাম। কাশতও। এখন মনে হয় অনেক দূর থাইকা ডাকে। মসজিদের মাইকের মতো।
অভিক কিছু বলল না। বাবার হাতটা চেপে ধরল। হাতের চামড়া খসখসে। শীতকালে যেমন ফাটে।
সেদিন নিশি বারান্দা মুছতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। দরজার ঠিক সামনে একটা ভেজা পায়ের ছাপ। একটাই। যেন কেউ এক পা ফেলে আর ঢোকেনি। জুতার মাপ আট বা নয় হতে পারে। অথচ আকাশ পরিষ্কার।
কাজের বুয়া রহিমাকে জিজ্ঞেস করল। বুয়া বলল, রাইতে কে যেন বারান্দায় পানি ঢালছে আপা। ছপাত ছপাত শব্দ। আমি ভাবছি আপনে গাছে পানি দেন।
নিশি বাবাকে কিছু বলল না।
আরও দুই মাস কেটে গেল।
বাড়িটা এখন শান্ত। ফ্রিজের ভোঁ ভোঁ শব্দটাও রাতে আর গা ছমছম করায় না।
এক সন্ধ্যায় বাবা হঠাৎ বললেন, জানোস… এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যারে দেখতাম… সে হয়তো আছিলই না।
কথাটা বলার সময় বাবা অভিকের দিকে তাকাননি। গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। গলায় জোর ছিল বলে মনে হলো না। কেমন একটা মেনে নেওয়া ভাব। যেন ছেলেটা যাতে ভয় না পায়, তাই নিজেকেই বোঝাচ্ছেন।
সেই রাতে বহুদিন পর অভিক আর নিশি শান্তিতে ঘুমাল।
টক।
টক।
টক।
অভিক ধড়মড় করে উঠে বসল। বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করছে।
ঘড়ি দেখল। রাত ঠিক দুইটা।
তিন মাস। একদিনও এদিক ওদিক না।
আবার শব্দ।
টক।
টক।
এবারেরটা আরও কাছে। মেইন দরজায় না। তাদের শোবার ঘরের দরজায়। দরজার ফাঁক দিয়ে কেউ নিশ্বাস ফেলছে বলে মনে হতে পারে।
অভিক আস্তে করে নিশির দিকে তাকাল। নিশিও উঠে বসেছে। চোখ বড় বড়। মুখটা শুকনো পাতার মতো সাদা।
ড্রয়িংরুমে কোনো সাড়া নেই। বাবা আসছেন না।
কারণ এবার দরজাটা বাবার না।
নিশি ফিসফিস করে বলল। গলাটা শোনাই যায় না প্রায়।
অভিক… তুমি কি… দরজার শব্দটা শুনতে পাইতেছ?
বাইরে তখন তিন নম্বর বার শব্দ হলো।
টক।
আর সঙ্গে সঙ্গে বারান্দা থেকে একটা গন্ধ ভেসে এল। ভেজা মাটির গন্ধ। সাথে পুরনো কালো ছাতার। আর কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে কাপড়ের গন্ধ মিশে আছে।
(চলবে… গল্প ২: অ্যালবামের দ্বিতীয় শিশু)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।