একটি সিদ্ধান্তের দাম
পর্ব–৪ : ভাঙনের শেষ প্রান্তে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধারাবাহিক গল্প
বাড়িটা আগের মতো নেই।
দেয়াল একই, আসবাব একই, মানুষ দুটোও একই। তবু সবকিছু বদলে গেছে।
অভিক এখন জোরে কথা বলে না। দরজার বেল বাজলেই বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। ফোন বেজে উঠলে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ, তারপর কেটে দেয়। কেটে দিলেই তো ঝামেলা কাটে না।
নিশি সব দেখে।
কিন্তু আগের মতো প্রশ্ন করে না। কিছু উত্তরের জন্য মানুষ তৈরি থাকে না, জানলেও না।
এক সপ্তাহ পর অফিসে গিয়ে অভিক শুনল, ম্যানেজার ডেকেছেন।
রুমে ঢুকতেই ম্যানেজার ফাইলটা বন্ধ করলেন। চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।
“অভিক, কী হয়েছে তোমার?”
“জি... কিছু না।”
“‘কিছু না’ বললে তো চলবে না। গত এক মাসে তুমি তিনবার ভুল হিসাব জমা দিয়েছ। ক্লায়েন্ট ফোন করেছে গত বুধবার। তোমার মন নেই কাজে।”
অভিক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মোজার ভেতর পা ঘামছে।
অভিযোগগুলো মিথ্যে নয়, সে জানে। মাথার ভেতর সারাক্ষণ দেনা, ফোন আর ভয়ের শব্দ ঘুরছে। এক্সেলের ঘরগুলো ঝাপসা লাগে।
ম্যানেজার লম্বা শ্বাস ফেললেন। “তোমাকে পনেরো দিনের ছুটি দিচ্ছি। আগে নিজের ঝামেলা সামলাও।”
কথাটা শুনে অভিকের বুকটা হঠাৎ ফাঁকা লাগল।
ছুটি মানে বিশ্রাম নয়। ছুটি মানে এই মাসে বেতনটা অর্ধেকও হবে কি না সন্দেহ।
বিকেলে বাড়ি ফিরে কথাটা নিশিকে বলল।
নিশি কিছুক্ষণ চুপ। তারপর রান্নাঘরে গেল। ফিরে এলো হাতে একটা পুরোনো বিস্কুটের টিন নিয়ে। টিনের গায়ে ‘হক’ লেখা, রং চটে গেছে।
টিনটা অভিকের সামনে রাখল। “খুলে দেখো।”
ভেতরে টাকা। নোটগুলো ভাঁজ করা, এলোমেলো।
বেশি না। দশ-এগারো হাজার হতে পারে।
অভিক তাকিয়ে রইল। “এগুলো কোথায় পেলে?”
নিশি হালকা হাসল। হাসিটা চোখে পৌঁছাল না। “সংসার করতে করতে একটু একটু করে সরিয়েছি। ভাবছিলাম, একদিন সীতাকুণ্ড যাব। তোমার তো পাহাড় পছন্দ।”
অভিকের গলা ধরে এলো। “আমি তোমার সব শেষ করে দিলাম।”
নিশি মাথা নাড়ল। “না। সব শেষ হয়নি।”
একটু থেমে যোগ করল, “কিন্তু তুমি যদি এখনও আমার কাছ থেকে কিছু লুকাও, তাহলে সত্যিই শেষ হয়ে যাবে।”
অভিক অনেকক্ষণ বসে রইল। টিনের ভেতর হাত দিল না।
তারপর প্রথমবারের মতো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলল। গলাটা কাঁপছিল মাঝে মাঝে।
রুবেলের কথা। মিরপুরের সেই অফিস। ঋণের কাগজ। রাশেদ সাহেবের ৪০ হাজার, অফিসের কলিগ শফিকের ২৫, একটা এনজিও থেকে নেওয়া ১ লাখ ২০। কীভাবে একটা ভুল ঢাকতে গিয়ে আরেকটা করেছে। সব।
নিশি থামাল না একবারও।
শুধু শুনল। হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে রাখল কোলের ওপর।
শেষ হলে ধীরে বলল, “এত কষ্ট একা বইলে কেন?”
অভিক উত্তর খুঁজে পেল না। জানালার গ্রিলের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন সকালেই দুজনে ঠিক করল, যাদের কাছে টাকা ধার আছে, তাদের সঙ্গে নিজেরাই দেখা করবে।
প্রথম দুজন সময় দিল। রাশেদ সাহেব বললেন, “মাসে পাঁচ হাজার করে দিও।” শফিক বলল, “ঈদের পরে দিলেই হবে।”
তৃতীয়জন দিল না। মতিঝিলের এক সমিতির ম্যানেজার।
সে সোজা বলে দিল, “সাত দিন। টাকা না পেলে আমরা কোর্টে যাব। উকিল নোটিশ রেডি।”
বাড়ি ফেরার পথে দুজনেই চুপ। ফার্মগেটের ওভারব্রিজ পার হতে নিশি বলল, “একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“ভুল করেছ, ঠিক। কিন্তু পালালে ভুলটা আরও বড় হবে।”
অভিক প্রথমবার ভালো করে তাকাল নিশির দিকে। রোদে মুখটা কালচে লাগছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
এত কিছু হারিয়েও মেয়েটা এখনও তার পাশে হাঁটছে। এই প্রাপ্যটা তার ছিল কি না, সে নিজেই জানে না।
রাতে অনেক দিন পর দুজনে বারান্দায় বসল।
হালকা বাতাস। পাশের বাড়ির ছাদে কেউ হাসনাহেনা গাছে পানি দিচ্ছে, গন্ধ আসছে।
নিশি বলল, “জানো, আমি গয়নার জন্য কাঁদিনি।”
অভিক অবাক হয়ে তাকাল। “তাহলে?”
“আমি কেঁদেছিলাম, কারণ তুমি আমাকে বিশ্বাস করোনি।”
অভিকের গলা ভারী হয়ে এলো। শব্দগুলো আটকে যাচ্ছে। “আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”
নিশি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। রেলিং-এ হাত রাখল।
অনেকক্ষণ পর বলল, “ক্ষমা একদিনে হয় না। বিশ্বাসও একদিনে ভাঙে না। দুটোই সময় নেয়।”
ঠিক তখনই নিচে একটা মোটরসাইকেল এসে থামল। হেডলাইটের আলো বারান্দায় এসে পড়ল এক সেকেন্ড।
দুজন লোক। একজন হেলমেট খুলল না। দরজায় কড়া নাড়ল—ঠকঠক, তারপর জোরে।
অভিক দরজা খুলতেই একজন বাদামি খাম এগিয়ে দিল। “অভিক হোসেন? আদালত থেকে। সাইন করেন।”
অভিকের হাত কাঁপল। কলমটা ধরতে দুবার চেষ্টা করতে হলো।
খাম খুলতেই প্রথম লাইন— “ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় আপনার বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা হইল...”
শব্দগুলো ঝাপসা লাগল। অভিক ধীরে সোফায় বসে পড়ল। হাঁটু দুর্বল।
নিশি এসে তার হাতটা ধরল। শক্ত করে। আঙুল ঠান্ডা।
সামনে কী আছে, তারা কেউ জানে না। উকিল লাগবে, টাকা লাগবে, সময় লাগবে।
তবে একটা বিষয় দুজনেই বুঝে গেছে— এবার আর শুধু টাকার হিসাব না। এটা সংসারটাকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। আর সেই লড়াইটা হয়তো সবচেয়ে কঠিন।
(চলবে.........৫ম পর্ব : যে সিদ্ধান্ত জীবন বদলে দিল - সমাপ্তি)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।