একটি সিদ্ধান্তের দাম
পর্ব–৩ : ভাঙনের শব্দ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধারাবাহিক গল্প
নিশি যে খামটা এগিয়ে দিয়েছিল, অভিক সেটা সেদিন ছুঁলই না।
সারারাত টেবিলের কোণে পড়ে রইল।
ভোরে নিশি দেখল, অভিক জানালার পাশে বসে। চোখ লাল। সারারাত জেগেছে, বোঝা যায়।
“অফিসে যাবে না?”
অভিক আস্তে মাথা নাড়ল। “আজ একটু বাইরে যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“একটা কাজ আছে।”
এর বেশি না। নিশিও চাপ দিল না।
সে ততদিনে বুঝে গেছে, চাপ দিয়ে সত্যি বের করা যায় না।
দুপুরের দিকে অভিক গেল রুবেলের আস্তানায়। মিরপুর ১০ নম্বরের গলির ভেতর একটা স্যাঁতসেঁতে অফিস। গয়নার খামটা হাতে।
রুবেল খাম খুলে একবার দেখল। ঠোঁটের কোণে হাসি। “এবার লাইনে এসেছ।”
অভিকের গলা শুকনো। “সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে তো?”
“আরে না! আর চার-পাঁচটা দিন। তারপর দেখবি, টাকা গুনে শেষ করতে পারবি না।”
অভিক আর কিছু বলল না।
বুকের ভেতরটা খচখচ করছে। তবু নিজেকে বোঝাল, এখন আর ফেরার পথ নেই। পা বাড়িয়ে ফেলেছে।
তিন দিন পার হলো।
রুবেলের ফোন বন্ধ।
অফিসে গিয়ে দেখে দরজায় তালা। শাটার নামানো।
পাশের চায়ের দোকানি কাপ ধুতে ধুতে বলল, “কাল রাতেই মালপত্র ট্রাকে তুলে গেছে।”
অভিক প্রথমে বিশ্বাস করল না। আরও তিন-চারবার ডায়াল করল।
একই কথা। “এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
ফুটপাতে বসে পড়ল সে। রিকশা যাচ্ছে, বাসের হর্ন, স্কুলফেরত বাচ্চাদের চেঁচামেচি—শহরটা চলছে আগের মতোই।
শুধু তার ভেতরটা থেমে গেল কয়েক মিনিটে।
বিকেলে বাড়ি ফিরে দরজা খুলতেই নিশি টের পেল কিছু একটা ঘটেছে।
অভিকের মুখ শুকনো। চোখদুটো ফাঁকা, যেন তাকিয়ে আছে অথচ দেখছে না।
“কী হয়েছে?”
উত্তর নেই।
সোফায় বসে দুই হাতে মুখ ঢাকল অভিক।
অনেকক্ষণ পর গলাটা ভেঙে বেরোল, “আমি শেষ।”
নিশির বুকের ভেতর মোচড় দিল। “মানে?”
“রুবেল... সব টাকা নিয়ে পালিয়েছে।”
ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল। ফ্যানের শব্দটাও হঠাৎ বেশি লাগল।
নিশি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, “আমার গয়নাগুলো?”
অভিক মাথা নিচু করল।
এই নীরবতাটাই উত্তর। যথেষ্ট।
নিশির মনে হলো, বুকের ভেতর থেকে কেউ একটা অংশ টেনে ছিঁড়ে নিল। গয়নার জন্য নয়। বিশ্বাসটা ভেঙে গেল বলে।
দুই দিন পর থেকে ফোন আসতে শুরু করল।
কেউ টাকা চায়। কেউ আর সময় দেবে না বলে দেয়। একজন তো সরাসরি বলল, “বাসা চিনি।”
প্রথম দিকে অভিক ধরত। পরে ফোন সাইলেন্ট করে রাখল।
কিন্তু ফোন বন্ধ করলেই তো দেনা মুছে যায় না।
এক বিকেলে দরজায় জোরে ধাক্কা।
নিশি খুলতেই তিনজন লোক। শার্ট ইন করা, চোখে রোদচশমা।
“অভিক ভাই আছেন?”
“কেন?”
“টাকা নিতে এসেছি।”
অভিক ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
লোকগুলোর একজন ভাঁজ করা স্ট্যাম্পের কাগজ মেলে ধরল। “অনেক সময় দিয়েছি। এবার টাকা লাগবে।”
“আর একটু সময় দেন।”
“সময় শেষ।”
ততক্ষণে পাশের ৫বি ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে গেছে রাবেয়া খালা। করিডোরে দু-একজন উঁকি দিচ্ছে।
অভিকের মাথা নিচু হয়ে এলো। এই লজ্জার জন্য সে তৈরি ছিল না।
লোকগুলো চলে যাওয়ার পর নিশি দরজা বন্ধ করল। ছিটকিনি লাগানোর শব্দটা অস্বাভাবিক জোরে বাজল।
তারপর ধীরে বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
অভিক চুপ।
“প্রথম দিন যদি আমাকে সত্যিটা বলতে... আমি কি তোমার পাশে দাঁড়াতাম না?”
অভিকের চোখ ভিজে উঠল। উত্তরটা সে জানে।
হ্যাঁ, নিশি দাঁড়াত। কিন্তু সেই রাস্তাটা সে নিজেই বন্ধ করেছে।
রাতে অনেক দিন পর অভিক নিজে থেকে কথা বলল। গলাটা ক্ষীণ। “আমি ভেবেছিলাম, একবার লাভ হলে সব মিটিয়ে ফেলব। তোমাকে কিছুই জানতে হবে না।”
নিশি লম্বা শ্বাস ফেলল। জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “মানুষ টাকা লুকাতে পারে। ভুলও লুকাতে পারে।”
একটু থেমে যোগ করল, “একটা জিনিস লুকানো যায় না।”
“কী?”
“ভুলের ফল।”
ঘরে আবার নীরবতা নামল। ভারী।
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝিরঝির। জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ।
অভিক বুঝতে পারছিল, এই বৃষ্টি তার কোনো দেনা ধুয়ে দেবে না। বরং মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলো হয়তো আজ থেকেই শুরু হলো।
(চলবে.........পর্ব–৪ : ভাঙনের শেষ প্রান্তে)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।