—রফিক আতা—
( মাস্টার বেডে সকলের প্রবেশ
যাতে স্বাগত না হয় সেজন্যে
প্ল্যানে দরজাটা ছোট মাপের দেখানো ছিল।
দরজাটা শেষ পর্যন্ত বড় রাখতে
রাজমিস্ত্রি সর্দার বললো—
“এ্যাত্তো ছোট রাখবেন সাব,
এ দিয়ে তো খাটিয়া বেরোবে না।”)
(কবিতা— বাড়ি। কবি—তালিম হোসেন)
মুসলিম জাতিসত্তার কবি তালিম হোসেন। নূরানীতে থাকতে পাঠ্যবইয়ে তার একটি কবিতা ছিল— “জমজম”। হযরত ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে লেখা সেই কবিতার মধ্য দিয়েই শৈশবের কোমল হৃদয়ে তালিম হোসেনের প্রতি জন্মেছিল এক দুর্বোধ্য মোহ।
আজ তার “বাড়ি” শিরোনামের একটি কবিতা চোখে পড়লো। প্রথম পাঠে কবিতাটি পড়ে মনে হলো—এটা নিতান্তই অহেতুক এক রচনা। অথচ এত বিজ্ঞ একজন কবি! তার কলমে এমন সাধারণ, প্রায় সাদামাটা লাইন—সিমসাম ভাষা! মনে প্রশ্ন জাগে, এই লাইনগুলোর ভেতর এমন কী আছে যে এটিও একটি গ্রহণযোগ্য কবিতা হয়ে উঠেছে?
মেয়েরা, জামাইরা এলে থাকবে।)
বারবার পড়তে গিয়ে ধীরে ধীরে ধরা দিল কবিতার মূল উদ্দেশ্য, তার বেসিক রহস্য। বুঝতে পারলাম—শেষের লাইনগুলোতেই লুকানো আছে একটি দীর্ঘশ্বাস, একটি অন্তিম নীরবতা। কবিতার সমাপ্তি যেন জীবনেরই সমাপ্তি।
(মাস্টার বেডে সকলের প্রবেশ
যাতে স্বাগত না হয় সেজন্যে
প্ল্যানে দরজাটা ছোট মাপের দেখানো ছিল।
দরজাটা শেষ পর্যন্ত বড় রাখতে
রাজমিস্ত্রি সর্দার বললো—
“এ্যাত্তো ছোট রাখবেন সাব,
এ দিয়ে তো খাটিয়া বেরোবে না।”)
এই কবিতায় তালিম হোসেন যেন বলতে চান—আমি একটি বাড়ি বানিয়েছি। তার প্রধান শয়নকক্ষটি রেখেছি বেশ ভিতরে। এমনকি প্ল্যানে সেই ঘরের দরজাটিও ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট করে রেখেছি, যাতে সবাই সেখানে অনায়াসে প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু রাজমিস্ত্রি সর্দার এসে সেই পরিকল্পনাতেই ভাঙন ধরায়—
“এ্যাত্তো ছোট রাখবেন সাব, এ দিয়ে তো খাটিয়া বেরোবে না।”
এই লাইনেই কবিতাটি হঠাৎ করে অন্য মাত্রা পায়। এখানে ‘খাটিয়া’ শব্দটি নিছক একটি আসবাব নয়; এটি মৃত্যুর পর মানুষের দেহ বহনের প্রতীক। রাজমিস্ত্রির বাস্তব যুক্তির মধ্য দিয়েই কবি আমাদের মনে করিয়ে দেন, মৃত্যুর সময় কোনো পরিকল্পনা, কোনো ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা সামাজিক গোপনীয়তা টিকে থাকে না। মৃত্যুর পথ সবার জন্য উন্মুক্ত, প্রশস্ত এবং অবশ্যম্ভাবী।
এই একটি বাক্যের মধ্য দিয়েই কবি যেন বলেন—জীবন যত সাজানোই হোক, শেষ যাত্রার জন্য দরজাটি বড় হতেই হয়। মানুষ চাইলে জীবনের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মৃত্যুর দরজার মাপ সে নিজে নির্ধারণ করতে পারে না। তাই কবিতার শেষটা কোনো উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদে নয়, বরং এক গভীর নীরবতায় শেষ হয়—যেন জীবনের মতোই কবিতারও সমাপ্তি ঘটে নিঃশব্দে, অনিবার্যভাবে। এক চিরন্তন সফরের বার্তা দিয়ে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।