শব্দের মর্যাদা বনাম স্বৈরাচারের স্লোগান
—রফিক আতা—
ব্যালকনির দিকে যাওয়ার দু’পথে দুটি পাপোশ বিছানো থাকে । কিছুদিন হলো তার উপর আবার পুরোনো চাউলের বস্তাও বিছানো দেখছি—যেন পাপোশের ওপর আরেক স্তরের রুক্ষতা। বস্তা বিছানোয় আমার আপত্তি নেই; গৃহস্থালি সহজে চলার জন্য মানুষ নানা রকম কৌশলই নেয়।
কিন্তু বস্তার গায়ে ছাপা বাংলা অক্ষরগুলোর ওপর যখন সাথীরা অযাচিতভাবে পা ঘষে চলে যায়, তখন মনে গভীর অস্বস্তি জন্মায়।
লেখা তো এমনই—সে ধর্মগ্রন্থের হোক কিংবা বস্তার গায়ে ছাপা—অক্ষর মানেই এক ধরনের মর্যাদা।
আজ ভোরে আলো ফোটার আগে হঠাৎ চোখ আটকে গেল বস্তার গায়ে থাকা লাল-নীল অক্ষরে। সেখানে লেখা—
“শেখ হাসিনার বাংলাদেশ
ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ”
এ লেখাটা দেখেই মনে পড়ে গেল বিগত বচ্ছরগুলোতে করে যাওয়া খুনি হাসিনার সেই অস্থির সময়; রাজনৈতিক গোলযোগের ভেতর দিয়ে ক্ষমতার চূড়ায় থাকা মানুষটি—যিনি এই স্লোগানের মুখপাত্র ছিলেন—স্বৈরাচার, অত্যাচার, গণহত্যা! ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতায় শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, অন্তত
এই স্মৃতির সঙ্গেই যখন বস্তার লেখা এক হয়ে যায়, তখন হঠাৎই মনে হলো—এই ছেঁড়া স্লোগানের অক্ষরগুলো পায়ের নিচে পড়লেও কোনো দুঃখ নেই।
কারণ এই প্রতিশ্রুতি—“ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ”—বাস্তবে কখনো পূরণ হয়নি; বরং দীর্ঘ ষোল বছর ধরে এই দেশের গরিব মানুষ বুকভরে ক্ষুধা নিয়ে রাত কাটিয়েছে, আর ক্ষমতাধররা নিরাপদ প্রাসাদে থেকে নিজেদের বাঁচানোর পথ খুঁজেছে।
দিনের আলোতে বাংলাদেশের কোটি কোটি টাকা বাইরে পাচার করেছে।
আগের মুহূর্তে লেখাকে মাড়ানোর কথা ভাবতেই বিবেক খচখচ করছিল। কিন্তু সেই সরকারের ভণ্ডামির কথা মনে পড়তেই উত্তাপ এসে নতুন যুক্তি দিল—
মিথ্যার ওপর লেখা শব্দ কি সত্যের মতোই সম্মানের দাবিদার?
তবুও কিছুক্ষণ পর নিজের মনকে শাসন করলাম।
লেখা তো লেখা—যেখানেই থাকুক, যেই অর্থে তৈরি হোক।
ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা রাজনৈতিক ঘৃণা লেখাকে কলুষিত করতে পারে না। কারণ অক্ষর—সত্য হোক বা স্লোগান—মানুষের ভাষাজগতের অংশ, আর সেই ভাষাকেও সম্মান দেওয়া আমার দায়িত্ব।এইযে এখন লিখছি! এটাওতো সেই ভাষারই অনুদান
শেষ পর্যন্ত নিজের দাঁড়ানোর জায়গাটা আরও স্পষ্ট হলো—এমন প্রতারক, ভন্ড,খুনি সরকারের প্রতি ঘৃণা থাকতেই পারে, এবং থাকা উচিতও; কিন্তু ভাষার প্রতি সম্মান অটুট থাকা চাই।
এই উপলব্ধিটাই আমাকে চিন্তার জট ছাড়িয়ে আবার অক্ষরের প্রতি নরম করে দিল।
দিনলিপি
এগারো, এক, পঁচিশ
শনিবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।