গল্প : সময়ের যাত্রা
মিরপুরের একটা ছোট মসজিদের ইমাম ছিলেন হাফেজ আব্দুল্লাহ। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, কিন্তু চোখে যেন আল্লাহর নূর জ্বলত। তার ছেলে রাশিদ, ত্রিশ বছরের যুবক, সারাদিন মোবাইলের দোকানে ব্যস্ত। নামাজের সময় ছাড়া বাবার সাথে কথাই বলত না। "সময় তো আসছে যাবে, বাবা। চিন্তা কীসের?" রাশিদ বলত। আব্দুল্লাহ হাসতেন, "বেটা, কুরআন বলে -
'ওয়াল আসর, ইন্নাল ইনসানা লা ফি খুসর'
সময়ের শপথ নিয়ে আল্লাহ বলেছেন, মানুষ ক্ষতিতে আছে, যদি না ঈমান আনে, আমল করে, সত্যের উপদেশ দেয় আর ধৈর্য ধরে। সময় আমাদের পরীক্ষা।"এক রাতে রমজানের শেষ আশরায়, রাশিদের দোকানে একটা পুরনো বাক্স এল। ভিতরে একটা রূপার সুন্দর সন্দুক, পেছনে খোদাই-
'লা ইকরাহা ফিদ্দীন'।
খুলতেই একটা পুরনো কুরআন বেরোল, আর তার সাথে একটা অদ্ভুত ঘড়ি। ঘড়ির ডায়ালে আরবি লেখা -
'ইন্না মা'আস সা'আতা কারীবুন' (নিশ্চয়ই কিয়ামত কাছাকাছি)
রাশিদ হাসল, "পুরনো জিনিস।" কিন্তু রাতে ঘড়িটা চালু করতেই নীল আলো জ্বলে উঠল। সময় থেমে গেল। রাশিদের চোখের সামনে দৃশ্য বদলে গেল। সে আর ঢাকায় নেই। সামনে মক্কার কাবা, কিন্তু পুরনো হাশিমীয় যুগের। লোকজন কামিজ পরে ঘুরছে, উটের পাল। "এটা কী?" রাশিদ চিৎকার করল। একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে এল, "হে যুবক, তুমি কে? কাবা শরীফের কাছে কীসের প্রয়োজন?" রাশিদ বুঝল, এটা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ের আগের দিন। সে ঘড়িটা দেখল কাঁটা পিছিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দূরে হুঁশিয়ারির আওয়াজ। কুরাইশরা মুসলিমদের উপর হামলা করছে। রাশিদ লুকিয়ে দেখল হযরত বিলাল (রা.)কে পাথর দিয়ে চাপা দেওয়া হচ্ছে। "আহাদ! আহাদ!" বিলাল চিৎকার করছেন। রাশিদের বুক কেঁপে উঠল। সময় তাকে শিখাচ্ছিল সেই সময়ে সাহাবীদের ধৈর্য কী ছিল!ঘড়ির কাঁটা ঘুরল, রাশিদ চলে গেল মদীনায়। সেখানে নবী (সা.) মসজিদে নববী বানাচ্ছেন। রাশিদ লুকিয়ে শুনল রাসূল (সা.) বলছেন, "সময় আল্লাহর আমানত। এক মুহূর্তও নষ্ট করো না।" হঠাৎ একটা সৈনিক এল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, কুরাইশরা আসছে!" রাশিদ ভয় পেল, কিন্তু দেখল বদরের যুদ্ধ। মুসলিমরা কম, কিন্তু ঈমানের শক্তিতে জয়ী। সময় ফিরিয়ে দিল তাকে বাস্তবে।পরের দিনগুলো রাশিদের জীবন বদলে গেল। সে ঘড়িটা নিয়ে আরও ভ্রমণ করল। একবার গেল হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সময়ে। মিসরের কারাগারে ইউসুফ কয়েদ, কিন্তু ধৈর্য ধরে দোয়া করছেন। "সময় আল্লাহর হাতে, ইউসুফ। তিনি তোমাকে মুক্ত করবেন।" রাশিদ বুঝল, সময়ের পরীক্ষায় তাকওয়াই উত্তর। আরেকবার সে গেল ভবিষ্যতে ২০৫০ সালে। ঢাকা ধ্বংসপ্রাপ্ত, মানুষ ফিরে এসেছে সুন্নাহ জীবনে। তার ছেলে একটা মাদ্রাসায় ইমাম, বলছে, "আব্বু, তোমার সময় নষ্টের জন্য আমরা কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ফিরে এসেছি।"রাশিদ সিদ্ধান্ত নিল অতীত বদলাবে। সে ফিরল তার নিজের যুবককালে, ২০১৮ সালে। তখন সে নামাজ ছাড়ত, বাবার সাথে ঝগড়া করত। এবার সে বাবার কাছে গেল, বাবা আমি ভুল করেছি। চলুন মসজিদে।" বাবা অবাক। কিন্তু ঘড়িটা গরম হলো। সময় তাকে টেনে নিয়ে গেল আরও পিছনে—তার শৈশবে। সেখানে সে দেখল বাবা তাকে কুরআন শেখাচ্ছেন, কিন্তু সে খেলায় মেতে আছে। রাশিদ চেষ্টা করল নিজেকে বদলাতে, কিন্তু সময়ের নিয়ম ভাঙতে গিয়ে বিপদে পড়ল। একটা দুর্ঘটনা সে নিজেই আহত হয়ে পড়ল। বাস্তবে ফিরে সে দেখল, বাবা এখনও অসুস্থ, তার চেষ্টা কিছু বদলায়নি।রাশিদ ভেঙে পড়ল। মসজিদে গিয়ে তাহাজ্জুদ পড়ল। সেখানে স্বপ্ন দেখল রাসূল (সা.) বলছেন, "রাশিদ, সময় তোমার আমানত। তাকে ঈমান ও আমলের জন্য ব্যয় করো। অতীত বদলানো আল্লাহর ক্ষমতা, তোমার নয়।" সে ঘড়িটা ভেঙে ফেলল তখন । কিন্তু ভাঙার পরও তার হৃদয়ে সময়ের শিক্ষা রয়ে গেল। সে দোকান বন্ধ করে মাদ্রাসা শুরু করল। লোকজন আসতে লাগল, শুনতে, কীভাবে সময় তাকওয়ার পরীক্ষা । অনেক দিন পর, রাশিদ তার ছেলেকে বলল, "সময় আল্লাহর নিদর্শন। সূরা আসরের মতো, এটাকে ক্ষতি থেকে বাঁচাতে ঈমান, আমল, তাওহীদ আর সবর দরকার।" ছেলে জিজ্ঞাসা করল, "কিন্তু সময় ফিরে আসে না, আব্বু?" রাশিদ বলল, "আসে, আখিরাতে। সেখানে প্রত্যেক মুহূর্তের হিসাব। আমাদের উচিত সময় থাকতে নিজের কর্ম করে যাওয়া। কখনো ভবিষ্যৎ এর জন্য কোনো কাজ ফেলে না রাখা। সফলকাম তো সে যে সময় থাকতে নিজের কাজ করে ফেলে। সবশেষে রাশীদ তার ছেলেকে বলল -
ওয়াল আসর! সময়ের শপথ নিলেন রব্বুল আলামীন,
নীল নদীর মতো বয়ে চলে, লুকায় আলোর ফসল মধ্যে।
ক্ষণিকের হাসিতে লুকানো শতাব্দীর কান্দন রাত্রি,
ইন্সান খুসরে ডুবে আছে, ঈমান না এলে হয় জাহান্নামী।
চাঁদের আলোয় রাসূল (সা.) এলেন, বদরের রক্তাক্ত মাটিতে,
ইউসুফের কারাগারে জ্বলে উঠল সবরের তারা উজ্জ্বলতায়।
বিলালের বুকে পাথর চাপা, 'আহাদ!' গর্জন আকাশ ছুঁয়ে,
সময় হলো সাক্ষী সেই ঈমানের, যা পাহাড়কেও নড়ায়।
হে মুমিন! তাকওয়ার ফুল ফোটাও এই ক্ষণিকের বাগানে,
আমল সালেহের বীজ বপন করো, হকের নসীহাত ছড়াও ধুলোয়।
সবরের মেঘে বৃষ্টি ঝরুক, জান্নাতের নদী বয়ে আসুক পথে,
সময় তোমার আমানত সোনার, আখিরাতে ফিরিয়ে দেবে রব্বার দোয়ায়।
চক্রাকার ঘুরে ফিরে আসে, কিন্তু শেষ নেই এর যাত্রায়,
বর্তমানকে আঁকড়ে ধরো হৃদয়ে, নষ্ট করো না এই রাত্রি দিনে।
আল্লাহর নূরে আলোকিত হোক প্রত্যেক মুহূর্তের পাতায়,
সময় হয়ে উঠুক পথিকৃৎ, জান্নাতের দরজায় নিয়ে যায়।
লেখক : মোঃ মেহেদী হাসান
সময় : ১৯/২০/২০২৫
দুপুর : ১২:১৫
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।