আগুনের উত্তরাধিকার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরনঃ গদ্যকবিতা
তারিখঃ ৯ নভেম্বর ২০২৫
রাতটা ছিল পুরু, ঘন কালো— যেন চারপাশে অন্ধকারের চাদর টেনে বসে আছে।
তার চোখে তখনও এক টুকরো দিয়াশলাইয়ের শিখা জ্বলছিল—
ছোট্ট, কিন্তু আশ্চর্যভাবে স্পষ্ট,
যেন সেই আঁধারের বুক চিড়ে বেরিয়ে আসা এক ফালি আলো।
ভয় পায়নি সে, বরং মনে মনে হিসেব করছিল দিনের ছোট ছোট ভুলগুলো—
“আজ রান্নাঘরের গ্যাসটা বন্ধ করিনি তো?”
এমনিতেই প্রায়শই ভুলে যায়,
তার ওপর রাতে ক্লান্তি ঘিরে ধরলে মনে রাখা আরও কঠিন হয়ে যায়।
চুলে আগুন লাগেনি,
যদিও রান্নার সময় গরম তেলের এক ফোঁটা কপালে পড়ে গিয়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিল।
সেই ছোট্ট লাল দাগটা এখনো থেকে গেছে— সে মাঝে মাঝে আয়নায় তাকিয়ে দেখে,
আর ভাবে, ওটা যেন তার জীবনের এক টুকরো ইতিহাস, মুক্তোর চেয়ে কম নয়, বরং অনেক দামী।
শহর তখন ধোঁয়ায় ডুবে ছিল না,
বাতাসে ছিল সহজ সরলতার গন্ধ।
চারপাশে পুরনো ভাতের গন্ধ,
অল্প একটু পোড়া ডালের সুঘ্রাণ,
ট্রাফিকের বিরামহীন হর্ন, আর বাজারের দাম নিয়ে নিত্যদিনের টানাটানি—
এসব নিয়েই সবাই ব্যস্ত।
কারও কপালে চিন্তার ভাঁজ নেই,
কেউ ভাবেনি কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে,
বরং দিন যায় দিন আসে,
জীবনের চাকা ঘুরতেই থাকে।
তার হাতের দাগটা পতাকার মতো উড়েনি,
হয়ে গেছে কেবল একটা স্মৃতি— নীরবে বয়ে চলেছে তার অভ্যন্তরে।
মনে পড়ে, সেদিন মা বলেছিল, “আগুন নিয়ে খেলিস না।”
শব্দটা মনে বাজে, বুঝতে পারে—
প্রতিটা নিষেধের ভেতরেও ছিল গভীর মমতা।
সকালে উঠে সে চায়ের কাপে চুমুক দেয়— প্রতিদিনের মতোই, যেন এক নীরব অভ্যাস।
শরীরে এখন আর কোনো ঝড় নেই,
ক্লান্তি নেই, তবু চিনি একটু কম—
ডাক্তারের সাবধানবাণী মাথায় রেখে।
বয়সের ছাপ পড়েছে হাতে—
ভাঙা আঙুল নেই, আছে পুরনো কনুইয়ের ব্যথা, যা মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয় সময়ের অদৃশ্য আঁচড়।
কলম এখন আর মুঠোয় আসে না,
সেই স্বাধীনতা হারিয়ে গেছে; বরং বাচ্চার ছোট্ট হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যায় সে—
নতুন দায়িত্ব, নতুন অর্থে জীবনের মানে খোঁজে।
যারা ভেবেছিল তাকে মুছে দেবে,
তাদের মুখ এখনো শহরের ভিড়ে দেখা যায়।
তারা আজও বেঁচে আছে,
তাদের জীবনও চলছে,
তবে তারা তার নাম ভুলে গেছে—
সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে সেই পরিচয়।
তবু সে নামহীন না,
তার পরিচয় নতুন করে গড়ে উঠেছে।
পাড়ার বাচ্চারা এখন তাকে “আম্মা” বলে ডাকে— এই নামেই সে যেন নতুন জন্ম পেয়েছে।
প্রতিটা নিঃশ্বাসে সে জেগে থাকে,
কারণ ঘুমিয়ে পড়লে চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে যাবে— এটাই তার সহজ অথচ গভীর চিন্তা।
এই ছোট ছোট ভাবনা নিয়েই তার দিন কেটে যায়, জীবন এগিয়ে চলে।
তার স্বপ্নে হাজার চোখ নেই, নেই কোনো অলৌকিক আকাঙ্ক্ষা, আছে একটাই দৃঢ় আলোকবিন্দু।
কাল সকালে মেয়ের জন্য নতুন জুতো কিনতে হবে— এইটুকুই তার আলো, এইটুকুই তার স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু।
ভাষা তার রক্তে নয়, মুখে—
সোজাসাপ্টা বলে, “যত ষড়যন্ত্রই হোক, আমি তো আছি।
চা বানিয়ে দিচ্ছি।”
এই সরল অথচ দৃঢ় উচ্চারণেই সে টিকে থাকে, নিজের জীবনকে প্রতিদিন নতুন করে খুঁজে নেয়, নতুন করে সাহস জোগাড় করে।
তার জন্য প্রতিটি সকাল এক নতুন সুযোগ,
প্রতিটি চায়ের কাপ এক নতুন আশ্বাস।
#আগুনের_উত্তরাধিকার #বিদ্রোহিনী #স্বাধীননারী #দ্রোহের_আলোর #বাংলা_কবিতা #MohammadZahidHossain
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।