ক্ষুধার কাছে কবিতা হেরে যায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
গদ্য কবিতা। ১৬ আগষ্ট, ২০২৬
আমি আর কবিতা লিখব না।
অন্তত এখন না।
কবিতা লিখে কী হবে,
যদি দিনের শেষে নিজের ক্ষুধাটাই মেটাতে না পারি?
অনেক লিখেছি।
ভালোবাসা নিয়ে লিখেছি,
মানুষের কষ্ট নিয়ে লিখেছি, স্বপ্ন নিয়ে লিখেছি। অন্যের না-বলা কথাগুলো নিজের মতো করে লিখে গেছি।
অথচ নিজের অভাবের কথা লিখতে গেলেই কলমটা থেমে যায়।
কোথা থেকে শুরু করব, কীভাবে বলব—কিছুই বুঝতে পারি না।
ক্ষুধার সময় কবিতার কথা মনে থাকে না।
তখন কোনো উপমা মাথায় আসে না,
কোনো সুন্দর শব্দও না।
শুধু মনে হয়,
এখন একটা কবিতার চেয়ে এক মুঠো ভাত অনেক বেশি দরকার।
মানুষ আমার লেখা পড়েছে।
ভালো বলেছে।
প্রশংসা করেছে।
কেউ কেউ কবি বলেও ডেকেছে।
এসব শুনে ভালো লেগেছে, সত্যি।
কিন্তু তারপর সবাই নিজের জীবনে ফিরে গেছে।
কেউ কি একবারও ভেবেছে—যে মানুষটা এত কথা লিখছে,
তার নিজের দিনটা কেমন কাটছে?
কেউ কি জানতে চেয়েছে,
রাত নামার পর তার ঘরে আলো জ্বলে কি না,
চুলায় হাঁড়ি ওঠে কি না,
কিংবা নিজের প্রয়োজনটুকু মেটানোর মতো সামর্থ্য তার আছে কি না?
সমাজ আমার কবিতা দেখেছে,
কবিতার মানুষটাকে দেখেনি।
আমি অন্যের কষ্ট বুঝতে চেয়েছি,
অন্যের চোখের জলকে শব্দ দিতে চেয়েছি।
অথচ নিজের জীবনটাই অনেক সময় ঠিকমতো সামলাতে পারিনি।
এই কথাটা স্বীকার করতে কষ্ট হয়।
তবু সত্যিটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো শক্তি এখন আর নেই।
কবিতা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে।
কিছু মানুষের ভালোবাসা দিয়েছে,
নিজের একটা পরিচয় দিয়েছে।
আবার কখনো কখনো এই কবিতাই আমাকে অদ্ভুত এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—আমি কবি বলেই কি আমার অভাব থাকতে নেই?
আমার ক্ষুধা থাকতে নেই?
আমার জীবনে হিসাব-নিকাশ থাকতে নেই?
কবিতা তো পেট ভরায় না।
এই কথাটা বুঝতে আমার অনেক দেরি হয়েছে।
তাই আজ কলমটা নামিয়ে রাখলাম।
কোনো অভিমান থেকে নয়।
কারও বিরুদ্ধে অভিযোগও নেই।
শুধু ক্লান্ত হয়ে গেছি।
অনেকটা পথ হেঁটে এসে এখন একটু থামতে ইচ্ছে করছে।
আগে জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নিই।
নিজের প্রয়োজনগুলো সামলাই।
ক্ষুধার সঙ্গে, অভাবের সঙ্গে একটু বোঝাপড়া করে নিই।
তারপর যদি আবার কোনোদিন শব্দ এসে পাশে বসে, তাকে ফিরিয়ে দেব না।
হয়তো সেদিন আবার লিখব।
সেদিন হয়তো ভাতের চিন্তা আর কবিতার চিন্তা,
দুটো পাশাপাশি থাকবে।
একটাকে বেছে নিয়ে আরেকটাকে ছেড়ে দিতে হবে না।
আজ তাই কবিতা নয়।
আজ শুধু বেঁচে থাকার কথা ভাবছি।
কারণ এই মুহূর্তে আমার কাছে কবিতার চেয়েও জরুরি,একটা স্বাভাবিক জীবন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।