নিরাপদ শৈশব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৯ জুলাই, ২০২৬
ভয়ে ভয়ে বড় হওয়া কোনো শিশুর প্রাপ্য হতে পারে না।
অভিক কখনো ভাবেনি, নিজের ছেলের মুখে এমন একটা কথা শুনবে, যা তাকে এক ধাক্কায় নিজের ফেলে আসা শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
সেদিন অফিস থেকে ফিরে ব্যাগটা রেখেই সে বলল,
"চল বাবা, বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি।"
সাত বছরের অর্ণব জানালার বাইরে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
"বাবা, দূরে যাব না। এখানেই থাকি।"
"কেন?"
ছেলেটা মাথা নিচু করে ফেলল।
"বাইরে গেলে আমার ভয় লাগে।"
অভিক আর কিছু বলতে পারল না। কথাটা যেন বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আটকে গেল।
তার মনে পড়ে গেল নিজের ছোটবেলার কথা। স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে দৌড়। মাঠ ভর্তি আলো, ধুলো-মাখা বিকেল। গোল্লাছুট, ডাংগুলি, ফুটবল। সন্ধ্যা নামলে উঠোন থেকে মায়ের গলা ভেসে আসত— "অভিক, বাড়ি আয়।"
সেই ডাক না শোনা পর্যন্ত ঘরে ফেরার কথা মনেই পড়ত না।
আর এখন? এখন বাচ্চারা মাঠে নামলে বাবা-মায়ের বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য কাঁটা বিঁধে থাকে। পার্কে গিয়েও চোখ সরানো যায় না। মনে হয়, একটু চোখ সরালেই কিছু একটা হয়ে যাবে।
ছুটির দিনে অভিক অর্ণবকে নিয়ে পাশের পার্কে গেল।
ভেতরে ঢুকেই মনটা দমে গেল। দোলনার একটা পাশ ভাঙা, চারদিকে ছড়িয়ে আছে ময়লা আর শুকনো পাতা। খেলতে আসা শিশুর চেয়ে বেঞ্চে বসে মোবাইলে ডুবে থাকা মানুষের সংখ্যাই বেশি।
অর্ণব দোলনার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"বাবা, এটা ভেঙে পড়বে না তো?"
অভিক বলল, "সাবধানে ওঠো।"
বলেই সে থমকে গেল। আমরা কখন থেকে শিশুদের শুধু সাবধান হতেই শেখাচ্ছি? দোলনায় চড়তেও সাবধান, দৌড়াতেও সাবধান, কথা বলতেও সাবধান।
সেদিনই সে ফিরে এসে এলাকার কয়েকজন বাবা-মাকে ডাকল। সবাই মিলে পৌরসভায় একটা দরখাস্ত দিল। দিন কয়েকের মধ্যেই কাজ হলো। পার্কটা পরিষ্কার করা হলো, ভাঙা দোলনা সারানো হলো। সবাই মিলে ঠিক করল, বিকেলে পালা করে দুজন করে অভিভাবক পার্কে থাকবেন, যাতে বাচ্চারা নিশ্চিন্তে খেলতে পারে। তাদের দেখে রাখার জন্য নয়, তাদের ভরসা দেওয়ার জন্য।
কয়েকদিন পর স্কুলে অভিভাবক সভা।
ক্লাস টিচার বললেন, "একটা জিনিস আমরা রোজ দেখি। অনেক বাচ্চা উত্তরটা জানে, তবু হাত তোলে না। ওদের ভেতরে একটা ভয় কাজ করে— যদি ভুল বলি, সবাই হাসবে, ম্যাডাম বকবে।"
ফেরার পথে কথাটা অভিকের মাথায় ঘুরতে লাগল। নিরাপত্তা কি শুধু রাস্তা আর পার্কের? একটা শিশুর মনটারও তো নিরাপদ হওয়া দরকার। যে নিজের প্রশ্নটাই করতে পারে না, সে শিখবে কী করে?
পরদিন থেকে ক্লাসে একটা ছোট নিয়ম বদলে গেল। ভুল উত্তরের জন্য কাউকে বকা দেওয়া হবে না, কেউ হাসলে তাকে থামানো হবে। বরং যে প্রশ্ন করবে, তাকে উৎসাহ দেওয়া হবে। আস্তে আস্তে ক্লাসের হাওয়াটাই বদলে গেল। বাচ্চারা বুঝতে শিখল, ভুল করা লজ্জার কিছু নয়, ভুলটা শেখারই একটা অংশ।
সেদিন রাতে অর্ণব অঙ্ক করতে বসে একটা ভুল করল। সঙ্গে সঙ্গে খাতা বন্ধ করে চুপ করে বসে রইল।
অভিক জিজ্ঞেস করল, "কী হলো?"
অর্ণব খুব আস্তে বলল, "ভুল করেছি... তুমি রাগ করবে?"
এই একটা প্রশ্নে অভিকের বুকটা কেঁপে উঠল।
সে ছেলের মাথায় আলতো করে হাত রাখল। বলল, "ভুল করেছিস তো কী হয়েছে? আবার কর। আমি তো আছি পাশে।"
অর্ণব আবার খাতা খুলল। তার মুখে ধীরে ধীরে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
সেদিন থেকে অভিক নিজের জন্য একটা নিয়ম বানিয়ে নিল। অফিস থেকে ফিরে আধঘণ্টা সময় শুধু অর্ণবের। ওই সময়টায় কোনো মোবাইল নেই, টেলিভিশন নেই। শুধু গল্প। আজ স্কুলে কী হলো, কার সঙ্গে খেলল, কোনটা ভালো লাগল, কোনটা খারাপ লাগল— সব শোনা। ভুল করলে বকা নয়, ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দেওয়া।
বদলটা রাতারাতি আসেনি, কিন্তু এলো। যে ছেলেটা আগে সব কথা নিজের ভেতর চেপে রাখত, সে এখন প্রশ্ন করে। নিজের মতামত বলে। খেলতে গিয়ে পড়ে গেলে কান্নার আগেই নিজে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।
তখন অভিক বুঝতে পারল, শিশুরা শুধু খেলনা চায় না। তারা এমন কিছু মানুষ চায়, যাদের পাশে দাঁড়ালে ভয়টা একটু কমে যায়।
একটা শিশু শুধু একটা পরিবারে বড় হয় না। তাকে বড় করে তোলে তার চারপাশের মানুষ, তার স্কুল, তার পাড়া, তার খেলার মাঠ, তার পুরো সমাজটা। সেই পৃথিবীটা যদি ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভরা থাকে, তবে তার শৈশবটাও ছোট হয়ে আসে।
আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তান ভালো মানুষ হোক। কিন্তু ভালো মানুষ হওয়ার আগে তার সবচেয়ে বেশি দরকার একটা নিরাপদ শৈশব। এমন একটা পরিবেশ, যেখানে ভুল করলে তাকে অপমান করা হবে না, প্রশ্ন করলে তাকে থামিয়ে দেওয়া হবে না, আর মনের কথা বলতে গিয়ে তাকে ভয় পেতে হবে না।
কারণ নিরাপদ শৈশব কোনো বিলাসিতা নয়।
এটা প্রতিটি শিশুর জন্মগত অধিকার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।