সালটা ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর। আমার ওপেন হার্ট সার্জারির পর অপারেশন টেবিল থেকে সরাসরি আমাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় এবং ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়।
ধীরে ধীরে আমার বায়োকেমিক্যাল প্রোফাইল উন্নতির দিকে যেতে থাকে। তিন দিন পর সুস্থ অবস্থায় আমাকে আইসিইউ থেকে বের করা হয়। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি বেঁচে যাই। আল্লাহ না চাইলে, কিংবা ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে বিলম্ব হলে হয়তো আমাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না।
যে মুহূর্তে আমার চেতনা ফিরে আসে, তখন শুধু বাম হাতের আঙুলটা সামান্য নড়াতে পারছিলাম।
ডাক্তার বললেন,
“চোখ খুলুন, আস্তে আস্তে চোখ খুলুন।”
চোখ খুলে দেখি, আমার স্ত্রী মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার আবার বললেন,
“চিনতে পারছেন?”
আমি “হ্যাঁ” বলতে চাইলাম, কিন্তু মুখে বিশাল নল (ভেন্টিলেশন পাইপ) থাকায় কিছুই বলতে পারলাম না — শুধু আঙুল নেড়ে ইঙ্গিত দিলাম।
গলার মোটা নলটি প্রচণ্ড অস্বস্তি দিচ্ছিল। তীব্র পানির তৃষ্ণায় মনে হচ্ছিল, এখনই যদি এক ফোঁটা পানি না পাই—মরে যাবো!
ভেন্টিলেটরের পাইপ থেকে এমন এক ধরনের দুর্গন্ধ আসছিল, যা আমাকে অতীতের ধূমপানের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছিল। তখনই বুঝলাম, ধূমপানের কুফল কত ভয়াবহ হতে পারে।
নার্সদের ডিউটি পরিবর্তন দেখে আন্দাজ করলাম, তখন রাত ৮টার কাছাকাছি হবে। নতুন দুইজন নার্স দায়িত্ব নিলেন। একজন নার্স আমার গলার রগে বসানো ক্যানুলা থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন, আর ফলাফল লগবুকে লিখে যাচ্ছিলেন।
এদিকে, আমার পানির তৃষ্ণা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। অস্থির হয়ে পড়েছিলাম, শান্তি পাচ্ছিলাম না। এক নার্স আমার মাথার দিকটা একটু উঁচু করে দিলেন। তখন ধীরে ধীরে এনেস্থেশিয়ার প্রভাব কমতে শুরু করল — ফলে ব্যথা অনুভব করতে শুরু করলাম।
প্রথমবার নিজের শরীরের দিকে তাকালাম। বুকের মাঝখানে সাদা ব্যান্ডেজ, বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত ব্যান্ডেজে মোড়া। পুরো শরীর পাইপে জড়িয়ে। বাম পাজরের নিচ থেকে কয়েকটি পাইপ বের হয়ে এসেছে, পেটের ভেতর থেকেও কিছু তার দেখা যাচ্ছে।
ভয় পেয়েছিলাম। নার্স বললেন,
“এগুলো ক্যানেল। এগুলো আপনার শরীর থেকে দূষিত রক্ত ও বর্জ্য বের করছে।”
ব্যথা ক্রমশ বেড়েই চলছিল, কিন্তু ডান-বাম কোন দিকে কাত হতে পারছিলাম না। চিৎ হয়ে শুয়ে ভাবছিলাম — শুধু একটু পানি! একটু পানি!
রাগ হচ্ছিল ডাক্তারদের প্রতি। মনে মনে বলছিলাম এক ফোঁটা পানি দিলে কি এমন ক্ষতি হবে?
নার্স ডাক্তারকে ডেকলেন। ডাক্তার এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“আপনি তো পুরনো রোগী, অনেক দেশের সেরা হাসপাতালের আইসিইউতে থেকেছেন। বোঝার চেষ্টা করুন, এখন যদি পানি দেওয়া হয় তাহলে ফুসফুস ভারি হয়ে যাবে। তাতে বাইপাস ছিঁড়ে যেতে পারে। তাই পানি কাল সকালে দেওয়া হবে। একটু সহ্য করুন।”
তাঁরা চলে গেলেন, কিন্তু তৃষ্ণা কমেনি।
কিছুক্ষণ পর নার্স বললেন,
“আমি ভিজে কাপড় দিয়ে আপনার শরীর মুছে দিচ্ছি, এতে কিছুটা আরাম পাবেন।”
কপালে টিস্যু ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো শরীর খিঁচুনি দিয়ে উঠল। মনিটরে লাল সাইরেন বাজতে লাগল। ডাক্তাররা ছুটে এলেন। প্রফেসর নিজ হাতে ইনজেকশন দিলেন এবং নার্সকে সতর্ক করলেন। তিনি বললেন,
“হার্ট ট্রান্সপ্লান্টেশনের পরে এমনটা হতে পারে। হঠাৎ ঠাণ্ডা পানির সংস্পর্শে নার্ভ সিস্টেম প্রতিক্রিয়া দেখায়, কিন্তু হার্ট সেই চাপ নিতে পারে না। ভাগ্য ভালো, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়নি।”
আমি ভেন্টিলেশন খুলে দিতে অনুরোধ করলে তিনি বললেন,
“যখন অঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখন লাইফ সাপোর্ট দিয়েই জীবন রাখা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গকে সময় দেওয়া হয় যাতে তা পুনরায় কাজ করতে পারে বা প্রতিস্থাপন করা যায়।”
দুই ঘণ্টা পর ভেন্টিলেশন খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি চলে গেলেন। বুক হালকা মনে হলো। ব্যথা সহ্য করে আবার পানি চাইলাম, কিন্তু নার্স বললেন, “আরও একটু পরে।”
তিন ঘণ্টা পর ডাক্তার ভেন্টিলেশন খুলে দিলেন। মনে হলো, গলা থেকে একটি ভারী শিকল খুলে গেল।
কিন্তু তৃষ্ণা এখনও আগুনের মতো জ্বলছিল। ঘুম আসছিল না। ডাক্তারকে ঘুমের ইনজেকশন দিতে বললাম, তিনি নার্সকে নীরবে নির্দেশ দিলেন। নার্স শিরায় ইনজেকশন দিলেন। চোখ ধীরে ভারী হলো, তবে ঘুম আসল না পুরোপুরি।
তন্দ্রার মধ্যে খাবারের ট্রলির শব্দ শুনলাম — বুঝলাম, একটা রাত কেটে গেছে। নার্স দাঁত মেজে দিলেন, মুখ ধুয়ে দিলেন। বুকের ওপর একটি টেবিল রেখে নাস্তা দিলেন — তরল দুধ, হাতে বানানো ব্রেড, আর কলা।
আমি বললাম,
“আমি নিজেই খাবো।”
নার্স হাসলেন,
“আপনি পারবেন না।”
তবু ডান হাতে চামচ ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অবাক! শক্তিটুকুও ছিল না। আমি চামচ ধরার শক্তি পেলাম না। ভেন্টিলেশন খুলে কিছু স্বস্তি পেলেও, তৃষ্ণা এখনও জ্বলছিল।
তৎক্ষণাত নার্সের উপর রাগ জাগল। মনে মনে বললাম — এক ফোঁটা পানি দিলে কি এমন ক্ষতি হবে?
ডাক্তার রাউন্ডে এসে বেডের পাশে গিয়ে মনিটরের সব তথ্য দেখলেন, এবং দায়িত্বরত ডাক্তারকে বললেন,
“আগামী চার ঘণ্টা পানি দেওয়া যাবে না।”
আমি অসহায়ভাবে তাকিয়ে রইলাম।
এনেস্থেশিয়ার প্রভাব কমতে থাকায় পায়ের ক্ষতিপূরণ ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল বুকের দিকে। আমার শরীর তিনটি ক্যানেল ও ক্যাথেটারে আবদ্ধ ছিল। পাইপগুলো যেন আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল।
চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, একটুখানি কাত হয়ে শুতে পারলে স্বস্তি পেতাম। চারপাশে ভয়ের এক নীরবতা।
মনে হলো, দুপুর হচ্ছে। ভিজিটর আসছে। মাথা উঁচু করলে দেখলাম রক্ত দেওয়া হচ্ছে। সম্ভবত তাই পানি নিষিদ্ধ ছিল।
নার্স বারবার রক্ত পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। আমি ডাক্তারকে অনুরোধ করলাম, “একটা ঘুমের ইনজেকশন দিন।” তিনি বললেন, “রাতে দেবো।”
দুপুরের খাবারের ট্রলির শব্দ এলো। নার্স বেডের পাশে এসে ভাত ও খাবার দিলেন। কিন্তু পানি নেই। দু’চামচ খেয়ে ইচ্ছে হারালাম।
হঠাৎ পাশের বেড থেকে মনিটর চিৎকার করে উঠল। ডাক্তাররা ছুটে গেলেন। CPR দিয়ে শক দেওয়া হলো, কিন্তু রোগী ফিরে এলেন না। মৃতদেহ বের করে নিলে ICU আবার নীরব হয়ে গেল।
সেদিন বুঝলাম, মানুষের জীবন কত অল্প, কত ক্ষণস্থায়ী।
ডিউটি ডাক্তার পানি নিষেধের কারণ ব্যাখ্যা করলেন, বেশি পানি শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য নষ্ট করে, ফুসফুসে চাপ বাড়ায়, এবং প্রাণঘাতী ক্ষতি করতে পারে।
তখনই আমার পানির প্রতি আকর্ষণ হঠাৎ কমে গেল।
রাত ভীষণ দীর্ঘ লাগছিল। ডাক্তারকে ঘুমের ইনজেকশন চাইলাম। নার্স শিরায় ইনজেকশন দিলেন। চোখ ভারী হয়ে এল, এবং আমি হারিয়ে গেলাম অচেনা ঘুমের জগতে।
ঘুম ভাঙলো মনিটরের টিকটিক শব্দে। আজ সেটা ভয়ের নয় — বরং মনে হলো, এটি জীবনের ছন্দ।
চোখ খুলতেই ভোরের নরম আলো এসে পড়ল ICU-তে। নার্স রক্তচাপ মাপলেন, হালকা হাসি দিলেন, “আপনি অনেক ভালো আছেন।”
আমি কথা বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু গলা শুকিয়ে ছিল। নার্স তুলোয় ঠোঁট ভিজিয়ে দিলেন — সেই এক ফোঁটা পানি মরুভূমিতে বৃষ্টির মতো লাগল।
আজ ব্যথা কিছুটা কমে গেছে। মনে হলো, হয়তো আমি বেঁচে যাব।
ডাক্তার রাউন্ডে এসে বললেন,
“আপনার অবস্থা স্থিতিশীল। সন্ধ্যার মধ্যে সিসিইউ-তে স্থানান্তর হবে।”
বিকেলের আলো ঘরে ভেসে এলো। পাশের বেডে নতুন রোগী এসেছে, অক্সিজেন মাস্ক পরে। আমি মনে করলাম, একসময় আমিও এমন ছিলাম, নিঃশ্বাসহীন, অন্ধকারে।
নার্স বললেন,
“আপনাকে প্রস্তুত হতে হবে।”
তারা ধীরে ধীরে আমার শরীর থেকে সমস্ত পাইপ ও নল খুলে নিলেন। মনিটরের শব্দ যেন বলছে, “তুমি পারছ, তুমি জীবিত।”
বেড ধীরে ধীরে সিসিইউর দিকে এগোল। মনে হলো, আমি এক মৃত্যুর উপত্যকা পেরিয়ে নতুন জীবনে পা রাখছি।
সবকিছু শান্ত, তবে বুকের ভিতরে এক অজানা সুর বাজছে — হয়তো জীবনের গান, হয়তো অসমাপ্ত এক গল্প।
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম —
"হে জীবন, এবার একটু শ্বাস নিতে দাও…"
বেড সিসিইউর দিকে এগোতে লাগল।
#আইসিইউ_ডায়েরি #জীবনের_লড়াই #বাস্তব_গল্প #ভেন্টিলেটর_অভিজ্ঞতা #লাইফসাপোর্ট #বাংলা_ছোটগল্প #হৃদয়স্পর্শী #জীবন_ও_মৃত্যু #মোহাম্মাদ_জাহিদ_হোসেন #মানুষের_মূল্য #সাহিত্য #প্রেরণার_গল্প #আইসিইউ_অভিজ্ঞতা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।