হাতের চামচ ধরার মতো জোরও পেলাম না।
গলার মধ্যে থাকা নলটি (ভেন্টিলেশন) খোলার পর কিছুটা স্বস্তি পেলেও, পানির তৃষ্ণায় তখনও আমার প্রাণটা যেন শেষ হয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক সে সময় নার্সের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। মনে মনে বললাম,
— “একটু পানি দিলে কী এমন ক্ষতি হবে?”
ডাক্তার রাউন্ডে এলেন। আমার বেডের পাশে এসে মনিটরের সবকিছু দেখলেন। তারপর দায়িত্বরত ডাক্তারকে বলে গেলেন,
— “আগামী চার ঘণ্টা কোনোভাবেই তাকে পানি দেওয়া যাবে না।”
এই কথা শুনে অসহায়ের মতো আমি শুধু ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
চেতনানাশক ওষুধের প্রভাব কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের কাটা অংশে ব্যথা অনুভব করতে শুরু করলাম। সেই ব্যথা ধীরে ধীরে বুকের কাটা দিকেও ছড়িয়ে পড়ছিল।
আমার শরীরে তখনও তিনটি ক্যানেল লাগানো, ক্যাথেটার তো আছেই।
সেসব পাইপ আমার পুরো শরীরকে যেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে।
চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না। মনে হয়, যদি একটুখানি কাত হয়ে শুতে পারতাম—কেমন স্বস্তি মিলত! কিন্তু সে উপায় নেই।
চারদিকে এক ভয়াবহ নিরবতা। সেই নিরবতা যেন আমার বুকের ভেতর ভর করে বসেছে।
চেষ্টা করেও ঘুম আসছে না। চোখের পাতা ভারী হতে না হতেই শরীরের ব্যথা আবার জেগে ওঠে—প্রচণ্ড তাণ্ডবে।
আন্দাজ করলাম, হয়তো দুপুর হবে। কারণ দেখলাম, কয়েকজন ভিজিটর ভিতরে এসেছে।
মাথা উঁচু করে দেখি—আমাকে রক্ত দেওয়া হচ্ছে। সম্ভবত সেই কারণেই ডাক্তার পানি দিতে নিষেধ করেছেন।
এদিকে নার্স বারবার আমার গলার ক্যানোলা থেকে সিরিঞ্জে করে রক্ত নিচ্ছেন, আর ফলাফল বড় এক লগবইয়ে লিখে রাখছেন।
ডিউটি ডাক্তার কাছে এসে অনুরোধ করলাম—“একটা ঘুমের ইনজেকশন দিন।”
তিনি হেসে বললেন,
— “রাতে দেবো।”
এমন সময় খাবারের ট্রলির শব্দ পেলাম। বুঝলাম—দুপুরের খাবার এসেছে।
আমার বেডের পাশে এসে খাবার রেখে গেল নার্স।
আমার জন্য ছিল দুইজন নার্স—একজন মনিটর পর্যবেক্ষণ করছেন, অন্যজন অন্যান্য কাজ সামলাচ্ছেন।
একজন এসে আমার মাথার দিকের বেডটা একটু উঁচু করে দিলেন। কারণ, এবার আমাকে দুপুরের খাবার দেওয়া হবে।
খাবারের মেন্যুতে ছিল নরম ভাত।
কিন্তু আমার যেটা সবচেয়ে প্রয়োজন—সেই পানি, কোথাও নেই।
নার্স চামচে করে অল্প অল্প করে মুখে ভাত দিচ্ছিলেন। দু’চামচ খাওয়ার পরই আর খেতে ইচ্ছে করলো না।
নীরবতা ছুঁয়ে যাচ্ছিল চারদিক।
ঠিক তখনই, পাশের বেডের রোগীর মনিটর প্রচণ্ড শব্দ করে উঠল।
সব ডাক্তার ছুটে গেলেন তার দিকে।
দু’জন ডাক্তার দ্রুত তার বুকে চাপ দিতে লাগলেন—সম্ভবত সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।
তাকে কার্ডিও-পালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) দেওয়া হচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পরও কোনো সাড়া মিলল না।
তারপর দেখলাম, তাকে শক দেওয়া হলো।
তবুও কিছুই হচ্ছে না।
কিছু সময় পরেই সব শান্ত।
বুঝলাম—রোগী না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
অদ্ভুত ব্যাপার—এত কাছে থেকে একজন মানুষের মৃত্যু দেখলাম, অথচ নিজের মনে সামান্যতম ভয়ও কাজ করল না।
বরং মনে হলো, আমার নিজের ব্যথাগুলো যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
মনটা কিছুটা বিষণ্ন হলো।
অজান্তেই নিজের শরীরের ত্রুটিগুলো খুঁজে দেখতে শুরু করলাম।
বুঝতে পারলাম না—একজন মানুষ এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, অথচ চারপাশের কারও কাজের এতটুকু ব্যাঘাত ঘটল না।
মৃতদেহসহ বেডটি টেনে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো, তারপর আবার সব স্বাভাবিক!
মনে হলো—এখানে কিছুই ঘটেনি।
সেদিন প্রথম সত্যিকারের উপলব্ধি হলো—মানুষের জীবনের মূল্য কত অল্প, কত ক্ষণস্থায়ী।
এভাবেই জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে কাটছিল আমার প্রথম দিন।
কিছুক্ষণ পর ডিউটি ডাক্তার এসে বললেন,
— “দেখলেন? অতিরিক্ত পানি পান করলে কী ভয়ংকর অবস্থা হতে পারে!”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
ডাক্তার বললেন,
— “খুব বেশি পরিমাণে পানি পানের ফলে শরীরে তরলের পরিমাণ বেড়ে যায়, ভারসাম্য নষ্ট হয়। অতিরিক্ত পানি শরীরের সোডিয়াম (লবণ) কমিয়ে দেয়, ফলে অন্যান্য ইলেক্ট্রোলাইট পাতলা হয়ে যায়। সদ্য অপারেশনের পরে সেই রোগীর গ্রাফটিং অংশে ফুসফুসের ভেজা চাপ গিয়ে এমন বিপর্যয় ঘটিয়েছে। নার্সদের বারণ সত্ত্বেও তিনি অনবরত পানি খেয়ে গেছেন।”
তিনি আরও বললেন,
— “মাত্রার অতিরিক্ত পানি পানে কিডনি অতিরিক্ত জল নিষ্কাশন করতে পারে না। এতে শরীরে হাইপোনেট্রেমিয়া নামক অবস্থা হয়—যখন রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা এতটাই কমে যায় যে, মস্তিষ্কের কোষ ফুলে যেতে থাকে। তখন খুলির ভেতর চাপ বাড়ে। খিঁচুনি, কোমা—শেষ পর্যন্ত মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।”
সব শুনে আমার পানির প্রতি আগ্রহ মুহূর্তেই হারিয়ে গেল।
ধীরে ধীরে সময় গড়াতে লাগলো।
ডাক্তার, নার্স—সবাই তাদের ডিউটি পরিবর্তন করলো।
আর আমি পড়ে রইলাম, নিঃসঙ্গ এক রুগি হিসেবে আইসিইউর নিস্তব্ধ কক্ষে।
রাত ঘনিয়ে এলো। তবুও ঘুম কিছুতেই আসছে না।
আবার বললাম ডাক্তারকে,
— “একটা ঘুমের ইনজেকশন দিন।”
তিনি নার্সকে ইশারা করলেন।
আমি দেখলাম, নার্স স্যালাইনের ভিতর থেকে কিছু তরল টেনে নিয়ে আমার শিরায় ইনজেকশন পুশ করলেন।
বুঝতে পারলাম—এটা ঘুমের ইনজেকশন নয়।
তবুও চোখের পাতাগুলো ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো।
আর আমি হারিয়ে গেলাম ঘুমের অচেনা, শান্ত এক জগতে...
(চলবে...)
#আইসিইউ_ডায়েরি #জীবনের_লড়াই #বাস্তব_গল্প #ভেন্টিলেটর_অভিজ্ঞতা #বাংলা_ছোটগল্প #হৃদয়স্পর্শী #লাইফসাপোর্ট #মোহাম্মদ_জাহিদ_হোসেন #মানুষের_মূল্য #জীবন_ও_মৃত্যু #মোহাম্মদজাহিদহোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।