ঘুম ভাঙলো মনিটরের টিকটিক শব্দে।
আজ সেই শব্দটা আর ভয়ের নয়— বরং মনে হলো, এই টিকটিকই আমার জীবনের ছন্দ, আমার বেঁচে থাকার প্রমাণ।
চোখ খুলতেই দেখি, আলোটা কিছুটা নরম। জানালার ধারে ভোরের আলো আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ছে।
নার্স ধীরে ধীরে আমার রক্তচাপ মাপছেন, মুখে হালকা হাসি।
“আজ অনেকটাই ভালো আছেন আপনি।”
তার কণ্ঠে যেন আশ্বাসের নরম পরশ।
আমি কিছু বলতে চাইলাম, কিন্তু গলা শুকিয়ে কাঠ। ঠোঁট নড়ল, শব্দ বের হলো না।
নার্স বুঝে গেলেন, তুলোয় সামান্য পানি ভিজিয়ে আমার ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিলেন। সেই একফোঁটা পানি যেন মরুভূমির মাঝে হঠাৎ পাওয়া বৃষ্টির মতো।
আজ শরীরে ব্যথা কিছুটা কম। বুকে যেন হালকা বাতাস বইছে, মনে হলো, হয়তো আমি বাঁচব— সত্যিই বাঁচব।
ডাক্তার রাউন্ডে এলেন। মনিটরের স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে বললেন,
“আপনার অবস্থা অনেকটাই স্থিতিশীল। সন্ধ্যার মধ্যে হয়তো আপনাকে সিসিইউ-তে স্থানান্তর করা হবে।”
আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মনে হলো, যেন কেউ আমাকে মৃত্যুর দরজা থেকে টেনে জীবনের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
বিকেলের আলো ঘরে এসে পড়েছে। চারদিকে এক শান্ত সোনালি আভা। আমি মাথা ঘুরিয়ে পাশের বেডের দিকে তাকালাম—
যে বেডটা কালও খালি ছিল, আজ সেখানে নতুন একজন রোগী এসেছে।
তার মুখে ভয়, বুকের ওপর অক্সিজেন মাস্ক।
দেখে বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
একসময় আমিও তো এমনই ছিলাম—
অন্ধকারে ডুবে থাকা এক নিঃশ্বাসহীন শরীর।
নার্স এসে বললেন,
“আপনাকে এখন একটু প্রস্তুত হতে হবে, স্যার।
আর কিছু সময় পরেই আপনাকে সিসিইউতে নিয়ে যাওয়া হবে।”
আমার চোখের কোণে অদ্ভুত এক আলো ঝলমল করে উঠলো।
বাঁচার আকাঙ্ক্ষা, মুক্তির স্বাদ, আর অজানা এক ভয়—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি।
তারা আমার বেডের চারপাশের তারগুলো খুলে নিচ্ছে। প্রতিটি নল, প্রতিটি পাইপ খুলে ফেলছে ধীরে ধীরে, যেন খুব যত্ন করে কারও দেহ থেকে বেঁধে রাখা শৃঙ্খল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মনিটরের শব্দ এবার অন্য রকম লাগছে—
যেন বলছে, “তুমি পারলে, তুমি এখনও জীবিত।”
বেড সরানো হলো। আমি অনুভব করলাম, ধীরে ধীরে আইসিইউর সেই ঠান্ডা কাচের দরজাটা পেছনে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তার ওপাশে এক নতুন দরজা—সিসিইউ।
বেড যখন সিসিইউর দিকে গড়াচ্ছে, মনে হলো—
আমি যেন এক মৃত্যুর উপত্যকা পেরিয়ে অন্য জীবনের সীমানায় পা রাখছি।
সবকিছুই এখন শান্ত, তবু বুকের ভিতরে ঢেউয়ের মতো কিছু একটা বাজছে—
হয়তো সেটা জীবনের গান, হয়তো এখনও অসমাপ্ত এক গল্পের সুর।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। মনে মনে বললাম—
“হে জীবন, এবার একটু শ্বাস নিতে দাও...”
আর বেডটা ধীরে ধীরে সরে গেল সিসিইউর দিকে।
#আইসিইউ_জীবনের_গল্প #বাস্তব_অভিজ্ঞতা
#জীবন_ও_মৃত্যুর_সীমান্ত #মোহাম্মদ_জাহিদ_হোসেন #ছোটগল্প #সাহিত্যিক_প্রবন্ধ #বাংলা_সাহিত্য
#সিসিইউ_যাত্রা #বেঁচে_ফেরার_গল্প
#সমাপ্তি #মোহাম্মদজাহিদহোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।