স্মৃতির খেরোখাতায় আঁকা ডিসেম্বরের পাতা
—রফিক আতা—
তোমার মনে পড়ে কি সেই ডিসেম্বরের কথা যেখানে সমাপ্ত হতো একটি ক্লাসের নাম-খোদাই করা টেবিলের পথ। যেই ডিসেম্বরে এসে হারিয়ে ফেলতাম কতো কাছের চেনা বন্ধুকে—কেউ হয়তো আর ফিরত না আগের বেঞ্চের সেই ঠিকানায়, কেউ বদলে ফেলত বই, স্কুল, এমনকি স্বপ্নের চেহারাও।
আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকতাম এক বিভ্রান্ত সন্ধিক্ষণে— পুরোনো-নতুনের ধূসর সীমানায়।
ডিসেম্বরে এসে নতুনত্বের মোহে পুরানার ঘ্রাণ ভুলে যেতাম, তবুও এজন্য কোন তাপ-অনুতাপ, কোন আফসোস জমতে পারতো না। ছিল না কান্না, অভিমান, কিংবা হাহাকার। কারণ আমার কাছে ডিসেম্বর ছিল একান্ত নিজের— স্বপ্ন দেখার, দিন গোনার, পরীক্ষা শেষ হওয়ার প্রতীক্ষায় ব্যাকুল হবার সময়।
বেশ তাড়াহুড়ো থাকতো ডিসেম্বরের সেই বয়সে— কখন শেষ হবে পরীক্ষার শেষ পাতা? কখন ইশকুল ঘোষণা দেবে— “আজ থেকে ছুটি”? আর কখন হেমন্তের টাটকা ঘ্রাণ মেখে নানা বাড়ির পথে রওনা দেবো! মেঘলা সকালের তীব্র শীতও তখন থামাতে পারতো না আমাদের উচ্ছ্বাস।
ডিসেম্বর মানেই ছিল—
ঢোলের মতো ধুকপুক করতে থাকা হৃদয়, আদুরে শীতের দুপুরে রোদ পোহানোর সুখ, নতুন বছর আসছে এই আনন্দে খাতা-কলমে নতুন নাম লিখে ফেলার উত্তেজনা। পকেটভর্তি নতুন গল্প, নতুন খাতার প্রথম পাতায় কাঁপা হাতের স্বাক্ষর, আর পুরোনো ক্লাসের জন্য অজানা-অপ্রকাশ্য এক শূন্যতা।
তখন ডিসেম্বর মানেই ছিল মাঠের কচি ঘাসে দৌড়ঝাঁপ, বিকেলের শেষ আলোয় লাঠি পেটানো ক্রিকেট ব্যাটের শব্দ, আর মাটিতে গড়াগড়ি খেলে ক্লাসের শেষ দিনে জামায় লেগে থাকা ধূলোর গন্ধ। ছুটির খাতার ফাঁকে ফাঁকে আমরা জমা রাখতাম কাগজের তৈরি ক্ষুদে-বিমান, যেগুলো উড়ে যেত ঠিক আমাদের অসমাপ্ত স্বপ্নের মতো।
সন্ধে হলেই পাড়ার মসজিদ থেকে বেজে উঠতো মৃদু আজানের সুর। আমরা দৌড়ে যেতাম নামাজ শেষ করে আবার খেলায় ফিরতে— যেন রাতের অন্ধকারও আমাদের কাছ থেকে শৈশবকে কেড়ে নিতে না পারে। ডিসেম্বরের শীতে আঙুল জমে আসলেও, বন্ধুদের হাসির উষ্ণতা সেই শীতকে ভুলিয়ে দিত চোখের পলকে।
আজ বুঝি—
ডিসেম্বর শুধু ছুটি নয়, পরীক্ষার অপেক্ষা নয়,
বরং শৈশবের লুকানো দরজা— যেখানে ঢুকলে ফিরে আসে সেই গন্ধ, পুরোনো বেঞ্চের কাঠের সোঁদা পরিচয়, বন্ধুত্বের অদলা-বদলি হাসি, কাগজের তৈরি বিমান আর কাঁচা বয়সের সরল বিশ্বাস।
তবুও, শিশু মনে ডিসেম্বর আজো অচেনা নয় স্মৃতির অ্যালবামে সে রয়ে গেছে চুপচাপ, আলো- অন্ধকারে মিলেমিশে। হাসির আড়ালে লুকানো নীরব কিছু হাহাকার, আর বিদায়ের ভীড়ে ভেসে আসা অসীম ছুটির এক মধুর কোলাহল হয়ে। সময়ের পরম্পরায় ডিসেম্বরেরা ফিরে ফিরে আসে, কেবল ফিরে আসেনা মধুর সেই শৈশব, ছোট্ট বেলার পকেট ভর্তি গল্প। আর ফিরে আসেনা সেই মাটির গন্ধ। তবুও আমি লেখার মাঝে খুঁজে নিতে চেষ্টা করি হারিয়ে ফেলা দিন, হারিয়ে ফেলা ক্ষণ, হারিয়ে ফেলা ডিসেম্বর।
স্মৃতিলিপি
এক, বারো, পঁচিশ ইং
সোমবার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।