একুশের গল্প
শাকেরা বেগম শিমু
-----
তড়িৎ হাতে শরবতের গ্লাসটা আলম খানের দিকে এগিয়ে দিলেন মারিয়া বানু। শত ব্যস্ততার মধ্যেও স্বামীর প্রতি দেখভাল এ তার বিন্দুমাত্র ত্রুটি হয়না। সাথে দুই ছেলেরও বাড়তি দেখাশুনা করেন। কেননা তারা দু'জন এখন বাবার কাছে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। পাকিস্তানি হানাদারদের কাছ থেকে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা রক্ষার জন্য তারা দু'জনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে যাবার জন্য তৈরি। তাই এসময় তাদের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখা ও যত্ন নেয়াতে মারিয়া বানু কোন কার্পণ্য করেন না। একে তো নিজের স্বামী ও দুই নয়নের মণি দুই ছেলে। সাথে ওরা তিনজনই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা। ওদের ঠিকমতো যত্ন না নিলে চলে? তাই মারিয়া প্রতি সকালে পাকাপোক্তভাবে জলযোগের পরও প্রতি ঘণ্টায় তাদের হালকা নাস্তাসহ ঠান্ডা শরবত দেন। কখনো বা হালকা নাস্তার সাথে চা ও। এখন আলম খান হাত বাড়িয়ে শরবত নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলেন-
:আমার দুই পোয়ায় শরবত খাইছইন নি তে?
:অয় তারা খাইছইন। খাইয়া তারা এখন আরাম কররা। তুমিও খাও, খাইয়া থুরা ঠান্ডা বাতাসো বইয়া আরাম করো। গরমে তো একোবারে ঘামিগেছো উ।
:আচ্ছা, তারারে কইও একটু পরে আমার লইয়া আনা প্লাস্টিকর তলোয়ার দু'খান লইয়া 'অ-নো' আইতা। তারারে আইজ কু যুদ্ধ করার নয়া একটা প্রশিক্ষণ হিকাইমো।
:আচ্ছা, কইমু তারারে। এখন যাই আমি। পাকঘরও তরকারী নষ্ট অইযাইবো।
:আচ্ছা যাও। মাহিন আর তুহিনরে কইও জলদি আইতা।
ইতিমধ্যে মাহিন ও তুহিনের পরিচয় জেনে নিই। ওরা দু'জন আপন দুই ভাই। এবং দু'জনেই সবল ও শক্তপোক্ত শরীরের অধিকারী দুই সাহসী তরুণ। মাহিনের বয়স বাইশ ও তুহিনের বয়স বিশ বছর। ওদের বাবা আলম খান একজন দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা। ওরা দু'ভাইও ঠিক সেইরকমই। অনেকটা বলা যায়- 'যোদ্ধাবাবার যোগ্য ছেলে দু'জন মাহিন/তুহিন।
মনের ভেতর যুদ্ধের বীজ, সাহস বনও গহীন।'
দু'জনে এখন বাবার সাথে বাড়ির পেছনের ফাঁকা দালানটাতে যুদ্ধের ট্রেনিং নিচ্ছে। কেননা এখন চলছে ভাষা আন্দোলনের সময়। কখন জানি হানাদারেরা তাদের বাড়িই না আক্রমণ করে বসে! তাই আগেভাগেই ছেলে দুটোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে রাখছেন আলম খান। তিনি নিজেও একজন দক্ষ ও চৌকস কুস্তিগীর। ছোটবেলায় শখ করে শিখলেও এখন তা যথার্থই কাজে আসছে। এখন ছেলে দুটোকে তৈরি করে নিতে পারলেই হলো।
আলম: মাহিন তুহিন, দোয়োজন এ এখন তলোয়ার দিয়া কুস্তি আরম্ভ করো। যেলা দেখাইছি ঠিক ওলা।
মাহিন ও তুহিন: আচ্ছা আব্বা, এখনো আরম্ভ করিয়ার।
দু'ভাইয়ে তখন বেশ যুদ্ধ জমে গেলো। দেখতে মনে হচ্ছিলো "আলিফ লায়লা"র দুই রাজপুত্র কোন রাজ্যের শাহজাদীকে পাওয়ার জন্য প্রাণপনে লড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ কাউকে কাবু করতে নাহি পারে। সমানে সমান।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চললো দু রাজপুত্রের আপ্রাণ লড়াই। ইতিমধ্যে মারিয়া বানু আবার চা-নাস্তা নিয়ে হাজির।
------
আজ আলম খান তার দুই বেটা নিয়ে যুদ্ধের পথ ধরেছেন। তাদের গাঁয়ের আরো দশ-বারোটা পরিবারের পুরূষরাও আজ যুদ্ধার বেশে বেরিয়ে পড়েছেন। ওরা সকলেই একসঙ্গে যুদ্ধের সরঞ্জাম নিয়ে অনেক দূরের এক গ্রামে তাবু গাড়লেন। পরদিনই তারা যুদ্ধের জন্য তৈরি করে আনা সবুজ রঙের ও গাছপালার কারুকার্য করা পোষাকগুলো পরে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আলম, তার দুই ছেলে ও আরো চারজন সিলেটের পাহাড়ি অরণ্যের মধ্যে লুকিয়ে হানাদার বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে লাগলেন। প্রথমদিনেই তাদের আক্রমণে আঠারো জন হানাদারকে তারা জাহান্নামের অতল গহ্বরে পাঠিয়ে দিলেন। পরের দিন আরো সাঁতাশজন। এর পরেরদিন আরো ছত্রিশজন। এভাবে কেটে গেলো পাঁচ পাঁচটি মাস। প্রতিবারই তারা সফলতার সাথে যুদ্ধ করে অনেক শত্রুকে মৃত্যুনিদ্রায় শুঁইয়ে দিয়ে এসেছেন। আলম তাদের চারজন সঙ্গি অর্থাৎ মারুফ মিয়া, বিলাল হোসেন ও তাদের দু'জনের ছেলে আনোয়ার ও মনিরুলকে ডেকে পাঠালো। ওরা এলে আলম বললেন-
:দেখো সাথীহখল, আমরা ওউ কয়েকমাসে আল্লাহর রহমতে প্রায় ষোল'শো বারো জনরে জাহান্নামো পাঠাই দিছি। ইনশাআল্লাহ আল্লাহর রহমতে সামনে দি আরো যাইবা। এখন আমরা একটু জায়গা বদলাইলে কিলা অয়?
মারুফ: তা ভালাউ অয়। কিন্তু আমি কইয়ার বনো থাকি যুদ্ধ করা বহুত সহজ ভাই। জঙ্গলো কেউ দেখেওনা সহজে। আমরা সোজা ভাবেউ সবটিরে মারতে ফারি। তাই বনো থাকি যুদ্ধ করাটাউ আমার কাছে ভালা লাগের।
একথায় তাদের তিনজনের চার ছেলেই একসঙ্গে বলে উঠলো-
:ঠিক, ঠিক কথাও কইছইন আপনে। আপনারা তিনজন নায় জঙ্গলোও থাকক্কা আমরা চারজন এ এখন ময়দানো গিয়া যুদ্ধ করমো।
:না মাহিন, ইকটা অয়না, ছোটবেলা থাকি আমার শখ দুশমন রে সামনা সামনি ঘায়েল করার। এখন একটা সুন্দর সময়ও। এইসময় আমি পারতাম নায় চোরোর লাখান জঙ্গলোর বিথরে লুকাইয়া যুদ্ধ করতাম। কাইলকো আমরা সবে একলগে গিয়া ময়দানো যুদ্ধোত লামমু। একলগে সামনা সামনি শত্রুর মোকাবেলা করা লাগবো।
সবে মাথা নেড়ে এতে সায় দিলো।
আজ ১৪ই ডিসেম্বর। আলম খান ও তার টিম একসাথে শত্রুর মুখোমুখি লড়াই করছে। একটি পাঞ্জাবী বিলাল হোসেন কে ধরাশায়ী করে ফেলেছিলো। তার দিকে বন্দুক তাক করতেই আলমের বন্দুক থেকে বেরুনো গুলিতে পাঞ্জাবীটার বুক ঝাঁঝড়া হয়ে গেলো। এবং সে যাত্রায় বিলাল প্রাণে বেঁচে গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই পাঞ্জাবীদের মারা একটি বুলেট এসে আলম খানের বুকে লাগে। তিনি ঢলে পড়েন মাটিতে। ইতিমধ্যে মাহিন ও তুহিনের ছোড়া একরাশ গুলিতে শত্রুদ্বয়ের সবকটা জানোয়ার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। বাকি তিনজন তখন অন্যদিকে যুদ্ধে ব্যস্ত।
মাহিন চিৎকার দিয়ে উঠলো-
:আব্বা আ আ আ.......!
তুহিন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কান্না শুরু করলো।
আলম খানের হাতের ইশারায় দু ভাই দৌঁড়ে বাবার কাছে গেলো। বাবা বললেন-
:সোনা মানিক আমার! কান্দো কেনে? ই মউত শাহাদাতোর মউত। যার লাগি আমি সারাজীবন অপেক্ষা করছি। তোমরা লড়াই করিয়া যাও। আর তোমরার মা'র দিকে খেয়াল রাখিও বাপ।
এই বলে তিনি কিছুটা কেঁপে উঠলেন। তারপর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ " পাঠ করে তলিয়ে গেলেন অতল ঘুমে, যে ঘুম ভাঙবে না কিয়ামত পর্যন্ত।
------
আজ ১৬ ডিসেম্বর বিকালবেলা। সবাই বিজয়ের আনন্দে উল্লাশ করছে। শুধু মাহিন ও তুহিনের বুকের কোণে একটা চিনচিনে ব্যাথা। তাদের একদিকে বিজয়ের আনন্দ, অপরদিকে আপনজন হারানোর বেদনা। তারা তাদের মা'কে নিয়ে আলম খানের কবর জিয়ারত করে আসলো। সবার মতো শহীদ মিনারে না গিয়ে তারা বাড়ি এসে প্রত্যেকে এক পারা করে কোরআন তিলাওয়াত করে আলম খানের রূহের উপর বখশে দিলো। কেননা তারা বাবার কাছ থেকেই জেনেছে যে 'এসব দুনিয়াবী সম্মান আখেরাতের কোন কাজে আসবেনা।' সেখানে কাজে লাগবে শুধু ঈমান, নেক আমল ও নেক স্ত্রী ও সন্তানদের করা মাগফেরাত।।।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।