দারুণ। এই গল্পটাকে আমি এমনভাবে লিখব যেন
পর্ব ১: কালোছায়া গ্রামের প্রথম রক্ত
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। আকাশে চাঁদ নেই, মেঘও নেই। তবুও কালোছায়া গ্রামের ওপর এমন এক অদ্ভুত অন্ধকার নেমে এসেছে, যেন আলো নিজেই এই গ্রামে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে।
হঠাৎ গ্রামের দক্ষিণ পাশের বাঁশঝাড় থেকে ভেসে এল এক নারীর আতঙ্কিত চিৎকার।
"বাঁচাও...! কেউ আছে...!"
চিৎকারটা একবারই শোনা গেল। তারপর সবকিছু আবার নিস্তব্ধ।
ভোর হতেই গ্রামের কয়েকজন কৃষক মাঠে যাওয়ার পথে বাঁশঝাড়ের পাশে জটলা দেখতে পেল। কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে যেতেই তাদের মুখ থেকে একসঙ্গে আতঙ্কের চিৎকার বেরিয়ে এল।
মাটির ওপর পড়ে আছে একজন মানুষের দেহ। কিন্তু তাকে শুধু "লাশ" বললে ভুল হবে। তার বুকের পাঁজর যেন ভেতর থেকে ছিঁড়ে খুলে দেওয়া হয়েছে। ডান হাতটা প্রায় পঁচিশ ফুট দূরে পড়ে আছে। মুখের অর্ধেক অংশ নেই, অথচ আশপাশে খুব বেশি রক্তও নেই। যেন রক্ত কোথাও হারিয়ে গেছে।
গ্রামের মানুষ কেউ এগোতে সাহস পেল না। সবাই দূর থেকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বলছিল,
"এটা মানুষের কাজ না..."
খবর পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেল। তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন ইন্সপেক্টর মারুফ।
তিনি বহু খুনের মামলা দেখেছেন। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে তাঁরও কয়েক সেকেন্ড কথা বন্ধ হয়ে গেল।
ফরেনসিক টিম পুরো এলাকা ঘুরে দেখল। আশ্চর্যজনকভাবে কোনো পশুর পায়ের ছাপ নেই। মানুষের জুতার ছাপও নেই। লাশের আশেপাশে সংগ্রামের কোনো স্পষ্ট চিহ্নও নেই।
একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিচু গলায় বললেন,
"স্যার... ক্ষতগুলো এমন যে মনে হচ্ছে বিশাল কোনো প্রাণী ছিঁড়ে ফেলেছে। কিন্তু দাঁতের দাগ মিলছে না। আবার ধারালো অস্ত্রের কাটাও না।"
মারুফ শুধু বললেন,
"রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত না।"
সেদিন বিকেলেই খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। শিরোনাম একটাই,
"কালোছায়া গ্রামে রহস্যময় মৃত্যু। মানুষ, নাকি অজানা কোনো প্রাণীর আক্রমণ?"
ঢাকায় বসে খবরটা পড়ছিল ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র মেহেদী। পাশে তার বন্ধু সৌরভ।
সৌরভ ফোনটা নামিয়ে বলল,
"দেখেছিস? সবাই বলছে কোনো অভিশাপ নাকি।"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"অভিশাপের আগে আমি সবসময় মানুষকে সন্দেহ করি।"
মিতু হেসে উঠল।
"তুই সবকিছুর পেছনেই বিজ্ঞান খুঁজিস।"
"কারণ বিজ্ঞান না থাকলেও কারণ থাকে।"
শাহীনুর এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার বলল,
"কিন্তু যদি সত্যিই ব্যাখ্যা না থাকে?"
মেহেদী জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিল,
"যে ঘটনাকে মানুষ ব্যাখ্যা করতে পারে না, তাকেই অলৌকিক বলে। ব্যাখ্যা নেই, মানে কারণ নেই, এটা কখনোই সত্যি নয়।"
ঠিক তখনই মেহেদীর ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল, মারুফ আংকেল।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ক্লান্ত কণ্ঠ শোনা গেল,
"মেহেদী, তোকে একটা ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে।"
"কেস?"
"হ্যাঁ। এমন কেস আমি আগে দেখিনি।"
মেহেদী আর কোনো প্রশ্ন করল না।
"আমি আসছি।"
পরদিন সকালে চারজন বন্ধু মারুফের সঙ্গে কালোছায়া গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিল।
গ্রামে ঢুকতেই তারা লক্ষ্য করল, প্রতিটি বাড়ির দরজায় লাল রঙের অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা। কেউ সন্ধ্যার পর বাইরে বের হচ্ছে না। শিশুরা খেলছে না। বাতাসে এমন এক ভয়, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।
ঠিক তখনই গ্রামের মাঝখানের খোলা মাঠে মানুষের ভিড় জমতে শুরু করল।
একদল তান্ত্রিক এসে উপস্থিত হয়েছে।
তাদের নেতা, লম্বা দাড়িওয়ালা একজন লোক, নিজের নাম বলল, "মহাগুরু অগ্নিবীর।"
সে উচ্চস্বরে ঘোষণা করল,
"এই গ্রামে কোনো মানুষ হত্যা করছে না। বহু শতাব্দী আগে বন্দী করা এক শক্তি জেগে উঠেছে। পুলিশ কিছুই করতে পারবে না।"
কথা শেষ করেই সে একটা মাটির পাত্রে হাত ঢুকিয়ে আগুনের ভেতর থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় একটি লাল ফুল বের করল।
জনতার মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
"জাদু!"
"ওনার সত্যিই শক্তি আছে!"
মারুফ বিরক্ত মুখে তাকিয়ে রইলেন।
কিন্তু মেহেদী শুধু একবার ফুলটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
"মজার ব্যাপার..."
সৌরভ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কী দেখলি?"
মেহেদী উত্তর দিল না। শুধু হালকা হাসল।
তার চোখ তখন তান্ত্রিকের হাতে নয়, বরং আগুনের পাত্রের নিচে রাখা কালো রঙের ছোট্ট ধাতব বাক্সটার দিকে।
সেই মুহূর্তে তান্ত্রিক নেতা হঠাৎ মেহেদীর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক হাসি দিল।
যেন সে জানে, এই ছেলেটাই তার সবচেয়ে বড় বাধা হতে চলেছে।
আর ঠিক তখনই গ্রামের এক শিশু দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে উঠল,
"আরেকটা লাশ পাওয়া গেছে...!"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।