পর্ব ৩: মৃতের রক্ত, জীবিতের ছায়া
কাগজের টুকরোটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল মেহেদী। লাল কালিটা এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। অর্থাৎ, যিনি এটা রেখে গেছেন, তিনি কয়েক মিনিট আগেও এখানেই ছিলেন।
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে দুইজন কনস্টেবলকে চারদিকে তল্লাশি করতে পাঠালেন। প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজার পরও কাউকে পাওয়া গেল না।
মেহেদী কাগজটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকল।
সৌরভ অবাক হয়ে বলল, "কাগজও আবার শুঁকে দেখা লাগে নাকি?"
মেহেদী হেসে বলল, "অনেক অপরাধী অজান্তেই নিজের পরিচয় রেখে যায়। কেউ সুগন্ধি ব্যবহার করে, কেউ নির্দিষ্ট ধরনের কালি, কেউ আবার বিশেষ ধরনের কাগজ।"
মিতু কাগজটা আলোয় ধরল।
"এখানে ছোট ছোট চকচকে দানা আছে।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"গ্লিটার না। সম্ভবত অ্যালুমিনিয়াম পাউডার। এটা সাধারণ কলমের কালিতে থাকে না।"
মারুফ বললেন, "ল্যাবে পাঠাও।"
...
পরদিন সকালে ফরেনসিক রিপোর্ট এল।
প্রথম খবরটাই সবাইকে হতবাক করে দিল।
লাশের গায়ে পাওয়া নীল গুঁড়োটি কোনো তান্ত্রিক ভস্ম নয়।
এটি ছিল একটি বিরল শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ফ্লুরোসেন্ট মিনারেল পাউডার, যা অন্ধকারে অতিবেগুনি আলো পড়লে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
মেহেদী রিপোর্টটা পড়ে চুপচাপ বসে রইল।
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কিছু বুঝলি?"
"একটা বিষয় নিশ্চিত হল।"
"কী?"
"খুনি কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। সে বিজ্ঞান জানে।"
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
...
ঠিক তখনই গ্রামের মসজিদের ইমাম এসে জানালেন, গত এক মাসে গ্রামের পাঁচজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল। কিন্তু সবাই ভেবেছিল তারা শহরে চলে গেছে।
মেহেদীর চোখ সরু হয়ে এল।
"তাদের নামের তালিকা আছে?"
ইমাম মাথা নাড়লেন।
তালিকা দেখে মিতু বলল,
"দুইজন তো এই মৃতদেরই নাম!"
অর্থাৎ, যাদের এখন হত্যা করা হয়েছে, তারা আসলে এক মাস ধরেই নিখোঁজ ছিল।
মারুফ বিস্মিত হয়ে বললেন,
"তাহলে এতদিন তারা কোথায় ছিল?"
প্রশ্নটার উত্তর কারও কাছে নেই।
...
বিকেলে মেহেদী সিদ্ধান্ত নিল, তান্ত্রিকদের আস্তানা একবার গোপনে দেখে আসতে হবে।
সন্ধ্যা নামতেই চার বন্ধু গ্রামের পশ্চিমের পুরোনো জমিদারবাড়ির দিকে রওনা দিল। এখন সেটাই তান্ত্রিকদের ডেরা।
বাড়িটা বহু বছরের পুরোনো। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। জানালাগুলো ভাঙা। কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত ব্যস্ততা।
একটি ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই সৌরভ ফিসফিস করে বলল,
"ওরা কী করছে?"
ভেতরে পাঁচজন কালো পোশাক পরা লোক গোল হয়ে বসে আছে। মাঝখানে একটি কাঁচের বাক্স।
হঠাৎ বাক্সটার ভেতর নীল আলো জ্বলে উঠল।
তারপর ধোঁয়া।
তারপর...
একটি মানুষের খুলির মতো আকৃতি ধীরে ধীরে ভেসে উঠল।
শাহীনুরের গা শিউরে উঠল।
"এটা তো গতকালের মতোই!"
মেহেদী ঠোঁট কামড়ে দেখছিল।
তার চোখ খুলির দিকে নয়।
ঘরের চার কোণায়।
কয়েক সেকেন্ড পর সে খুব আস্তে বলল,
"চারটা প্রজেক্টর।"
সৌরভ চমকে উঠল।
"কোথায়?"
"ছাদের সঙ্গে লাগানো। খুব ছোট।"
মিতু এবার খেয়াল করল।
সত্যিই চার কোণায় আঙুলের সমান ছোট কালো যন্ত্র লাগানো।
মেহেদী ফিসফিস করে বলল,
"ধোঁয়ার কণাকে পর্দা হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই মনে হচ্ছে বাতাসে ছবি ভাসছে।"
শাহীনুর অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
"মানে... সবটাই বিজ্ঞান?"
"এখন পর্যন্ত তাই।"
ঠিক তখনই ভেতর থেকে মহাগুরু অগ্নিবীরের গলা ভেসে এল।
"যে আমাদের অনুসরণ করছে... সে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।"
চারজনের বুক কেঁপে উঠল।
মেহেদী এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না।
"দৌড়াও!"
চারজন অন্ধকার জঙ্গলের দিকে ছুটে গেল।
পেছন থেকে তান্ত্রিকদের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়...
তারা কেউ ধাওয়া করল না।
...
রাত সাড়ে দশটা।
ক্যাম্পে ফিরে সবাই হাঁপাচ্ছে।
সৌরভ বলল,
"ওরা জানল কীভাবে?"
মেহেদী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"আমাদের দেখেনি।"
"তাহলে?"
"ওরা শুনেছে।"
"কী শুনেছে?"
মেহেদী পকেট থেকে নিজের মোবাইল বের করল।
"আমার ফোন।"
সে স্ক্রিন দেখাল।
ফোনে কোনো নেটওয়ার্ক নেই।
কিন্তু...
ব্লুটুথ নিজে থেকেই চালু।
আর তার সঙ্গে অজানা একটি ডিভাইস যুক্ত ছিল।
ঘরে হিম নেমে এল।
মেহেদী ধীরে বলল,
"আমাদের কথা কেউ শুনছিল।"
মারুফ বিস্ময়ে বললেন,
"মানে... আমাদের মধ্যেই কেউ নজরদারির আওতায়?"
"হ্যাঁ। আর সেটা অনেক দিন ধরেই হতে পারে।"
ঠিক তখনই ফরেনসিক ল্যাব থেকে নতুন রিপোর্ট এসে পৌঁছাল।
মিতু রিপোর্ট পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেল।
তার হাত কাঁপছে।
মারুফ রিপোর্টটা নিয়ে পড়লেন।
তারপর ধীরে ধীরে তিনি চেয়ারে বসে পড়লেন।
সৌরভ উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল,
"কী হয়েছে?"
মারুফ নিচু গলায় বললেন,
"দুই মৃতদেহের শরীরে যে তিনটি সূক্ষ্ম ছিদ্র পাওয়া গেছে..."
তিনি বাকিটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
মেহেদী রিপোর্টটা টেনে নিয়ে পড়ল।
কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখ বড় হয়ে গেল।
রিপোর্টে লেখা ছিল,
"ছিদ্রগুলোর ভেতরে অতি সূক্ষ্ম ধাতব কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এগুলো স্বাভাবিকভাবে শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো বিশেষ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করে এগুলো প্রবেশ করানো হয়েছে।"
মেহেদী ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
"তাহলে... হত্যাটা শুরু হয়েছে মৃত্যুর আগেই।"
আর ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাম্পের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।
ঘর অন্ধকারে ডুবে গেল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এল,
"মেহেদী... তুমি খুব দ্রুত সত্যের কাছে পৌঁছে যাচ্ছ।"
কণ্ঠটা যেন ঘরের ভেতর থেকেও আসছে, আবার চারপাশ থেকেও।
তারপর...
একটি গুলির শব্দে রাতের নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।