কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩৩: ঝাড়ুদারের হাসি
স্কুল থেকে বের হওয়ার সময় মেহেদীর মনে বারবার একই দৃশ্যটা ফিরে আসছিল।
সবাই যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল, তখন স্কুলের ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ ঝাড়ুদারটি কেন হাসছিল?
এটা কি কাকতালীয়?
নাকি সে ইচ্ছা করেই সেই হাসিটা দেখিয়েছিল?
---
গাড়ি কয়েকশো মিটার এগিয়ে যাওয়ার পর মেহেদী হঠাৎ বলল,
"গাড়ি থামান!"
মারুফ ব্রেক চাপলেন।
"কী হয়েছে?"
"আমরা একজনকে ফেলে এসেছি।"
---
পাঁচ মিনিট পর তারা আবার স্কুলে ফিরে এল।
কিন্তু...
ঝাড়ুদার নেই।
স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞেস করতেই তিনি অবাক হয়ে বললেন,
"ঝাড়ুদার?"
"আজ তো আমাদের স্থায়ী ঝাড়ুদার ছুটিতে।"
"সকালে একজন অস্থায়ী লোক এসে বলেছিল, উপজেলা অফিস থেকে তাকে এক দিনের জন্য পাঠানো হয়েছে।"
---
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
"তার নাম?"
প্রধান শিক্ষক মাথা নাড়লেন।
"কেউ জিজ্ঞেসই করেনি।"
---
মেহেদী মৃদু হেসে বলল,
"এটাই ওদের শক্তি।"
"মানুষ ইউনিফর্ম আর আত্মবিশ্বাস দেখলে খুব কম প্রশ্ন করে।"
---
মিতু স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইল।
রেকর্ডিং চালু করা হলো।
সকাল আটটা সাতচল্লিশ।
ভিডিওতে দেখা গেল, একজন বৃদ্ধ ঝাড়ুদার গেট দিয়ে ঢুকছে।
কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মেহেদী থেমে গেল।
"ভিডিওটা একটু ধীরে চালাও।"
---
ফুটেজ স্লো-মোশনে চলতে লাগল।
বৃদ্ধ লোকটি ডান হাতে ঝাড়ু ধরেছে।
কিন্তু তার ডান কাঁধ সামান্য নিচু।
আর প্রতি পাঁচ কদম পরপর সে অবচেতনভাবে বাম হাতের কব্জি স্পর্শ করছে।
---
সৌরভ বলল,
"এতে কী বোঝা গেল?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"ছদ্মবেশ যতই ভালো হোক, অভ্যাস লুকানো কঠিন।"
"লোকটা বৃদ্ধের মতো দেখাচ্ছিল..."
"কিন্তু হাঁটার গতি একজন সুস্থ ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের মানুষের মতো।"
---
ঠিক তখনই মিতু আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করল।
"দেখো!"
সে ভিডিও থামিয়ে জুম করল।
বৃদ্ধের কানের ভেতরে ছোট্ট কালো রঙের একটি ডিভাইস।
"ব্লুটুথ ইয়ারপিস?"
মারুফ বললেন।
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"সম্ভবত।"
"মানে কেউ তাকে নির্দেশ দিচ্ছিল।"
---
ভিডিও আরও এগোতেই দেখা গেল, সকাল নয়টা বত্রিশ মিনিটে সেই লোকটি স্কুলের ছাদে উঠছে।
আর ঠিক দশ মিনিট পরে নেমে আসছে।
সময়টা মিলিয়ে দেখা গেল...
ঠিক তখনই ছাদের যন্ত্রটি বসানো হয়েছে।
---
মারুফ বললেন,
"মুখটা পরিষ্কার করা যাবে?"
মিতু ফুটেজ উন্নত করার চেষ্টা করল।
কিন্তু মুখ সব সময় সামান্য নিচু।
ক্যামেরার কোণও সুবিধাজনক নয়।
---
মেহেদী বলল,
"মুখ দেখা না গেলেও সমস্যা নেই।"
"কেন?"
"আমরা ওর আচরণ পেয়েছি।"
---
সে হঠাৎ ঝাড়ুদারের ঝাড়ুর দিকে তাকাল।
"ভিডিওটা আরেকবার চালাও।"
সবাই অবাক।
"ঝাড়ু?"
---
ভিডিও চালানো হলো।
মেহেদী বলল,
"ঝাড়ুটা কখনো মাটিতে লাগেনি।"
সবাই খেয়াল করল।
সত্যিই তাই।
লোকটা ঝাড়ু দিচ্ছিল না।
শুধু ঝাড়ু দেওয়ার অভিনয় করছিল।
---
মেহেদী বলল,
"তার মানে..."
"ওর উদ্দেশ্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না।"
"ওর উদ্দেশ্য ছিল এখানে উপস্থিত থাকার বৈধ কারণ তৈরি করা।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর দৌড়ে এসে বলল,
"মেহেদী!"
"গেটের বাইরে একটা জিনিস পেয়েছি।"
সবাই বাইরে গেল।
রাস্তার পাশে ডাস্টবিনের নিচে পড়ে আছে একটি কৃত্রিম সাদা দাড়ি।
এক জোড়া রাবারের কুঁচকানো হাতের গ্লাভস।
আর একটি পুরোনো চশমা।
ছদ্মবেশের অংশ।
---
মারুফ বললেন,
"ফরেনসিকে পাঠাই?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"অবশ্যই।"
"ডিএনএ, আঙুলের ছাপ বা অন্য কোনো ব্যবহারযোগ্য প্রমাণ থাকলে কাজে লাগতে পারে।"
---
মিতু দাড়ির ভেতরের সেলাই পরীক্ষা করতে গিয়ে থেমে গেল।
"এক মিনিট..."
সে একটি ক্ষুদ্র কাপড়ের ট্যাগ বের করল।
তাতে লেখা—
RK Costume Studio
---
সৌরভ বলল,
"এটা কি কস্টিউম ভাড়ার দোকান?"
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে নোট করে নিলেন।
"হতে পারে।"
---
মেহেদী কিছুক্ষণ ট্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
"হয়তো এটাই আমাদের প্রথম বাস্তব সূত্র।"
"রুদ্র সব সময় প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান আর ছদ্মবেশ ব্যবহার করছে।"
"কিন্তু যতই পরিকল্পনা নিখুঁত হোক..."
"...কোনো না কোনো জায়গায় মানুষের ভুল থেকেই যায়।"
ঠিক সেই সময় মারুফের ফোন বেজে উঠল।
ওপাশ থেকে ডিউটি অফিসারের কণ্ঠ শোনা গেল।
"স্যার..."
"RK Costume Studio-তে আমাদের টিম পৌঁছেছে।"
"কিন্তু..."
মারুফের কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে উঠল।
"কী হয়েছে?"
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
"দোকানটা খোলা আছে..."
"কিন্তু ভেতরে একজনও নেই।"
"আর কাউন্টারের ওপর আপনার নাম লেখা একটি খাম রাখা আছে।"
মেহেদী ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তারপর বলল,
"সে আবার এক ধাপ এগিয়ে আছে।"
"চলুন..."
"দেখি এবার আমাদের জন্য কী বার্তা রেখে গেছে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।