একটি ধারাবাহিক প্রেমের গল্প
নীল সাগরের ওপারে
পর্ব ৪ : কিছু সম্পর্ক শুধু থেমে যায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৭ জুন ২০২৬
ঢেউগুলো এখনো আগের মতোই তীরে এসে ভাঙছে। একটানা।
রাত অনেকটা গড়িয়েছে। চারপাশের কোলাহল কমে এসেছে। কিছু লোক চলে গেছে। কয়েকজন এখনো সমুদ্রের পাড়ে বসে আছে—কেউ জোড়ায়, কেউ একা।
অভিক তখনও দাঁড়িয়ে। ঠিক সেখানেই, যেখানে কিছুক্ষণ আগে একটা অচেনা মেয়ে বসে ছিল।
মেয়েটার নাম নিশি।
শুধু একটা নাম। অথচ নামটা মাথা থেকে সরছে না। বারবার ফিরে আসছে।
অভিক নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, কয়েকটা কথাতেই একটা অচেনা মানুষ তাকে এতটা ভাবাবে কেন। হতে পারে, মেয়েটার চোখে সে নিজের ভেতরেরই কিছু একটা দেখেছিল। এক ধরনের ক্লান্তি। পালিয়ে আসার একটা চেষ্টা।
কিছু মানুষ থাকে ঢেউয়ের মতো। এসে তীর ছুঁয়ে যায়। তারপর আগের মতো থাকা যায় না আর।
অভিক ধীরে বালুর ওপর বসে পড়ল। বালি এখনো দিনের গরম ধরে রেখেছে।
নিশির কথাটা মনে পড়ল হঠাৎ—
“আজ প্রথমবার নিজের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আজ সেও একই কাজ করেছে বলে মনে হলো। সেও একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিজের জন্য। সেই জায়গা থেকে সরে এসেছে, যেখানে অন্যরা তার জীবন নিয়ে কথা বলছিল।
তিন ঘণ্টা আগে।
আলো ঝলমলে একটা ঘর। লোকজনের হাসি, কথাবার্তা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা নিখুঁত লাগার কথা।
কিন্তু অভিকের কাছে লাগছিল না।
সে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে একটা গ্লাস। গ্লাসের গায়ে জমে থাকা পানির বিন্দুগুলো দেখছিল।
কখনো কখনো ভিড়ের মধ্যেও মানুষ একা হয়ে যায়। অভিকের অবস্থাটা অনেকটা তেমন।
তার বাবা তখন অতিথিদের সঙ্গে ব্যস্ত। মুখে হাসি। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কী সিদ্ধান্ত লুকানো, সেটা অভিক জানত না।
হঠাৎ মাইক্রোফোনে টুং করে শব্দ হলো। ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে বলে মনে হলো।
অভিকের বুকের ভেতর চাপ লাগল। অজানা একটা অস্বস্তি।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ার দিকে তাকাল সে। আরিয়া হাসছে। তবে হাসিটা স্বাভাবিক না। ঠোঁটের কোণে টান আছে, চোখে নেই।
অভিক টের পেল, এই হাসির পেছনেও না বলা কথা জমে আছে।
কিছুক্ষণ পর আরিয়া ধীরে বলল, “অভিক, তুমি কি সত্যিই চলে যেতে চাও?”
গলায় অভিযোগ ছিল না। ছিল ক্লান্তি। আর একটা চাপা ভয়।
অভিক কিছু বলেনি। কিছু মুহূর্তে শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু মনে হয়, একটু দূরে যাওয়া দরকার। একটু নিঃশ্বাস নেওয়া দরকার।
সে জানত, চলে যাওয়া মানেই সমাধান না। তবু সেদিন ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।
সে বেরিয়ে এসেছিল। পার্কিং লটে গাড়ির দরজা খোলার সময় হাতটা একটু কেঁপেছিল।
ফোনের শব্দে বর্তমানে ফিরল অভিক।
স্ক্রিনে নাম—আরিয়া।
কিছুক্ষণ বাজতে দিল। তারপর ধরল।
“হ্যালো...”
ওপাশে নীরবতা। কয়েক সেকেন্ড পর আরিয়ার গলা শোনা গেল। “বাবা সবার সামনে খুব কষ্ট পেয়েছে, অভিক।”
অভিক চুপ। বালির ওপর আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটছে।
“আমি জানি না এখন কীভাবে সব সামলাব,” আরিয়া বলল। গলাটা শান্ত রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই শান্তির নিচে চাপটা বোঝা যায়।
“আমি দুঃখিত।” অভিকের গলা নিচু। এটুকুই বলতে পারল।
আরিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুমি সবসময় এমন করো, অভিক। যখন কিছু কঠিন হয়ে যায়, তুমি সরে যাও।”
কথাটা শুনে অভিক চোখ বন্ধ করল। সমুদ্রের বাতাসে লবণের গন্ধ। হয়তো কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়। হয়তো সে সত্যিই পালিয়ে এসেছে।
আবার কখনো কখনো মানুষের কিছু জায়গা থেকে সরে আসাটা দরকার হয়ে পড়ে। কারণ কিছু কষ্টের দরজা জোর করে খুলতে গেলে ভেতরের অন্ধকারটা আরও ঘন হয়।
“আরিয়া...” বলতে গিয়ে থেমে গেল অভিক। কী বলবে, নিজেও জানে না।
শেষ পর্যন্ত ফোনটা কানে রেখেই চুপ করে রইল। লাইনটা কাটেনি। শুধু দুপাশে নীরবতা।
কারণ কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না। কেবল দুজন মানুষ কিছু সময়ের জন্য একে অপরের কাছ থেকে একটু দূরে দাঁড়ায়।
রাত আরও গভীর।
নিশি তখন বাড়ির গেটের সামনে। লোহার গেটটা ঠান্ডা। খুলতেই দেখল, বাবা বসার ঘরে বসে আছেন। সামনে টেবিলে পানির গ্লাস, অর্ধেক খালি।
মুখে রাগ। চোখে দুশ্চিন্তা।
“কোথায় ছিলে?”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আগে হলে হয়তো আবার রেগে যেত। দরজা বন্ধ করে ঘরে চলে যেত। কিন্তু আজ ভেতরে কিছুটা বদল টের পাচ্ছে।
ধীরে বলল, “সমুদ্রের কাছে।”
বাবা অবাক হয়ে তাকালেন। “একা?”
নিশি কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। তারপর মিথ্যা বলল না। “না।”
বাবার চোখে প্রশ্ন। কপালে ভাঁজ।
কিন্তু নিশি আর কিছু বলল না। সে নিজেও নিশ্চিত না, আজকের রাত তার জীবনে ঠিক কী বদলে দিয়ে গেল।
শুধু জানে, সমুদ্রের ঢেউ যেমন ফিরে আসে, কিছু মানুষও হয়তো ফিরে আসে। আবার কিছু সম্পর্ক কেবল থেমে যায়—শেষ না হয়েও।
চলবে...
#নীল_সাগরের_ওপারে
#অভিক_ও_নিশি
#ধারাবাহিক_গল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।