কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১৯: ধার করা স্মৃতি
মেহেদী অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার সামনে যেন দুটি বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে।
একটি বাস্তবতা, যেখানে সে একজন সাধারণ ছাত্র।
তার পরিবার আছে।
শৈশবের স্মৃতি আছে।
বন্ধু আছে।
আরেকটি বাস্তবতা...
যেখানে সে হয়তো কোনো এক গোপন গবেষণার অংশ ছিল।
Subject M-7।
---
সৌরভ ধীরে বলল,
"মেহেদী..."
"কিছু বল।"
কিন্তু মেহেদী কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু ছবির ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো...
ছবির ছেলেটির মুখ পুরোপুরি পরিষ্কার না হলেও চোখ দুটো যেন তার নিজের মতো লাগছে।
---
মারুফ ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
"শোন।"
"একটা ছবি কখনো পুরো সত্য প্রমাণ করে না।"
"তুই নিজেই আমাকে শিখিয়েছিস..."
"...প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।"
মেহেদী মাথা তুলল।
তারপর হালকা হাসল।
"ঠিক বলেছেন।"
"আমি একজন তদন্তকারী।"
"নিজেকেও তদন্তের বাইরে রাখব না।"
---
মিতু ক্যামেরাটা পরীক্ষা করতে শুরু করল।
"এটা পুরোনো ফিল্ম ক্যামেরা।"
"ডিজিটাল এডিট করা সম্ভব না।"
সৌরভ বলল,
"মানে ছবিটা সত্যি?"
মিতু থামল।
"ছবিটা সত্যি।"
"কিন্তু ছবির ব্যাখ্যা সত্যি কিনা, সেটা আলাদা বিষয়।"
---
মেহেদী আবার ছবির পেছনের লেখা পড়ল।
প্রথম দিন: Subject M-7
"প্রথম দিন..."
সে ফিসফিস করে বলল।
"প্রথম দিন মানে?"
মিতু উত্তর দিল,
"সম্ভবত পরীক্ষার প্রথম দিন।"
"কিন্তু যদি এই পরীক্ষার বিষয় স্মৃতি হয়..."
"...তাহলে?"
---
মেহেদীর চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল।
"তাহলে তারা শুধু আমার ওপর পরীক্ষা করেনি।"
"তারা আমার চারপাশের মানুষদের ওপরও করেছে।"
সবাই চুপ।
---
"কেন?"
সৌরভ জিজ্ঞেস করল।
মেহেদী বলল,
"কারণ একজন মানুষের স্মৃতি শুধু তার নিজের মস্তিষ্কে থাকে না।"
"পরিবার, বন্ধু, পরিচিত মানুষ..."
"সবাই মিলে একজনের অতীতের একটা ছবি তৈরি করে।"
"যদি কেউ একজনের স্মৃতি বদলাতে চায়..."
"...তাহলে তাকে ঘিরে থাকা মানুষদের তথ্যও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।"
---
ঠিক তখনই মারুফের ফোনে একটি বার্তা এল।
একটি অচেনা নম্বর।
বার্তায় লেখা:
> "মেহেদীকে তার অতীত জানতে দিও না।"
নিচে আরেকটি লাইন।
> "কারণ সে জানলে ECHO আবার শুরু হবে।"
---
মারুফের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
মেহেদী ফোনটা হাতে নিল।
"এটা কার?"
"জানি না।"
সে নম্বর ট্রেস করার চেষ্টা করল।
কয়েক সেকেন্ড পর মিতু বলল,
"নম্বরটা অদ্ভুত।"
"কেন?"
"এটা কোনো সাধারণ মোবাইল নম্বর না।"
"তাহলে?"
"একটা রাউটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে।"
"লোকেশন বের করা কঠিন।"
---
হঠাৎ মেহেদীর চোখ পড়ল বার্তার সময়ের দিকে।
18:40
আবার সেই সময়।
সে ধীরে বলল,
"ওরা সব সময় একই সংখ্যা ব্যবহার করছে।"
মারুফ বললেন,
"কেন?"
"কারণ এটা শুধু সময় না।"
"এটা একটা সংকেত।"
---
মেহেদী পুরোনো সব ঘটনার তালিকা বের করল।
প্রথম খুন।
হাতঘড়ি ৬:৪০।
দ্বিতীয় খুন।
পকেট ঘড়ি ৬:৪০।
বৃত্তের পরীক্ষা।
১৮:৪০।
ECHO ফাইল।
১৮:৪০।
সবকিছু একই জায়গায় ফিরে আসছে।
---
মিতু হঠাৎ বলল,
"একটা সম্ভাবনা আছে।"
"কী?"
"১৮:৪০ হয়তো কোনো সময় নয়।"
"তাহলে?"
"হতে পারে এটা কোনো বৈজ্ঞানিক মান।"
মেহেদী তাকাল।
"কেমন মান?"
"উদাহরণ হিসেবে..."
"কোনো পরীক্ষার নম্বর।"
"কোনো কোড।"
"বা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সময়।"
---
মেহেদী দ্রুত ECHO ফাইল আবার খুলল।
এইবার সে সব সংখ্যার অংশ খুঁজতে লাগল।
কয়েক মিনিট পর...
সে থেমে গেল।
একটি লাইন।
এতক্ষণ কেউ খেয়াল করেনি।
> Memory Reconstruction Timestamp: 18:40
---
ঘরের সবাই নীরব।
মেহেদী ধীরে বলল,
"১৮:৪০..."
"...এটা সেই সময়..."
"যখন আমার স্মৃতি পরিবর্তন করা হয়েছিল।"
---
ঠিক তখনই দরজার বাইরে একটি শব্দ হলো।
কেউ যেন ধীরে ধীরে হাঁটছে।
মারুফ ইশারা করলেন।
সবাই চুপ।
দরজা খুলতেই দেখা গেল...
একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
কালো পোশাক।
মুখে কোনো কাপড় নেই।
এই প্রথম সে নিজের মুখ দেখাল।
মেহেদী তাকে দেখে স্থির হয়ে গেল।
কারণ লোকটি অপরিচিত নয়।
সে সেই মানুষ...
যাকে তারা এতক্ষণ খুঁজছিল।
---
লোকটি শান্ত গলায় বলল,
"অনেক দেরি হয়ে গেছে, মেহেদী।"
"তোমার সত্য জানার সময় এসেছে।"
মারুফ বন্দুক তাক করলেন।
"তুমি কে?"
লোকটি হাসল।
তারপর বলল,
"আমি সেই মানুষ..."
"...যে তোমাকে ভুলে যেতে সাহায্য করেছিল।"
এক মুহূর্ত থেমে সে যোগ করল,
"আমি মাহির রহমান।"
মারুফের হাত থেকে বন্দুক প্রায় পড়ে গেল।
কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি...
তার নিখোঁজ ভাই।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।