পেশ করছি পরবর্তী পর্ব।
কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৭৫: সাক্ষ্য
ঘরের ভেতর এতটাই নীরব যে রুদ্রের কাশির শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
মেহেদীর হাতে ছোট্ট রেকর্ডারটি।
এটাই হয়তো বিশ বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
কিন্তু সে এখনও প্লে বাটনে চাপ দেয়নি।
---
কামরান ধীরে বললেন,
"চালাও।"
"সত্যিটা শোনার অধিকার তোমাদের আছে।"
---
মেহেদী রেকর্ডারটি চালু করল।
কিছুক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর একজন নারীর কণ্ঠ।
ড. নাদিয়া রহমান।
«"যদি কেউ এই রেকর্ড শুনে থাকে, তাহলে বুঝব আমি হয় মারা গেছি, নয়তো আর স্বাধীন নই।"»
ঘরের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল।
---
নাদিয়ার কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
«"Project Mirror শুরু হয়েছিল মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষতি সারানোর গবেষণা হিসেবে।"»
«"লক্ষ্য ছিল স্মৃতিভ্রংশ রোগী, কোমা থেকে ফেরা মানুষ এবং মানসিক আঘাতে স্মৃতি হারানো শিশুদের সাহায্য করা।"»
---
মিতু বিস্মিত হয়ে বলল,
"তাহলে শুরুটা ভালো উদ্দেশ্যেই ছিল।"
---
কামরান ধীরে মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
---
রেকর্ডে নাদিয়ার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
«"কিন্তু পরে গবেষণার দিক বদলে যায়।"»
«"স্মৃতি পুনরুদ্ধারের বদলে..."»
«"মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার পরীক্ষা শুরু হয়।"»
---
মেহেদী ধীরে জিজ্ঞেস করল,
"সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছিল?"
---
রেকর্ডিংয়ে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এল।
«"আমরা সবাই দায়ী ছিলাম।"»
«"কেউ থামাইনি।"»
«"কেউ প্রতিবাদ করিনি।"»
---
ঘরে উপস্থিত সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
এটা শুধু একজনের অপরাধ ছিল না।
এটা ছিল বহু মানুষের নৈতিক ব্যর্থতা।
---
রেকর্ডিং চলতে থাকল।
«"Subject-17 এবং Subject-19..."»
«"ওরা ছিল শিশু।"»
«"ওরা কখনো জানতই না, ওদের ওপর কী পরীক্ষা চলছে।"»
---
রুদ্র মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করল।
তার গাল বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ল।
---
ঠিক তখনই রেকর্ডে আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।
ড. আরিফ সালেহ।
তিনি বলছেন,
«"পরীক্ষা বন্ধ করো।"»
«"আমরা সীমা অতিক্রম করছি।"»
---
এরপর তীব্র তর্কের শব্দ।
ফাইলপত্র ছুড়ে ফেলার আওয়াজ।
তারপর...
একটি গুলির শব্দ।
ধাম!
রেকর্ডিং কয়েক সেকেন্ড কেঁপে উঠল।
তারপর নীরব।
---
মারুফ ফিসফিস করে বললেন,
"আরিফকে হত্যা করা হয়েছিল..."
---
কামরান ধীরে উত্তর দিলেন,
"না।"
"ওই রাতে আরিফ মারা যায়নি।"
---
সবাই বিস্ময়ে তার দিকে তাকাল।
---
কামরান বললেন,
"সে পালিয়ে গিয়েছিল।"
"কিন্তু কয়েক মাস পরে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।"
---
মেহেদী প্রশ্ন করল,
"তাহলে এতদিন আমরা যে তথ্য জানতাম..."
---
"তার অর্ধেকই ছিল সাজানো।"
---
ঠিক তখনই রুদ্র কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল।
সে মেহেদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
"একটা কথা এখনও তোকে বলিনি।"
---
"কী কথা?"
---
রুদ্র কাঁপা গলায় বলল,
"বিশ বছর আগে..."
"যেদিন তোকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল..."
"আমি পালাতে পারতাম।"
---
মেহেদী অবাক হয়ে তাকাল।
---
"কিন্তু আমি পালাইনি।"
"আমি নিজে থেকে গাড়িতে উঠেছিলাম।"
---
ঘরের সবাই স্তব্ধ।
---
রুদ্র চোখ বন্ধ করে বলল,
«"কারণ আমি তোকে একা রেখে যেতে চাইনি।"»
মেহেদীর চোখ ভিজে উঠল।
সে কোনো কথা বলতে পারল না।
বিশ বছর ধরে সে ভেবেছিল, তারা দুজনই ভাগ্যের শিকার।
আজ সে জানল...
তার বন্ধু নিজের ইচ্ছায় অন্ধকারে নেমেছিল।
শুধু তাকে একা না রাখার জন্য।
ঠিক সেই মুহূর্তে আশ্রমের বাইরে আবার ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল।
এবার কোনো গুলির শব্দ নয়।
একটি কালো হেলিকপ্টার ধীরে ধীরে আশ্রমের ওপর ভেসে উঠল।
কামরান জানালার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন,
«"দেরি হয়ে গেছে..."»
«"ওরা এসে গেছে।"»
মেহেদী বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"ওরা কারা?"
কামরান ধীরে উত্তর দিলেন,
«"যারা Project Mirror তৈরি করেছিল..."»
«"...তারা নয়।"»
«"যারা এখন সেটাকে নিজেদের জন্য চায়।"»
ঘরের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল।
মেহেদী বুঝতে পারল...
এতদিন তারা যে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছিল, সে হয়তো পুরো খেলার শেষ খেলোয়াড়ই ছিল না।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।