পর্ব ১১: প্রজেক্ট নির্বাণ
ভিডিওটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঘরে এমন নীরবতা নেমে এল, যেন কেউ ইচ্ছে করে সব শব্দ গিলে ফেলেছে।
মেহেদী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে ভয় ছিল না।
ছিল কৌতূহল।
কারণ একজন বিজ্ঞানী যদি সত্যিই মানুষের স্মৃতি অন্য মানুষের মস্তিষ্কে স্থানান্তরের গবেষণা করে থাকেন, তাহলে এই কেস শুধু হত্যাকাণ্ডের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক প্রযুক্তি, যা ভুল মানুষের হাতে পড়লে পৃথিবীর জন্য বিপর্যয় হতে পারে।
সৌরভ নীরবতা ভাঙল।
"ভিডিওটা এখানেই শেষ?"
"না।"
সে কিবোর্ডে কয়েকটা বোতাম চাপল।
"শেষ অংশটা করাপ্ট হয়েছে। তবে কিছু ফ্রেম উদ্ধার করা গেছে।"
ভিডিওর শেষ কয়েক সেকেন্ড চালু হলো।
ড. আরিফ ক্যামেরার দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে আছেন।
হঠাৎ তিনি পেছনে তাকালেন।
মনে হলো, কেউ ঘরে ঢুকেছে।
তারপর তিনি শুধু একটি কথাই বললেন।
"ওদের বিশ্বাস কোরো না..."
ভিডিও কেঁপে উঠল।
একটা তীব্র শব্দ।
তারপর অন্ধকার।
---
মারুফ ধীরে বললেন,
"ওরা মানে কারা?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
---
সেদিন রাতেই মেহেদী সিদ্ধান্ত নিল, এতদিন যে প্রশ্নটা কেউ করেনি, সেটাই করা দরকার।
সে বলল,
"আমরা ধরে নিয়েছি তান্ত্রিকরা একটা দল।"
"কিন্তু যদি তারা সবাই একে অপরকে না-ও চেনে?"
শাহীনুর ভ্রু কুঁচকে বলল,
"মানে?"
"ধর, কেউ টাকা দিয়ে কিছু লোককে তান্ত্রিক সাজিয়ে গ্রামে পাঠিয়েছে। তারা শুধু নাটক করবে। আসল পরিকল্পনা অন্য কেউ চালাবে।"
মারুফ ধীরে মাথা নাড়লেন।
"তাহলে তান্ত্রিকরা শুধু ধোঁয়া।"
"আর আগুনটা অন্য কোথাও।"
---
পরদিন সকালে পুলিশ অগ্নিবীরের অতীত খুঁজতে শুরু করল।
চার ঘণ্টা পর অবাক করা তথ্য পাওয়া গেল।
'মহাগুরু অগ্নিবীর' নামে কোনো মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই।
এই নামে কোনো জন্মনিবন্ধনও নেই।
মারুফ ফাইল বন্ধ করে বললেন,
"মানে নামটাই ভুয়া।"
---
আরও আশ্চর্যের বিষয়...
তিন বছর আগে চট্টগ্রামে একই চেহারার একজন লোককে ধরা হয়েছিল।
কিন্তু তখন তার নাম ছিল...
'স্বামী অদ্বৈতানন্দ।'
দুই বছর আগে খুলনায়...
'সাধক ভৈরব।'
প্রতিবারই আলাদা নাম।
আলাদা পরিচয়।
কিন্তু একই মুখ।
মেহেদী হাসল।
"তাহলে মানুষটা তান্ত্রিক নয়।"
"পেশাদার প্রতারক।"
---
এদিকে মিতু নীল রাসায়নিকের ওপর আরও পরীক্ষা চালাচ্ছিল।
বিকেলে সে দৌড়ে এল।
তার চোখে উত্তেজনা।
"আমি একটা জিনিস পেয়েছি!"
"কী?"
"এই রাসায়নিকে খুব সামান্য পরিমাণে ন্যানো-স্কেলের চৌম্বকীয় কণা আছে।"
সৌরভ কিছুই বুঝল না।
"এতে কী হয়?"
মিতু বলল,
"এগুলো সাধারণত চিকিৎসা গবেষণায় ব্যবহার হয়।"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"MRI ট্র্যাকিং..."
মিতু অবাক।
"তুই বুঝলি কীভাবে?"
"কলেজে একটা গবেষণাপত্র পড়েছিলাম।"
সে চুপচাপ টেবিলে বসে পড়ল।
তারপর বলল,
"মানে... যার শরীরে এই রাসায়নিক ঢোকানো হয়েছে..."
"...তার শরীরের ভেতরের কিছু অংশ বিশেষ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ ল্যাপটপে একটি অদ্ভুত সিগন্যাল ধরল।
"মেহেদী!"
"কী হয়েছে?"
"আমাদের নেটওয়ার্কে কেউ ঢোকার চেষ্টা করছে।"
সবার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
সৌরভ দ্রুত আইপি ট্রেস করতে লাগল।
কয়েক সেকেন্ড পর সে থেমে গেল।
"অসম্ভব..."
"কী?"
"সিগন্যালটা..."
সে স্ক্রিন ঘুরিয়ে দেখাল।
লোকেশন দেখাচ্ছে...
মারুফের অফিস।
মারুফ বিস্মিত।
"অসম্ভব! আমি তো এখানেই আছি।"
সৌরভ আবার পরীক্ষা করল।
একই ফল।
মেহেদী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার মাথায় একটা চিন্তা বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠেছে।
"আংকেল..."
"হ্যাঁ?"
"আপনার অফিসে গত এক মাসে কারা কারা অবাধে ঢুকেছে?"
মারুফ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
"অনেকেই..."
"সবার কথা ভাববেন না।"
"শুধু এমন কাউকে মনে করুন, যাকে দেখে কখনো সন্দেহ হয়নি।"
মারুফ চোখ বন্ধ করলেন।
প্রায় এক মিনিট পর তাঁর চোখ খুলল।
মুখের রঙ ফ্যাকাশে।
"একজন আছে..."
"কে?"
"আমাদের থানার ফরেনসিক লিয়াজোঁ অফিসার।"
"নাম?"
মারুফ ধীরে বললেন,
"ড. রাশেদ কবির।"
ঘরের সবাই চুপ।
এই নামটি আগে কখনও আলোচনায় আসেনি।
মেহেদী শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
"তিনি কি সব ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার সুযোগ পান?"
মারুফ ধীরে মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
"লাশ দেখেন?"
"হ্যাঁ।"
"প্রমাণ ছুঁতে পারেন?"
"...হ্যাঁ।"
মেহেদী আর কিছু বলল না।
সে শুধু টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা সব রিপোর্ট একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
"যদি খুনি সব সময় তদন্তের এক ধাপ আগে থাকে..."
"...তাহলে হয় সে অসাধারণ প্রতিভাবান।"
সে একটু থামল।
"...নয়তো সে শুরু থেকেই তদন্তের ভেতরে আছে।"
ঠিক তখনই মারুফের ব্যক্তিগত ফোনে একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজ এসে পৌঁছাল।
মাত্র চারটি শব্দ।
> "তোমরা অবশেষে সঠিক দরজায় পৌঁছেছ।"
মেসেজের নিচে একটি সংযুক্ত ছবি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে...
ড. রাশেদ কবির একটি হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু ছবির সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটি ছিল তাঁর পেছনে।
হুইলচেয়ারে বসে থাকা এক বৃদ্ধ।
বৃদ্ধের মুখ শুকিয়ে গেছে।
চুল সাদা।
কিন্তু মেহেদী ছবিটা দেখেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।
সে ফিসফিস করে বলল,
"...এটা হতে পারে না।"
মারুফ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
"তুই ওনাকে চিনিস?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"হ্যাঁ..."
"...উনি ড. আরিফ সালেহ।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।