পর্ব ৫: আগুনে পোড়ে না সত্য
বিস্ফোরণের শব্দ থামার পরও কয়েক সেকেন্ড কেউ নড়ল না। চারদিকে ধুলো আর ধোঁয়ার মেঘ ছড়িয়ে পড়েছে। জমিদারবাড়ির পশ্চিম অংশে আগুন জ্বলছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে পুরো ভবনটিতে আগুন লাগেনি। যেন বিস্ফোরণটি নির্দিষ্ট একটি ঘরেই ঘটানো হয়েছে।
"ফায়ার ইউনিট ডাকো!" চিৎকার করলেন মারুফ।
পুলিশ দ্রুত এলাকাটি ঘিরে ফেলল।
মেহেদী কিন্তু আগুনের দিকে নয়, মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল। বিস্ফোরণের পর মাটি জুড়ে ছড়িয়ে আছে কাচের টুকরো, পোড়া কাগজ আর ধাতুর খণ্ড।
হঠাৎ সে নিচু হয়ে একটা জিনিস তুলে নিল।
একটি গলতে শুরু করা মাইক্রোচিপ।
সৌরভ অবাক হয়ে বলল, "এটা এখানে কী করছে?"
মেহেদী চিপটা ঘুরিয়ে দেখল।
"যদি এটা সত্যিই বিস্ফোরণে নষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে এটা আগে কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের অংশ ছিল।"
"মানে?"
"মানে কেউ এখানে শুধু তন্ত্র নয়, প্রযুক্তিও ব্যবহার করছিল।"
---
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগল।
পোড়া ঘরটিতে ঢুকেই সবাই বুঝল, এটা কোনো পূজার ঘর ছিল না।
চারদিকে লোহার টেবিল।
দেয়ালে বিভিন্ন রাসায়নিকের সূত্র লেখা।
ভাঙা কাচের টেস্ট টিউব।
স্টিলের র্যাক।
আর মাঝখানে একটি সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার।
মিতু ফিসফিস করে বলল,
"এটা তো ল্যাবরেটরি!"
মারুফ ধীরে বললেন,
"তাহলে তান্ত্রিকদের আস্তানার ভেতরে বিজ্ঞান গবেষণাগার?"
মেহেদী কোনো উত্তর দিল না।
সে পোড়া কম্পিউটারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
হার্ডডিস্কটি পুরোপুরি পুড়ে যায়নি।
সে সেটা সাবধানে খুলে ব্যাগে রাখল।
"এটা থেকে হয়তো কিছু উদ্ধার করা যাবে।"
---
ঠিক তখনই এক কনস্টেবল দৌড়ে এল।
"স্যার!"
"কী হয়েছে?"
"তান্ত্রিকদের কেউই নেই।"
"মানে?"
"সব ঘর খুঁজেছি। তারা উধাও।"
মারুফ হতবাক।
এত বড় বিস্ফোরণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো দল অদৃশ্য!
---
রাত এগারোটার দিকে সবাই ক্যাম্পে ফিরল।
সৌরভ নিজের ল্যাপটপে হার্ডডিস্কটি সংযুক্ত করল।
প্রথমে কিছুই পাওয়া গেল না।
তারপর...
একটি মাত্র ফাইল দেখা গেল।
নাম:
Subject-17
ফাইলটি খুলতেই একটি ভিডিও চালু হলো।
ভিডিওতে দেখা গেল সাদা অ্যাপ্রোন পরা একজন মানুষ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু তার মুখ ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করা।
লোকটি বলল,
"যদি এই ভিডিও কেউ দেখে, তাহলে বুঝতে হবে পরীক্ষাগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।"
সে টেবিল থেকে একটি সিরিঞ্জ তুলে ধরল।
ভেতরে গাঢ় নীল রঙের তরল।
"মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে সাময়িকভাবে অচল করার জন্য এই যৌগ তৈরি করা হয়েছে। খুব অল্প মাত্রাতেই পুরো শরীর অবশ হয়ে যাবে।"
মিতু অবাক হয়ে বলল,
"এটা কি কোনো ওষুধ?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না... এটা অস্ত্রও হতে পারে।"
ভিডিওতে লোকটি আবার বলল,
"যদি ডোজ একটু বেশি হয়, তাহলে হৃদস্পন্দন এত ধীরে নেমে যাবে যে মানুষকে মৃত মনে হবে।"
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
মেহেদীর মাথায় হঠাৎ একটা চিন্তা ঝলকে উঠল।
সে দ্রুত প্রথম দুই মৃতের রিপোর্ট বের করল।
রিপোর্টে লেখা ছিল,
'মৃত্যুর আনুমানিক সময়: নিখোঁজ হওয়ার অনেক পরে।'
সে নিজের মনে বলল,
"যদি তারা অনেক দিন আগেই 'মৃত' বলে মনে হয়...?"
---
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কী ভাবছিস?"
মেহেদী ধীরে বলল,
"আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু যদি এই রাসায়নিক দিয়ে কাউকে এমন অবস্থায় নেওয়া যায়, যেখানে সে জীবিত, অথচ সবাই তাকে মৃত মনে করে..."
সৌরভ বাকিটা বলল,
"...তাহলে তাকে সহজেই কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব।"
"ঠিক তাই।"
মিতু এবার বলল,
"তারপর?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"তারপর শুরু হতে পারে যে কোনো পরীক্ষা।"
---
রাত প্রায় দুটো।
সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হঠাৎ ক্যাম্পের জেনারেটর বন্ধ হয়ে গেল।
আবার অন্ধকার।
মারুফ বিরক্ত হয়ে বাইরে বেরোলেন।
কয়েক সেকেন্ড পরই তাঁর গলা শোনা গেল।
"মেহেদী! সবাই বাইরে আয়!"
সবাই দৌড়ে বেরিয়ে এল।
জেনারেটরের পাশে মাটিতে কিছু পড়ে আছে।
একটি কালো কাপড়ে মোড়ানো বাক্স।
মারুফ সাবধানে কাপড় খুললেন।
ভেতরে একটি দাবার বোর্ড।
সব গুটি সাজানো।
কিন্তু বোর্ডের এক পাশে সাদা রাজা নেই।
তার জায়গায় রাখা একটি ছোট কাগজ।
মেহেদী কাগজটি তুলে পড়ল।
তাতে লেখা,
> "তুমি বিজ্ঞান জানো। আমিও জানি। কিন্তু তুমি নিয়ম মেনে খেলো, আমি খেলি মানুষের ভয় দিয়ে।"
কাগজের নিচে আরেকটি লাইন।
> "পরবর্তী চাল তোমার নয়, আমার।"
মেহেদী বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ তার চোখ একটি বিষয় লক্ষ্য করল।
দাবার একটি কালো ঘোড়ার গুটির নিচে কিছু আটকানো।
সে গুটিটি তুলে দেখল।
একটি ক্ষুদ্র জিপিএস ট্র্যাকার।
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"এর মানে...?"
মেহেদী ধীরে উত্তর দিল,
"যে এই বাক্স এনেছে, সে আমাদের অবস্থান জানত না..."
"...সে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল, আমরাই এই বাক্স খুঁজে পাব।"
ঠিক তখনই ট্র্যাকারটির লাল আলো দ্রুত জ্বলে উঠতে শুরু করল।
মেহেদীর চোখ বড় হয়ে গেল।
সে চিৎকার করে উঠল,
"সবাই সরে যাও! এখনই!"
কিন্তু তার সতর্কবাণী শেষ হওয়ার আগেই ট্র্যাকারের ভেতর থেকে ক্ষীণ বিপ... বিপ... বিপ... শব্দ ভেসে এল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।