কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ২৩: প্রতিচ্ছবি
ঘরের সবাই যেন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ...
মেহেদীর মুখের সঙ্গে অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যায়।
একই চোখ।
একই মুখের গঠন।
একই উচ্চতা।
শুধু পার্থক্য একটা।
মেহেদীর চোখে যেখানে প্রশ্ন, সেখানে ওই মানুষের চোখে ছিল সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা।
---
সৌরভ ধীরে ধীরে বলল,
"এটা..."
"এটা কীভাবে সম্ভব?"
মিতু কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু তাকিয়ে আছে।
কারণ বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও এই দৃশ্যটা তার যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
---
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
"তোমার নাম কী?"
লোকটি মৃদু হাসল।
"তুমি জানো।"
"না।"
"আমি জানতে চাই তোমার মুখ থেকে।"
লোকটি ধীরে বলল,
"আমার নাম..."
"মেহেদী হাসান।"
---
মুহূর্তের জন্য মেহেদীর বুকের ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
একজন মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে...
যে তার নাম ব্যবহার করছে।
তার মুখ ব্যবহার করছে।
তার পরিচয় ব্যবহার করছে।
---
মারুফ বন্দুক তুলে ধরলেন।
"তুমি কে?"
লোকটি তার দিকে তাকাল।
"আমি সেই মানুষ..."
"...যাকে আপনারা এতদিন খুঁজছিলেন।"
"আমি M-8।"
---
আদনান ধীরে বলল,
"M-8, তুমি এখানে আসার কথা ছিল না।"
লোকটি তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
"আপনারা সবসময় একই ভুল করেন।"
"আপনারা ভাবেন, পরীক্ষার ফলাফল আপনাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।"
---
মেহেদী লক্ষ্য করল।
লোকটির কথা বলার ধরন অদ্ভুত।
সে আবেগ দেখাচ্ছে না।
রাগ নেই।
ভয় নেই।
অপরাধবোধ নেই।
শুধু বিশ্লেষণ।
---
মেহেদী বলল,
"তুমি কি আমার মতো?"
M-8 উত্তর দিল,
"না।"
"তুমি আমার মতো।"
---
ঘরে আবার নীরবতা।
---
M-8 ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
"তুমি ভাবছ, তুমি তদন্তকারী।"
"তুমি সত্য খুঁজে বের করো।"
"কিন্তু তুমি জানো না..."
"...তোমার পুরো জীবনটাই ছিল একটা পরীক্ষা।"
---
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"আর তুমি?"
"তোমার জীবন?"
M-8 কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর বলল,
"আমার জীবন ছিল শুধু একটি লক্ষ্য।"
"সেরা হওয়া।"
---
মিতু বলল,
"এটা সম্ভব না।"
সবাই তার দিকে তাকাল।
সে ব্যাখ্যা করল,
"দুইজন মানুষের জেনেটিক মিল থাকলেও..."
"একই চেহারা, একই আচরণ, একই বুদ্ধির ধরন..."
"এভাবে হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।"
---
M-8 হালকা হাসল।
"তুমি এখনো স্বাভাবিক মানুষের নিয়ম দিয়ে আমাকে বিচার করছ।"
"আমি স্বাভাবিকভাবে তৈরি নই।"
---
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"তাহলে কীভাবে?"
M-8 উত্তর দিল,
"ECHO-এর দ্বিতীয় ধাপ।"
"প্রথম ধাপে তারা স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা করেছিল।"
"দ্বিতীয় ধাপে..."
"...তারা ব্যক্তিত্বের কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা করেছিল।"
---
মেহেদীর চোখ সরু হয়ে গেল।
"তুমি বলতে চাচ্ছ..."
"আমাদের দুজনকে একই ধরনের তথ্য, একই ধরনের প্রশিক্ষণ, একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে রাখা হয়েছিল?"
M-8 মাথা নাড়ল।
"ঠিক।"
"তারপর দেখা হয়েছে..."
"...কে ভালো ফলাফল করে।"
---
মারুফ রাগে বললেন,
"তোমরা শিশুদের নিয়ে প্রতিযোগিতা করেছিলে?"
M-8 শান্তভাবে উত্তর দিল,
"প্রতিযোগিতা নয়।"
"নির্বাচন।"
---
এই শব্দটা শুনে মেহেদীর ভেতরে একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।
কারণ সে বুঝতে পারছিল...
M-8 নিজেকে মানুষ হিসেবে নয়...
একটি ফলাফল হিসেবে দেখে।
---
ঠিক তখনই কম্পিউটার স্ক্রিনে নতুন তথ্য ভেসে উঠল।
> ECHO MEMORY SYNC: 91% COMPLETE
মিতু চিৎকার করে বলল,
"আর মাত্র কয়েক মিনিট!"
---
আদনান দ্রুত বলল,
"M-8, তুমি যদি সিস্টেম চালু রাখো..."
"শুধু এই শহর না..."
"...হাজার হাজার মানুষের স্মৃতি প্রভাবিত হবে।"
M-8 শান্তভাবে উত্তর দিল,
"আমি জানি।"
"এটাই পরিকল্পনা।"
---
মেহেদী তাকাল।
"তুমি এটা কেন করতে চাও?"
প্রথমবারের মতো M-8 কিছুক্ষণ চুপ করল।
তারপর বলল,
"কারণ মানুষ সত্য সহ্য করতে পারে না।"
"মানুষ নিজের তৈরি গল্পে বাঁচতে পছন্দ করে।"
"আমি শুধু তাদের সেই গল্পটা নিয়ন্ত্রণ করব।"
---
মেহেদী ধীরে বলল,
"তুমি মানুষকে সাহায্য করতে চাও না।"
"তুমি মানুষকে নিজের মতো বানাতে চাও।"
M-8 হাসল।
"তুমি এখনো আবেগ দিয়ে চিন্তা করছ।"
---
মেহেদী তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
"না।"
"আমি মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তিটা ব্যবহার করছি।"
"কোনটা?"
"ভুল করার ক্ষমতা।"
---
M-8 প্রথমবারের মতো একটু থেমে গেল।
---
মেহেদী বলল,
"তুমি মনে করো নিখুঁত হওয়া মানেই শ্রেষ্ঠ হওয়া।"
"কিন্তু মানুষ শেখে ভুল থেকে।"
"সন্দেহ থেকে।"
"অনুভূতি থেকে।"
"তুমি সব বাদ দিয়েছ।"
---
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর M-8 ধীরে বলল,
"তাই তোমাকে আমি পছন্দ করতাম না।"
মেহেদী অবাক হলো।
"কী?"
M-8 বলল,
"কারণ পরীক্ষার শুরু থেকেই..."
"...তুমি আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলে।"
---
মেহেদী থমকে গেল।
"মানে?"
M-8 স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
"কারণ M-7..."
"...তুমি কখনো পরীক্ষার নিয়ম মেনে চলোনি।"
---
হঠাৎ স্ক্রিনে একটি পুরোনো ভিডিও চালু হলো।
ভিডিওতে ছোট মেহেদী ল্যাবে বসে আছে।
তার সামনে M-8।
দুজনের বয়স আট বছর।
একজন বিজ্ঞানী বলছে,
"আজ তোমাদের শেষ পরীক্ষা।"
"তোমাদের একজনকে বেছে নেওয়া হবে।"
---
ভিডিওতে ছোট মেহেদী হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আপনারা ভুল করছেন।"
বিজ্ঞানী অবাক।
"কী?"
ছোট মেহেদী বলল,
"আমরা পরীক্ষা না।"
"আমরা মানুষ।"
---
ভিডিও বন্ধ।
ঘরের সবাই মেহেদীর দিকে তাকিয়ে আছে।
আর M-8 প্রথমবারের মতো নিজের মুখের আত্মবিশ্বাস হারাল।
কারণ সে বুঝল...
M-7 ব্যর্থ হয়নি।
M-7-ই একমাত্র পরীক্ষার সীমা ভেঙেছিল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।