কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩২: কাউন্টডাউন
মেহেদীর কথা শেষ হতেই মারুফ আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না।
তিনি ওয়্যারলেসে শান্ত গলায় বললেন,
"সব ইউনিট শুনুন। আতঙ্ক সৃষ্টি করবেন না। শিক্ষকদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে মাঠ খালি করুন। কেউ দৌড়াবে না।"
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"তুই নিশ্চিত?"
মেহেদী ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বলল,
"না।"
"কিন্তু একজন তদন্তকারীর কাজ নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা করা নয়। সম্ভাব্য বিপদ থাকলে আগে মানুষকে নিরাপদে সরানো।"
---
মাঠে ঘোষণা দেওয়া হলো।
"প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে প্রদর্শনী কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হচ্ছে। সবাই অনুগ্রহ করে শ্রেণিকক্ষে চলে যান।"
শিক্ষকরা পরিস্থিতি সামলে নিলেন।
কোনো হুড়োহুড়ি হলো না।
মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে মাঠ প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।
---
মারুফ, মেহেদী, মিতু এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের দুই সদস্য স্টল নম্বর ৪২-এর সামনে দাঁড়ালেন।
কিন্তু...
সাদা অ্যাপ্রন পরা তরুণটি নেই।
সে অদৃশ্য।
---
শাহীনুর দৌড়ে এসে বলল,
"পেছনের গেট দিয়ে একজন বেরিয়ে গেছে!"
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে দুইজন কনস্টেবলকে পাঠিয়ে দিলেন।
---
এদিকে বোমা বিশেষজ্ঞ সাবধানে ব্যাগটি খুললেন।
ভেতরে কোনো বিস্ফোরক নেই।
বরং একটি ছোট ইলেকট্রনিক যন্ত্র।
একটি স্পিকার।
একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার।
আর একটি ডিজিটাল টাইমার।
টাইমারে এখনো চলছে...
০০:০২:১৭
---
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"এটা বোমা না?"
বোমা বিশেষজ্ঞ মাথা নাড়লেন।
"না।"
"তাহলে?"
"মনে হচ্ছে এটা কোনো সংকেত পাঠানোর যন্ত্র।"
---
মিতু দ্রুত সার্কিট পরীক্ষা করল।
তারপর বলল,
"এটার সঙ্গে ছোট একটি রেডিও ট্রান্সমিটার যুক্ত আছে।"
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"কাজ কী?"
"টাইমার শূন্যে পৌঁছালে..."
"...এটা নির্দিষ্ট একটি রেডিও সিগন্যাল পাঠাবে।"
---
মেহেদীর চোখ সরু হয়ে এল।
"তাহলে আসল যন্ত্র এখানে নেই।"
"এটা শুধু ট্রিগার।"
---
ঠিক তখনই টাইমার শেষ হতে আর মাত্র চল্লিশ সেকেন্ড বাকি।
মারুফ বললেন,
"এখন কী করব?"
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর পুরো মাঠের দিকে তাকাল।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল স্কুল ভবনের ছাদের ওপর।
একটি বড় অ্যান্টেনা।
যেটা আগে ছিল না।
---
"ছাদে!"
চিৎকার করে উঠল সে।
"সবাই ছাদে চলুন!"
---
মারুফ আর মেহেদী দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।
ছাদে পৌঁছে তারা দেখল...
অ্যান্টেনার পাশে একটি ধাতব বাক্স।
তার সঙ্গে কয়েকটি শক্তিশালী দিকনির্দেশক স্পিকার লাগানো।
মিতু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"এগুলো..."
"আল্ট্রাসনিক স্পিকার!"
---
মেহেদী বাক্সটা পরীক্ষা করল।
"পুরোপুরি না।"
"এটা এক ধরনের নির্দেশিত শব্দতরঙ্গ ব্যবস্থা।"
"নির্দিষ্ট দিকে খুব জোরে শব্দ পাঠানো যায়, অন্যরা টেরও পায় না।"
---
মারুফ বললেন,
"কিন্তু এতে মানুষ মারা যাবে কীভাবে?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"মারা যাবে না।"
"তাহলে?"
"আতঙ্ক ছড়াবে।"
---
মিতু ব্যাখ্যা করল,
"কিছু নিম্ন বা উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ মানুষকে অস্বস্তি, মাথা ঘোরা, উদ্বেগ বা অকারণ ভয়ের অনুভূতি দিতে পারে।"
"যদিও এগুলোর প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয় এবং এগুলো দিয়ে মানুষের মন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।"
"কিন্তু ভিড়ের মধ্যে আতঙ্ক শুরু করানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে।"
---
টাইমারে...
০০:০০:০৮
মারুফ বললেন,
"কেটে দিই?"
মেহেদী দ্রুত সার্কিটের দিকে তাকাল।
"না!"
"কেন?"
"দুইটা তার একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করতে হবে।"
---
০০:০০:০৫
মেহেদী স্ক্রু-ড্রাইভার ঢুকিয়ে সার্কিটের দুটি সংযোগ একসঙ্গে আলাদা করে দিল।
টাইমার...
০০:০০:০১
...
তারপর নিভে গেল।
চারপাশে নীরবতা।
কেউ কথা বলছে না।
---
সৌরভ হাঁফ ছেড়ে বলল,
"শেষ?"
মেহেদী ধীরে মাথা নাড়ল।
"না।"
"এটা ছিল একটা পরীক্ষা।"
---
ঠিক তখনই মিতুর ফোনে একটি ভিডিও চলে এল।
কেউ পাঠায়নি।
অজানা নেটওয়ার্ক থেকে নিজে থেকেই এসেছে।
ভিডিওতে কালো মুখোশ পরা একজন মানুষ।
তার কণ্ঠ শান্ত।
"অভিনন্দন, মেহেদী।"
"তুমি আবারও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ।"
"তুমি মানুষ বাঁচিয়েছ।"
সে কয়েক সেকেন্ড থামল।
তারপর বলল,
"কিন্তু..."
"...তুমি কি জানো, আজ আমরা কাউকে মারতেই আসিনি?"
মেহেদীর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
লোকটি আবার বলল,
"আজকের উদ্দেশ্য ছিল..."
"...দেখা, চাপের মধ্যে তুমি কী সিদ্ধান্ত নাও।"
"আর তুমি ঠিক সেই সিদ্ধান্তই নিয়েছ..."
"...যেটা আমরা অনুমান করেছিলাম।"
ভিডিওর শেষে মুখোশধারী ব্যক্তি টেবিলের ওপর একটি দাবার বোর্ড রাখল।
তারপর একটি কালো ঘোড়ার গুটি সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,
«"প্রথম চাল শেষ। এখন সত্যিকারের খেলা শুরু হবে, গোয়েন্দা মেহেদী।"»
ভিডিও বন্ধ হয়ে গেল।
মেহেদী কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আস্তে বলল,
"না..."
"এবার থেকে চাল আমি দেব।"
দূরে স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল।
কিন্তু কেউ খেয়াল করল না...
স্কুলের মূল ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ ঝাড়ুদার মৃদু হেসে নিজের টুপিটা ঠিক করলেন।
টুপির ভেতরের অংশে সেলাই করা ছিল একটি ছোট প্রতীক।
তিনটি বৃত্ত।
মাঝখানে একটি চোখ।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।