কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩৬: মৃত মানুষের আঙুলের ছাপ
ফরেনসিক রিপোর্টের কপি টেবিলের ওপর রাখা।
ঘরের সবাই একই কাগজের দিকে তাকিয়ে আছে।
Fingerprint Match: ৯৭.৮%
Reference Record: Professor Afsar Rahman
মারুফ ধীরে বললেন,
"এটা যদি সত্যি হয়..."
"...তাহলে একজন নিখোঁজ মানুষ এখনও বেঁচে আছেন।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"অথবা আরও একটা সম্ভাবনা আছে।"
সৌরভ জিজ্ঞেস করল,
"কী সম্ভাবনা?"
"ফরেনসিক রিপোর্টও কখনো কখনো ভুল হতে পারে, অথবা কেউ ইচ্ছা করে বিভ্রান্তিকর প্রমাণ রেখে যেতে পারে। তাই একটি প্রমাণ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।"
---
মিতু আবার রিপোর্টটা হাতে নিল।
"একটা বিষয় অদ্ভুত লাগছে।"
"কী?"
"এখানে লেখা আছে 'আংশিক আঙুলের ছাপ'।"
"মানে পুরো ছাপ নয়।"
মেহেদী বলল,
"ঠিক তাই। আংশিক ছাপ মিললেও সেটা অন্য প্রমাণ দিয়ে নিশ্চিত করতে হয়।"
---
ঠিক তখনই ফরেনসিক ল্যাবের প্রধান বিজ্ঞানী ড. তাহসিন ভিডিও কলে যুক্ত হলেন।
তিনি বললেন,
"আমি রিপোর্টটা আবার পরীক্ষা করেছি।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কোনো সমস্যা আছে?"
ড. তাহসিন উত্তর দিলেন,
"সমস্যা না... বরং একটা অদ্ভুত বিষয়।"
---
তিনি স্ক্রিনে দুটি ছবি দেখালেন।
একটি পুরোনো আঙুলের ছাপ।
আরেকটি নতুন।
"দেখুন।"
"মূল রেখাগুলো মিলছে।"
"কিন্তু..."
"ছাপের কিছু অংশে খুব সূক্ষ্ম বিকৃতি আছে।"
---
মিতু বলল,
"বিকৃতি মানে?"
ড. তাহসিন উত্তর দিলেন,
"মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আঙুলের চামড়া ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।"
"পুরো ছাপ বদলানোর জন্য নয়..."
"শুধু তদন্তকে বিভ্রান্ত করার জন্য।"
---
মেহেদী হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
"আমি বুঝেছি।"
সবাই তার দিকে তাকাল।
---
"যদি কেউ নিজের পরিচয় লুকাতে চায়..."
"তাহলে সে আঙুলের ছাপ মুছে ফেলতে পারে।"
"কিন্তু..."
"যদি সে চায় তদন্তকারীরা নির্দিষ্ট একজনকে সন্দেহ করুক..."
"...তাহলে সে আংশিক মিল রেখে প্রমাণও তৈরি করতে পারে।"
---
মারুফ বললেন,
"অর্থাৎ..."
"আমরা এখনো জানি না এই ছাপ আসলে কার।"
---
ঠিক তখনই থানার বাইরে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
পুরো ভবন অন্ধকার।
মাত্র দুই সেকেন্ড।
তারপর জরুরি জেনারেটর চালু হলো।
আলো ফিরে এল।
সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু...
মিতু হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
"ফাইল!"
---
PROJECT MIRROR-এর মোটা ফাইলটা টেবিলে নেই।
মাত্র দুই সেকেন্ডের অন্ধকারে...
ফাইল উধাও।
---
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
"কেউ বের হবে না!"
পুলিশ পুরো ভবন তল্লাশি শুরু করল।
কিন্তু ফাইলের কোনো খোঁজ নেই।
---
মেহেদী টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
যেখানে ফাইলটা ছিল, সেখানে একটি সাদা দাবার গুটি পড়ে আছে।
রাজা।
তার নিচে ভাঁজ করা ছোট্ট কাগজ।
সে কাগজ খুলল।
তাতে লেখা—
«"চোরকে ধরতে চাইলে, আগে বুঝতে হবে সে কখন চুরি করেছে।"»
---
সৌরভ রেগে বলল,
"এটা অসম্ভব!"
"মাত্র দুই সেকেন্ডে কেউ ফাইল নিয়ে গেল?"
---
মেহেদী উত্তর দিল না।
সে সিলিংয়ের দিকে তাকাল।
তারপর দেয়ালের ঘড়ির দিকে।
তারপর দরজার পাশে দাঁড়ানো পুলিশ সদস্যদের দিকে।
হঠাৎ সে হেসে ফেলল।
---
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"হাসছিস কেন?"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"কারণ..."
"ফাইলটা দুই সেকেন্ডে চুরি হয়নি।"
---
ঘরের সবাই একসঙ্গে বলল,
"মানে?"
---
"আমরা ধরে নিয়েছি, বিদ্যুৎ যাওয়ার সময়ই চুরি হয়েছে।"
"কিন্তু সেটা শুধু আমাদের অনুমান।"
---
সে টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাস দেখাল।
"দেখুন।"
"ফাইলটা এখানে ছিল।"
"কিন্তু গ্লাসের নিচে ধুলোর বৃত্ত অক্ষত।"
"যদি দুই সেকেন্ডে তাড়াহুড়ো করে ফাইল সরানো হতো..."
"...গ্লাস নড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।"
---
মিতুর চোখ বড় হয়ে গেল।
"তার মানে..."
---
"ফাইলটা আগেই বদলে নেওয়া হয়েছে।"
"বিদ্যুৎ যাওয়াটা ছিল শুধু আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য।"
---
মারুফ ধীরে বললেন,
"অর্থাৎ..."
"আমাদের ভেতরেই কেউ সুযোগ পেয়েছিল?"
---
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"এবং সেই মানুষটি জানত..."
"...আমরা কখন বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে আসল ঘটনা মনে করব।"
---
ঠিক তখনই থানার সিসিটিভি রুম থেকে ফোন এলো।
"স্যার..."
"অদ্ভুত একটা বিষয় পাওয়া গেছে।"
"কী?"
"বিদ্যুৎ যাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে..."
"...একজন পুলিশ সদস্য প্রমাণাগার কক্ষে ঢুকেছিল।"
মারুফ বললেন,
"কে?"
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
"সমস্যা সেখানেই..."
"সে পুলিশের ইউনিফর্ম পরেছিল।"
"কিন্তু..."
"...আমাদের থানায় ওই নামে কোনো পুলিশ সদস্যই নেই।"
মেহেদী ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তারপর আস্তে বলল,
"PROJECT MIRROR..."
"এবার বুঝলাম।"
"ওরা শুধু ছদ্মবেশ পরে না..."
"ওরা মানুষের পরিচয় ধার নিয়েও কাজ করে।"
আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার মাথায় একটি ভয়ঙ্কর প্রশ্ন জন্ম নিল।
তাহলে... এতদিন যাদের সে বিশ্বাস করেছে, তাদের সবাই কি সত্যিই তারা ছিল?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।