কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১: রক্তের বৃত্ত
রাত তখন প্রায় আড়াইটা।
মেহেদীর মোবাইল ফোন হঠাৎ কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে মারুফ আংকেলের নাম।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ক্লান্ত গলা ভেসে এল।
"মেহেদী... এখনই বের হতে পারবি?"
মেহেদী বিছানা থেকে উঠে বসে বলল,
"কী হয়েছে?"
"আরেকটা খুন।"
"কোথায়?"
"ময়নাপুর গ্রাম।"
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে মারুফ আরও বললেন,
"এই কেসটা আগেরগুলোর মতো না।"
---
এক ঘণ্টা পর মেহেদী, সৌরভ, শাহীনুর ও মিতু পুলিশের গাড়িতে করে ময়নাপুর পৌঁছাল।
গ্রামটা অস্বাভাবিকভাবে নিশ্চুপ।
বেশিরভাগ বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ।
কেউ বাইরে বের হচ্ছে না।
শুধু দূরে কয়েকজন বৃদ্ধ কোরআন তিলাওয়াত করছেন, আর কিছু মানুষ ভয়ে ফিসফিস করছে।
একজন বৃদ্ধ বললেন,
"স্যার... ওখানে যাবেন না।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কেন?"
"ওটা মানুষের কাজ না।"
"অভিশাপ নেমেছে।"
---
অপরাধস্থল ছিল গ্রামের মাঝখানের একটি পুরোনো বটগাছ।
পুলিশ আগেই এলাকা ঘিরে রেখেছে।
মেহেদী সামনে এগিয়েই থেমে গেল।
মাটিতে পড়ে আছে প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ।
দেহে বড় কোনো ক্ষত নেই।
কিন্তু মুখে এমন আতঙ্কের ছাপ, যেন মৃত্যুর আগে তিনি ভয়ঙ্কর কিছু দেখেছিলেন।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল মরদেহের চারপাশে আঁকা একটি নিখুঁত বৃত্ত।
প্রায় তিন মিটার ব্যাস।
বৃত্তের ভেতরে লাল রঙের অসংখ্য চিহ্ন।
দেখতে অনেকটা তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রতীকের মতো।
সৌরভ ধীরে বলল,
"এগুলো কি রক্ত?"
মিতু হাঁটু গেড়ে নমুনা সংগ্রহ করল।
"এখনই বলা যাবে না।"
---
ঠিক তখনই গ্রামের একজন লোক দৌড়ে এসে বলল,
"স্যার, কাল রাতেও আলো নেমেছিল!"
মেহেদী তাকাল।
"কী রকম আলো?"
"লাল আগুনের মতো।"
"আকাশ থেকে নেমে এসে এই গাছটার চারপাশে ঘুরছিল।"
আরেকজন বলল,
"আমরা সবাই দেখেছি।"
মারুফ শান্তভাবে বললেন,
"সবাই?"
লোকটি একটু থেমে বলল,
"মানে... যারা বাইরে ছিল।"
মেহেদী কিছু লিখে নিল।
সে লক্ষ্য করল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এক নয়।
কেউ বলছে লাল আলো।
কেউ বলছে নীল।
কেউ বলছে সাদা।
একই ঘটনা হলে বর্ণনা এত ভিন্ন হওয়ার কথা নয়।
---
শাহীনুর হঠাৎ গাছের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এইটা দেখ!"
সবাই এগিয়ে গেল।
গাছের গায়ে প্রায় দশ ফুট উঁচুতে একটি গভীর পোড়া দাগ।
যেন সেখানে প্রচণ্ড তাপ লেগেছিল।
মারুফ বললেন,
"বজ্রপাত?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"বজ্রপাত হলে দাগের ধরন আলাদা হতো।"
"আর আশপাশের বাকলও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা।"
---
এদিকে মিতুর প্রাথমিক পরীক্ষার ফল এল।
সে বিস্মিত গলায় বলল,
"বৃত্তের লাল দাগ..."
"...মানুষের রক্ত নয়।"
সৌরভ জিজ্ঞেস করল,
"তাহলে?"
"প্রাণীরও না।"
"এটা রক্তই নয়।"
"এক ধরনের লাল রঞ্জক পদার্থ।"
---
ঠিক তখনই মেহেদীর চোখে পড়ল আরও অদ্ভুত একটি বিষয়।
বৃত্তের এক অংশে ঘাসগুলো সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে।
কিন্তু ঠিক এক ফুট দূরের ঘাস একেবারে সতেজ।
সে মাটি থেকে সামান্য নমুনা তুলে একটি ছোট যন্ত্র দিয়ে তাপমাত্রা মাপল।
মিতু অবাক হয়ে বলল,
"কী পেলি?"
মেহেদী ধীরে উত্তর দিল,
"একই জায়গার মাটিতে তাপমাত্রার পার্থক্য প্রায় আট ডিগ্রি।"
"এটা স্বাভাবিক নয়।"
---
ঠিক তখনই গ্রামের ইমাম সাহেব এগিয়ে এলেন।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
"বাবারা, গ্রামের মানুষ ভয়ে আছে।"
"কেউ বলছে জিনের কাজ, কেউ বলছে তান্ত্রিকের অভিশাপ।"
"আপনারা সত্যটা বের করুন।"
মেহেদী সম্মানের সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"আমরা প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।"
---
সেই সময়ই পুলিশের এক কনস্টেবল দৌড়ে এল।
"স্যার!"
"কী হয়েছে?"
"মৃত লোকটার বাড়ি তল্লাশি করতে গিয়ে একটা বাক্স পেয়েছি।"
বাক্সটি এনে খুলতেই ভেতরে পাওয়া গেল...
একটি কালো কাপড়।
কয়েকটি অদ্ভুত ধাতব দণ্ড।
আর একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা মাত্র একটি লাইন।
> "যে বৃত্ত সম্পূর্ণ করবে, সে মৃত্যুকে ডাকবে।"
চিঠির নিচে কোনো নাম নেই।
কিন্তু একটি প্রতীক আছে।
সেটা ASTER-এর নয়।
একেবারেই নতুন।
তিনটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তের মাঝখানে একটি চোখের চিহ্ন।
মেহেদী প্রতীকটির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
"এটা..."
"...নতুন কেউ খেলায় নেমেছে।"
দূরে হঠাৎ মসজিদের আজান ভেসে এল।
আর একই সময়ে...
বটগাছের ঠিক ওপরে বসে থাকা শত শত কাক একসঙ্গে ডানা ঝাপটিয়ে আকাশে উড়ে গেল।
মেহেদী গাছের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো...
এই বৃত্তটি কোনো ধর্মীয় আচার নয়।
এটি হয়তো একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার অংশ।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।