কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩৮: যে জীবন কখনো ছিল না
মেহেদী দীর্ঘক্ষণ পরিচয়পত্রটার দিকে তাকিয়ে রইল।
ছবিটা তারই।
অন্তত প্রথম দেখায় তাই মনে হয়।
কিন্তু যত ভালো করে দেখছে, ততই ছোট ছোট পার্থক্য চোখে পড়ছে।
ছবির ছেলেটির চুল একটু ছোট।
ডান গালের পাশে ক্ষীণ একটি দাগ।
হাসিটাও অন্যরকম।
মেহেদী ফিসফিস করে বলল,
"এটা আমার ছবি না..."
"এটা এমন একজনের ছবি, যে আমাকে খুব ভালোভাবে নকল করেছে।"
---
মারুফ পরিচয়পত্রটি হাতে নিয়ে বললেন,
"এটা জাল হতে পারে।"
মিতু সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
"হতে পারে। তবে আগে পরীক্ষা করা দরকার।"
সে একটি ছোট অতিবেগুনি (UV) আলো বের করে পরিচয়পত্রের ওপর ফেলল।
কয়েক সেকেন্ড পর লুকানো নিরাপত্তা চিহ্ন ফুটে উঠল।
কলেজের লোগো।
সিরিয়াল নম্বর।
মাইক্রোপ্রিন্ট।
সবই আসল পরিচয়পত্রের মতো।
---
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"তাহলে এটা আসল?"
মিতু মাথা নাড়ল।
"এখনই সেটা বলা যাবে না। ভালো মানের নকলও অনেক সময় আসল নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করতে পারে। মূল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।"
---
মেহেদী পরিচয়পত্রের নিচে লেখা কলেজের নাম পড়ল।
সোনাপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ।
সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"আমি এই কলেজের নামও আগে শুনিনি।"
---
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে জেলার শিক্ষা অফিসে ফোন করলেন।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
"স্যার..."
"এ নামে কোনো কলেজ বর্তমানে নেই।"
---
"বর্তমানে?"
মারুফ প্রশ্ন করলেন।
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
"প্রায় নয় বছর আগে ছিল।"
"তারপর সেটি বন্ধ হয়ে যায়।"
---
ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
মেহেদী ধীরে বলল,
"বন্ধ হয়ে যাওয়া কলেজের পরিচয়পত্র..."
"যার ছবিটা আমার মতো..."
"এটা কাকতালীয় নয়।"
---
মারুফ পুরোনো নথি আনালেন।
দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর একটি ফাইল পাওয়া গেল।
সোনাপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ।
প্রতিষ্ঠাকাল...
আট বছর।
বন্ধ হওয়ার কারণ...
অগ্নিকাণ্ড।
---
মিতু ফাইল পড়তে পড়তে থেমে গেল।
"অদ্ভুত!"
"কী?"
"আগুনে পুরো প্রশাসনিক ভবন পুড়ে গিয়েছিল।"
"কিন্তু..."
"কোনো ছাত্রের মৃত্যুর রেকর্ড নেই।"
---
মেহেদী নিচু গলায় বলল,
"তাহলে এত বড় আগুনে সবাই বেঁচে গেল?"
মারুফ ধীরে উত্তর দিলেন,
"হয়তো..."
"অথবা পুরো ঘটনাটা অন্য কিছু।"
---
ঠিক তখনই ফাইলের ভেতর থেকে একটি পুরোনো গ্রুপ ছবি বেরিয়ে এল।
প্রায় চল্লিশজন ছাত্র।
সবার মুখ স্পষ্ট।
মেহেদী ছবিটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।
সে ছবির এক কোণে আঙুল রাখল।
"এই ছেলেটাকে বড় করে দেখাও।"
---
মিতু ছবিটি স্ক্যান করে বড় করল।
ছেলেটির মুখ...
আবারও মেহেদীর মতো।
তবে এবার পার্থক্য আরও পরিষ্কার।
ডান গালে ছোট দাগ।
একই চোখ।
একই চোয়াল।
কিন্তু সে মেহেদী নয়।
---
সৌরভ আস্তে বলল,
"যমজ?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না।"
"এত তাড়াতাড়ি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।"
---
ছবির নিচে নাম লেখা।
মাহির হাসান।
---
ঘরে নীরবতা।
শাহীনুর বলল,
"হাসান?"
"তোর পদবিও তো হাসান!"
---
মেহেদীর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
কিন্তু সে নিজেকে শান্ত রাখল।
"একই পদবি মানেই সম্পর্ক নয়।"
---
মারুফ আবার ফাইল উল্টাতে লাগলেন।
শেষ পাতায় একটি উপস্থিতির তালিকা।
তার পাশে ছাত্রদের অভিভাবকের নাম।
মাহির হাসানের বাবার নাম...
ড. আরিফ সালেহ।
---
মেহেদীর হাত থেকে ফাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
ড. আরিফ সালেহ।
ECHO প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা।
যার ভিডিও তারা আগেই দেখেছে।
---
মিতু ধীরে বলল,
"এর মানে..."
"ড. আরিফের একটা ছেলে ছিল?"
---
মেহেদী চোখ বন্ধ করল।
মাথার ভেতর হঠাৎ কয়েকটি অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠল।
একটি লাল বল।
একটি শ্রেণিকক্ষ।
একজন কিশোর...
যে তাকে বলছে,
"সব উত্তর বইয়ে লেখা থাকে না।"
---
মেহেদী হঠাৎ চোখ খুলল।
"আমি ওকে আগে দেখেছি..."
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"কোথায়?"
"মনে করতে পারছি না।"
"কিন্তু..."
"এই মুখটা আমার অচেনা নয়।"
---
ঠিক তখনই থানার কম্পিউটারে একটি এনক্রিপ্টেড বার্তা এসে পৌঁছাল।
কেউ কোনো ইমেইল পাঠায়নি।
কোনো নম্বরও নেই।
শুধু একটি লাইন।
«"মাহিরকে খুঁজো না। সে বহু বছর আগেই মারা গেছে।"»
তার নিচে আরেকটি লাইন।
«"বরং খুঁজে বের করো... কে তার জায়গা নিয়েছে।"»
মেহেদী ধীরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
"এখন খেলাটা বদলে গেছে।"
"আমরা আর একজন খুনিকে খুঁজছি না..."
"...আমরা এমন একজন মানুষকে খুঁজছি, যে বহু বছর ধরে অন্য একজনের জীবন বেঁচে আছে।"
দূরে থানার দেয়ালঘড়িতে রাত দুইটার ঘণ্টা বাজল।
আর একই সময়ে...
শহরের অন্য প্রান্তে একটি অন্ধকার ঘরে বসে একজন মুখোশধারী মানুষ একটি পুরোনো ছবিতে আগুন ধরিয়ে দিল।
ছবিটিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল দুই কিশোর।
একজনের নিচে লেখা...
মাহির।
অন্যজনের নাম আগুনে পুড়ে যাওয়ার আগেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।