কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ৩২: প্রজেক্ট ০০১
ধাতব করিডোরে পা রাখতেই মেহেদীর জুতোর শব্দ চারদিকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
টক... টক... টক...
করিডোরের দুই পাশের দেয়াল কংক্রিটের হলেও তার ওপর আধুনিক ধাতব আবরণ লাগানো। দেখে বোঝা যায়, জায়গাটি বহু বছর আগে তৈরি হলেও পরে কয়েক দফা সংস্কার করা হয়েছে।
সৌরভ নিচু স্বরে বলল,
"এটা তো সামরিক বাঙ্কারের মতো লাগছে।"
মারুফ মাথা নাড়লেন।
"সরকারি কোনো পুরোনো স্থাপনা ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণ এখনও নেই।"
মেহেদী চুপচাপ হাঁটছিল। তার চোখ করিডোরের প্রতিটি কোণ পর্যবেক্ষণ করছে।
হঠাৎ সে থেমে গেল।
দেয়ালের এক পাশে ছোট ছোট গোল দাগ।
শাহীনুর বলল,
"কী হলো?"
মেহেদী আঙুল দিয়ে দাগগুলো স্পর্শ করল।
"এগুলো গুলির চিহ্ন।"
মারুফ এগিয়ে এসে দেখলেন।
"পুরোনো। অন্তত বিশ বছরের।"
"অর্থাৎ এখানে কখনও সংঘর্ষ হয়েছিল।"
---
করিডোরের শেষ মাথায় একটি বিশাল দরজা।
দরজার ওপরে লেখা,
PROJECT 001
দরজার নিচে আরেকটি লাইন।
> "স্মৃতি পরিবর্তনের আগে মানুষের ভয়কে বুঝতে হবে।"
মিতু ফিসফিস করে বলল,
"মানে স্মৃতি নিয়ে গবেষণার আগেও অন্য কিছু চলছিল।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হয়তো এটিই মূল গবেষণা।"
---
দরজা খুলতেই সবাই অবাক হয়ে গেল।
ভেতরে কোনো ল্যাব নেই।
বরং একটি বিশাল লাইব্রেরি।
হাজার হাজার ফাইল।
পুরোনো ভিডিও ক্যাসেট।
হার্ডডিস্ক।
অডিও টেপ।
সবকিছু নম্বর অনুযায়ী সাজানো।
ঘরের মাঝখানে একটি মাত্র কাঠের টেবিল।
তার ওপর রাখা একটি ক্যাসেট প্লেয়ার।
পাশে একটি কাগজ।
> "প্রথমে শুনবে। তারপর বিচার করবে।"
---
মেহেদী ক্যাসেটটি চালু করল।
কিছুক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর একজন বৃদ্ধ মানুষের কণ্ঠ।
"আজ ১২ জানুয়ারি, ১৯৯৫।"
"এটি প্রজেক্ট ০০১-এর প্রথম অডিও নোট।"
"আমাদের লক্ষ্য কোনো অলৌকিক শক্তি তৈরি করা নয়।"
"আমাদের লক্ষ্য..."
"...মানুষ কেন অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করে, সেটা বোঝা।"
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
---
অডিও চলতে থাকল।
"আজ আমরা স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর একটি সহজ পরীক্ষা চালিয়েছি।"
"একই শব্দ দুটি দলে শোনানো হয়।"
"প্রথম দলকে বলা হয়েছিল, এটি একটি সাধারণ শব্দ।"
"দ্বিতীয় দলকে বলা হয়েছিল, এটি একটি রহস্যময় মন্ত্র।"
"ফলাফল..."
"দ্বিতীয় দলের বেশিরভাগ সদস্য পরে দাবি করেছেন, তারা শরীরে অদ্ভুত অনুভূতি পেয়েছেন।"
মিতু ধীরে বলল,
"এটা প্রত্যাশা বা expectation effect-এর উদাহরণ হতে পারে। মানুষ আগে থেকেই কোনো কিছুকে রহস্যময় ভাবলে, বাস্তব অনুভূতিকেও সেইভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।"
মেহেদী বলল,
"তাহলে..."
"ASTER শুরু থেকেই মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছিল।"
---
অডিওর শেষের দিকে কণ্ঠটি ভারী হয়ে গেল।
"আমাদের গবেষণা ভুল মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে।"
"তারা মানুষের ভয়কে অস্ত্র বানাতে চায়।"
"আমি এই প্রকল্প বন্ধ করতে চাই।"
"যদি আমি বেঁচে না থাকি..."
"...তাহলে যে এই রেকর্ড শুনবে, সে যেন মনে রাখে..."
"...অলৌকিকের সবচেয়ে বড় শক্তি অলৌকিকতা নয়।"
"...মানুষের বিশ্বাস।"
অডিও থেমে গেল।
---
সৌরভ গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
"তাহলে এতদিন যারা তান্ত্রিক সেজে মানুষকে ভয় দেখিয়েছে..."
মেহেদী বাকিটা বলল,
"...তারা মানুষের মনস্তত্ত্ব, রাসায়নিক পদার্থ, বিভ্রম, আলোর কৌশল আর গুজবকে একসঙ্গে ব্যবহার করেছে।"
"জাদু নয়।"
"পরিকল্পিত প্রতারণা।"
---
ঠিক তখনই লাইব্রেরির এক কোণে থাকা একটি পুরোনো প্রজেক্টর নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
দেয়ালে একটি ভিডিও ফুটে উঠল।
একটি সভাকক্ষ।
বারোজন বিজ্ঞানী গোল টেবিলে বসে আছেন।
আগের ছবির সেই বারোজন।
এগারোজনের মুখ স্পষ্ট।
দ্বাদশ ব্যক্তির মুখ এবারও ঝাপসা।
ইচ্ছাকৃতভাবে।
হঠাৎ সেই ঝাপসা মানুষটি কথা বলল।
কণ্ঠটি বিকৃত করা।
"আজ থেকে গবেষণার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে।"
"আমরা শুধু মানুষের বিশ্বাস নিয়ে গবেষণা করব না।"
"আমরা বিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করব।"
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন বিজ্ঞানী প্রতিবাদ করলেন।
একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
"আমি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছি।"
মেহেদী মনোযোগ দিয়ে কণ্ঠটি শুনল।
তারপর ধীরে বলল,
"...এটা ড. আরিফ।"
ভিডিওতে আরেকজন বললেন,
"এটা বিজ্ঞান নয়।"
"এটা সামাজিক অস্ত্র তৈরি করা।"
কিন্তু ঝাপসা মুখের মানুষটি শান্ত গলায় উত্তর দিল,
"ইতিহাসে সত্য নয়..."
"...বিশ্বাসই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।"
ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
---
ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরির পেছনের বুকশেলফ দুদিকে সরে যেতে শুরু করল।
ধীরে ধীরে একটি গোপন কক্ষ উন্মুক্ত হলো।
ঘরের মাঝখানে কাঁচের বাক্স।
তার ভেতরে একটি পুরোনো কালো ডায়েরি।
ডায়েরির মলাটে সোনালি অক্ষরে লেখা মাত্র দুটি শব্দ।
> "Director's Journal"
মেহেদী ধীরে ধীরে কাঁচের বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল।
সে বুঝতে পারল...
এটাই হয়তো সেই ডায়েরি, যেখানে প্রথম ডিরেক্টর নিজের হাতে লিখে গেছেন ASTER-এর জন্ম, উদ্দেশ্য এবং সবচেয়ে অন্ধকার গোপন সত্য।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।