পেশ করছি পরবর্তী পর্ব।
কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৭০: দুটি পথ
ভোর ৫টা ১০।
থানার ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছে মেহেদী।
পূর্ব আকাশে সূর্য উঠছে।
কিন্তু তার মনে যেন আরও ঘন অন্ধকার।
কামরানের শেষ প্রশ্নটি বারবার কানে বাজছে।
«"তুমি কি আমাকে ধরতে চাও, নাকি জানতে চাও তুমি আসলে কে?"»
---
পেছন থেকে মারুফ এসে দাঁড়ালেন।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর মারুফ বললেন,
"যদি তুমি নিজের অতীত খুঁজতে যাও..."
"আমি তোমাকে দোষ দেব না।"
---
মেহেদী ধীরে মাথা নাড়ল।
"না।"
"আমার অতীত অপেক্ষা করতে পারে।"
"কিন্তু একজন অপরাধীকে অপেক্ষা করানো যায় না।"
---
মারুফ প্রথমবারের মতো হাসলেন।
"এই কারণেই তুমি মেহেদী।"
---
ঠিক তখনই মিতু ছাদে উঠে এল।
তার হাতে একটি পুরোনো ফাইল।
"আমি ২০০৬ সালের উদ্ধার হওয়া শিশুটির নথি পেয়েছি।"
---
মেহেদী দ্রুত ফাইলটি খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা।
উদ্ধারের স্থান: শালবন গ্রাম।
তার নিচে আরেকটি লাইন।
পরিচয়ের একমাত্র সূত্র: নীল রঙের দরজাওয়ালা একটি বাড়ির ছবি আঁকতে পারত।
---
মেহেদীর শরীর কেঁপে উঠল।
"নীল দরজা..."
---
মিতু বলল,
"আরও আছে।"
"শিশুটি জ্ঞান ফেরার পর বারবার একটি নাম বলছিল।"
---
মেহেদী নিঃশ্বাস আটকে জিজ্ঞেস করল,
"কোন নাম?"
---
মিতু ধীরে পড়ল।
'রুদ্র।'
---
সবাই স্তব্ধ।
---
মারুফ নিচু গলায় বললেন,
"তুমি কি রুদ্রকে ছোটবেলা থেকে চিনতে?"
---
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"আমি জানি না।"
"কিন্তু..."
"হয়তো আমাদের পথ আজকের নয়।"
---
ঠিক তখনই রাশেদ ল্যাব থেকে ফোন করল।
"স্যার!"
"কামরানের পাঠানো ভিডিওতে লুকানো আরেকটি স্তর পেয়েছি।"
---
ভিডিওটি আবার চালানো হলো।
এবার বিশেষ সফটওয়্যার দিয়ে প্রতিটি ফ্রেম বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
হঠাৎ একটি ফ্রেমে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য অন্য একটি ছবি দেখা গেল।
একটি গ্রামের প্রবেশদ্বার।
সামনে বড় অক্ষরে লেখা।
শালবন।
---
মিতু বিস্ময়ে বলল,
"সে ইচ্ছা করেই এটা লুকিয়ে রেখেছিল।"
---
মেহেদী শান্তভাবে বলল,
"হ্যাঁ।"
"সে আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে চায়।"
---
মারুফ প্রশ্ন করলেন,
"তাহলে আমরা যাব?"
---
মেহেদী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর উত্তর দিল,
"আমরা যাব।"
"তবে আমার অতীত খুঁজতে নয়।"
"কামরান কেন চায় আমি সেখানে যাই..."
"সেটা জানতে।"
---
ঠিক সেই মুহূর্তে থানার প্রধান ফটকে একটি পুরোনো জিপ এসে থামল।
ডিউটি অফিসার দৌড়ে এসে বলল,
"স্যার, একজন বৃদ্ধ আপনাকে খুঁজছেন।"
---
বৃদ্ধ লোকটিকে ভেতরে আনা হলো।
তার বয়স প্রায় সত্তর।
চোখে মোটা চশমা।
হাতে কাঠের লাঠি।
তিনি মেহেদীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
"তোমার গলায় যে লকেটটা আছে..."
"...ওটা আমি চিনতে পেরেছি।"
---
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
"আপনি কে?"
---
বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
"আমি শালবন গ্রামের স্কুলশিক্ষক ছিলাম।"
"বিশ বছর আগে..."
"...এক রাতে তুমি আর আরেকটি ছেলে হঠাৎ গ্রাম থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলে।"
---
মেহেদীর কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।
"আরেকটি ছেলে?"
---
বৃদ্ধ চোখ নামিয়ে বললেন,
"হ্যাঁ।"
"তোমরা দুজন সব সময় একসঙ্গে থাকতে।"
"একই রকম লকেট পরতে।"
---
ঘরে নেমে এল গভীর নীরবতা।
মেহেদী খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,
"তার নাম... কী ছিল?"
বৃদ্ধ ধীরে মাথা তুললেন।
তার চোখে জল।
তিনি বললেন,
«"তার নাম ছিল... রুদ্র।"»
মেহেদীর হাত থেকে ফাইলটি মেঝেতে পড়ে গেল।
যে মানুষটিকে সে এতদিন একজন রহস্যময় অপরাধী বলে খুঁজছিল...
সে হয়তো কোনো অচেনা শত্রু নয়।
সে...
তার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সবচেয়ে কাছের মানুষ।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।