পর্ব ৪: যে গুলি কাউকে স্পর্শ করল না
গুলির শব্দে পুরো ক্যাম্প কেঁপে উঠল।
"নিচে!" চিৎকার করে উঠল মারুফ।
সবাই মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশে শুধু মানুষের দ্রুত নিঃশ্বাস আর বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেউ ব্যথায় চিৎকার করল না।
মারুফ টর্চ জ্বালাতেই দেখা গেল, ঘরের একপাশের কাঠের আলমারিতে একটি গর্ত। গুলিটা আলমারিতে লেগেছে।
"সবাই ঠিক আছ?" তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
সবাই মাথা নাড়ল।
মেহেদী ধীরে ধীরে উঠে আলমারির কাছে গেল। আঙুল দিয়ে গর্তটা ছুঁয়ে দেখল। তারপর মেঝে থেকে একটি বিকৃত বুলেট তুলে নিল।
সে কয়েক মুহূর্ত বুলেটটার দিকে তাকিয়ে রইল।
"আংকেল... এটা আমাদের মারার জন্য ছোড়া হয়নি।"
মারুফ বিস্মিত হলেন।
"তাহলে?"
"এটা একটা বার্তা।"
"কীভাবে বুঝলি?"
"যে দূরত্ব থেকে গুলি করা হয়েছে, সেই দূরত্বে একজন দক্ষ শুটার চাইলে কাউকে মিস করত না। গুলিটা ইচ্ছে করেই আলমারিতে লাগানো হয়েছে।"
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।
খুনি শুধু ভয় দেখাতে চেয়েছে।
...
পরদিন সকালে বুলেটটি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলো।
এদিকে মেহেদী একা একা প্রথম দুইটি হত্যাস্থলের ছবি আবার দেখতে শুরু করল।
সে হঠাৎ সৌরভকে ডাকল।
"এই ছবিটা বড় করে দেখ তো।"
সৌরভ ল্যাপটপে ছবিটি জুম করতেই মেহেদী বলল,
"আরও... আরও..."
হঠাৎ ছবির এক কোণায় অদ্ভুত একটা জিনিস দেখা গেল।
গাছের গায়ে ছোট্ট একটি গোল দাগ।
প্রথম দেখায় সাধারণ পেরেকের মাথা মনে হয়।
কিন্তু মেহেদী ফিসফিস করে বলল,
"এটা পেরেক না।"
"তাহলে?"
"ক্যামেরা।"
সৌরভ হতভম্ব।
"এত ছোট?"
"পিনহোল ক্যামেরা।"
মারুফ ছবিটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পাঠালেন।
এক ঘণ্টা পর খবর এল।
গাছের গায়ে সত্যিই একটি ক্ষুদ্র ক্যামেরা বসানো ছিল।
কিন্তু তার মেমোরি কার্ড নেই।
কেউ আগেই খুলে নিয়ে গেছে।
...
মিতু এদিকে মৃতদের পারিবারিক তথ্য জোগাড় করছিল।
দুপুরে সে দৌড়ে এসে বলল,
"একটা মিল পেয়েছি!"
সবাই তার দিকে তাকাল।
"দুইজন মৃতই পাঁচ বছর আগে একই জমি নিয়ে একটি মামলার সাক্ষী ছিল।"
মারুফ ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"কোন মামলা?"
"পুরোনো জমিদারবাড়ির মালিকানা নিয়ে।"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল।
"যে জমিদারবাড়িতে এখন তান্ত্রিকরা থাকে?"
"হ্যাঁ।"
ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
মেহেদী ধীরে বলল,
"তাহলে তান্ত্রিকরা হয়তো কারণ নয়..."
"মানে?"
"হয়তো তারা পর্দা।"
...
সন্ধ্যার দিকে গ্রামের এক বৃদ্ধ নিজে থেকেই ক্যাম্পে এলেন।
লোকটার বয়স আশির কাছাকাছি।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
"আমি একটা কথা এতদিন কাউকে বলিনি।"
মারুফ তাকে বসতে দিলেন।
বৃদ্ধ বললেন,
"প্রায় এক মাস আগে আমি রাতের বেলা জমিদারবাড়ির পেছনে কয়েকজন মানুষকে বড় বড় লোহার বাক্স নামাতে দেখেছিলাম।"
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"কতজন ছিল?"
"ছয়-সাতজন।"
"তাদের মধ্যে তান্ত্রিক ছিল?"
বৃদ্ধ একটু ভেবে বললেন,
"না... তারা সবাই সাধারণ পোশাকে ছিল।"
"বাক্সগুলো কোথায় নিয়ে গিয়েছিল?"
"মাটির নিচে।"
"আপনি কাউকে বলেননি কেন?"
বৃদ্ধ মাথা নিচু করলেন।
"পরদিন সকালে আমার উঠানে একটা ছাগলের কাটা মাথা রেখে গিয়েছিল। তারপর থেকে আমি চুপ।"
...
সেদিন রাতেই মেহেদী সিদ্ধান্ত নিল।
জমিদারবাড়ির পেছনের অংশ খুঁড়ে দেখা হবে।
পুলিশের সাহায্যে নিরবে কাজ শুরু হলো।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর কোদাল শক্ত কিছুর সঙ্গে ঠেকে গেল।
লোহার বাক্স।
একটা নয়।
দুইটা।
তিনটা।
মোট চারটি।
সবাই নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইল।
প্রথম বাক্স খুলতেই ভেতরে পাওয়া গেল অসংখ্য বৈদ্যুতিক তার, ছোট প্রজেক্টর, ব্যাটারি, সেন্সর আর অদ্ভুত কিছু যন্ত্রাংশ।
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"এগুলো দিয়ে পুরো একটা ভৌতিক শো বানানো যায়!"
দ্বিতীয় বাক্সে ছিল ধোঁয়া তৈরির রাসায়নিক, আয়না, লুকানো স্পিকার আর বিশেষ ধরনের আলো।
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"তাহলে অন্তত ওদের জাদুর রহস্য শেষ।"
কিন্তু তৃতীয় বাক্স খুলতেই সবাই থেমে গেল।
ভেতরে সারি সারি কাঁচের শিশি।
প্রতিটি শিশিতে গাঢ় লাল তরল।
মিতু একটা শিশি হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"...এটা কি রক্ত?"
মারুফ দ্রুত বললেন,
"কেউ ছুঁবে না।"
সবগুলো ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা হলো।
শেষে চতুর্থ বাক্সটি খোলা হলো।
ভেতরে একটি পুরোনো ডায়েরি।
মলাটে শুধু দুটি ইংরেজি অক্ষর।
A. S.
মেহেদী প্রথম পৃষ্ঠা খুলল।
পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে।
প্রথম লাইন পড়েই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সেখানে লেখা ছিল,
> "যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ে, তবে বুঝে নিও, আমি তান্ত্রিক নই। আমি একজন বিজ্ঞানী। আর আমি এমন একটি পরীক্ষা শুরু করেছি, যা কখনও পৃথিবীর সামনে আসা উচিত ছিল না।"
ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
মেহেদী ধীরে ধীরে পরের পাতায় হাত বাড়াল।
ঠিক তখনই দূরে জমিদারবাড়ির ভেতর থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এল।
মাটিও যেন কেঁপে উঠল।
মারুফ চিৎকার করে উঠলেন,
"সবাই নিচু হও!"
আগুনের লেলিহান শিখা রাতের অন্ধকার চিরে আকাশের দিকে উঠতে লাগল।
আর মেহেদীর মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।
কেউ কি প্রমাণ নষ্ট করছে, নাকি... কেউ এখনও সেই পরীক্ষাটা চালিয়ে যাচ্ছে?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।