কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩৭: বিশ্বাসের পরীক্ষা
রাত তখন প্রায় একটা।
থানার কনফারেন্স রুমে কেউ কথা বলছে না।
মেহেদী ধীরে ধীরে টেবিলের চারপাশে হাঁটছে।
তার মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন।
যদি কেউ পুলিশের পরিচয় নিয়ে থানায় ঢুকতে পারে... তাহলে সে কীভাবে নিরাপত্তা পেরোল?
---
মারুফ নীরবতা ভাঙলেন।
"থানায় ঢোকার জন্য পরিচয়পত্র লাগে।"
"ডিউটি অফিসারও ছিল।"
"তবু কেউ ধরা পড়ল না।"
---
মেহেদী বলল,
"কারণ মানুষ মুখ চিনে না..."
"মানুষ পরিচিত চিহ্ন চিনে।"
"ইউনিফর্ম, পরিচয়পত্র, আত্মবিশ্বাসী আচরণ।"
"এগুলো দেখেই আমরা ধরে নিই লোকটি আসল।"
---
মিতু বলল,
"এটাকে সামাজিক মনোবিজ্ঞানে Authority Bias বলা হয়। মানুষ অনেক সময় কর্তৃত্বের প্রতীক দেখেই যাচাই না করে বিশ্বাস করে ফেলে।"
---
ঠিক তখন একজন কনস্টেবল সিসিটিভির ভিডিও নিয়ে এল।
ভিডিওতে দেখা গেল, রাত ৮টা ১২ মিনিটে একজন পুলিশ সদস্য থানায় ঢুকছে।
তার হাতে একটি ফাইল।
হাঁটার গতি স্বাভাবিক।
সে কাউকে এড়িয়ে চলছে না।
বরং সবাইকে মাথা নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।
---
সৌরভ বলল,
"এ তো একেবারে আসল পুলিশের মতো!"
---
মেহেদী ভিডিও থামাল।
"না।"
সে জুম করল।
লোকটির ডান হাতের দিকে।
"এটা দেখো।"
---
সবার চোখ স্ক্রিনে।
লোকটি বাম হাতে স্যালুট করছে।
মারুফ ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"এতে সমস্যা কী?"
মেহেদী শান্তভাবে বলল,
"বাংলাদেশ পুলিশে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী স্যালুট ডান হাতে করা হয়।"
"বাম হাতে স্যালুট করা খুবই অস্বাভাবিক।"
---
ঘরে নীরবতা।
কেউ এত ছোট বিষয় খেয়ালই করেনি।
---
মেহেদী বলল,
"ছদ্মবেশ নিখুঁত ছিল।"
"কিন্তু অভ্যাস নিখুঁত ছিল না।"
---
মিতু ভিডিও আরও এগিয়ে নিল।
লোকটি করিডোর পার হয়ে প্রমাণাগারের দিকে যাচ্ছে।
ঠিক দরজার সামনে এসে...
সে এক সেকেন্ডের জন্য ক্যামেরার দিকে তাকাল।
মুখে হালকা হাসি।
তারপর ভিডিওতে ঝিরঝির শব্দ।
ফ্রেম কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিকৃত।
আবার সব স্বাভাবিক।
---
মারুফ বললেন,
"এটা কি কেউ হ্যাক করেছে?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হতে পারে।"
"আবার ক্যামেরার ত্রুটিও হতে পারে। এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।"
---
শাহীনুর বলল,
"তাহলে এখন কী করব?"
---
মেহেদী হঠাৎ বলল,
"সেদিন থানায় মোট কতজন পুলিশ ডিউটিতে ছিল?"
"ত্রিশজন।"
"সবাইকে ডাকুন।"
---
কয়েক মিনিটের মধ্যে সবাই উপস্থিত হলো।
মেহেদী কোনো প্রশ্ন করল না।
বরং টেবিলের ওপর একটি সাধারণ কলম রাখল।
তারপর বলল,
"যিনি এই কলমটি নিজের বলে মনে করেন, তিনি তুলে নিন।"
সবাই অবাক।
মারুফও।
---
প্রায় বিশ সেকেন্ড কেউ নড়ল না।
তারপর একজন কনস্টেবল বললেন,
"স্যার, এটা তো আমার না।"
অন্যরাও একই কথা বলল।
---
মেহেদী হেসে ফেলল।
"আমি এটাই আশা করেছিলাম।"
---
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
"কলম দিয়ে কী বুঝলি?"
---
মেহেদী উত্তর দিল,
"যে মানুষ মিথ্যা পরিচয় নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করে..."
"...সে সবসময় আশপাশের জিনিসকে নিজের বলে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।"
"কিন্তু আসল সদস্যরা নিজের জিনিস সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে।"
---
ঠিক তখনই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কনস্টেবল অজান্তেই বলল,
"স্যার, কলমটা তো..."
কথা শেষ করার আগেই সে থেমে গেল।
ঘরের সবাই তার দিকে তাকাল।
---
মেহেদী ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।
"তুমি বাকিটা বললে না কেন?"
লোকটি হেসে বলল,
"ভুল হয়েছে, স্যার।"
---
মেহেদী তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব শান্তভাবে বলল,
"তোমার নাম?"
"রবিউল।"
---
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
"রবিউল আজ ছুটিতে আছে।"
ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।
লোকটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
এক সেকেন্ড...
দুই সেকেন্ড...
তারপর সে হঠাৎ পাশের জানালার দিকে দৌড় দিল।
---
মারুফ চিৎকার করলেন,
"ধরো!"
লোকটি জানালার কাঁচ ভেঙে বাইরে লাফ দিল।
পুলিশ তার পেছনে ছুটল।
মেহেদীও দৌড়াতে শুরু করল।
থানার পেছনের অন্ধকার গলি।
লোকটি দ্রুত দৌড়াচ্ছে।
কিন্তু মেহেদী লক্ষ্য করল...
তার দৌড়ানোর ভঙ্গি।
ডান পা সামান্য টেনে হাঁটে।
বাম কাঁধ একটু নিচু।
একই অভ্যাস...
স্কুলের সেই ভুয়া ঝাড়ুদারের।
মেহেদী আস্তে বলল,
"অবশেষে..."
"তোমাকে খুঁজে পেলাম।"
লোকটি গলির শেষ মাথায় পৌঁছে একটি মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে গেল।
মারুফ গুলি চালালেন না।
কারণ সামনে সাধারণ মানুষ ছিল।
মোটরসাইকেলটি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
মাটিতে পড়ে রইল শুধু একটি কালো ব্যাগ।
ব্যাগ খুলতেই সবাই অবাক।
ভেতরে ছিল...
বিভিন্ন পেশার পরিচয়পত্র।
পুলিশ।
ডাক্তার।
সাংবাদিক।
স্কুলশিক্ষক।
এমনকি...
একটি কলেজের ছাত্র পরিচয়পত্রও।
ছবিতে যার মুখ...
অবিশ্বাস্যভাবে মেহেদীর মতো।
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
কার্ডের নিচে লেখা নামটি দেখে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
"মেহেদী হাসান (প্রশিক্ষণার্থী)"
কিন্তু কলেজের নাম...
সে জীবনে কখনো সেখানে পড়েনি।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।