কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ২৭: মৃত মানুষের কণ্ঠ
অঘোরী রুদ্রের মুখে "M-7" শব্দটা শোনার পর মেহেদী এক মুহূর্তের জন্যও নিজের বিস্ময় প্রকাশ করল না। বরং সে লক্ষ্য করল লোকটার চোখ। একজন মানুষ যখন মিথ্যা বলে, তখন তার চোখ, শ্বাসপ্রশ্বাস, মুখের ক্ষুদ্র পেশির নড়াচড়া অনেক কিছু বলে দেয়। কিন্তু রুদ্রের চোখ ছিল অস্বাভাবিক শান্ত। যেন সে আগে থেকেই জানত এই মুহূর্তটা আসবে।
রুদ্র ধীরে ধীরে আশ্রমের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। চারপাশের লোকজন তার পা ছুঁয়ে সালাম করছে। কেউ ফুল দিচ্ছে, কেউ কান্না করছে। একজন মহিলা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "বাবা, আমার ছেলেটার সঙ্গে আর একবার কথা বলিয়ে দিন।"
রুদ্র মহিলার মাথায় হাত রেখে শুধু বলল, "আজ রাতেই সে আসবে।"
মহিলার মুখে সঙ্গে সঙ্গে আশার আলো ফুটে উঠল।
মেহেদী ফিসফিস করে বলল, "এটাই ওর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মানুষকে অলৌকিক কিছু দেখানোর আগে ওদের আশা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে।"
মিতু মাথা নাড়ল। "এটাকে সাইকোলজিতে Suggestion Effect বলা হয়। কাউকে আগে থেকেই কোনো কিছুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে দিলে, পরে সে অস্পষ্ট ঘটনাকেও সেই অর্থে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে।"
সৌরভ বলল, "মানে মানুষ যা দেখতে চায়, সেটাই দেখতে শুরু করে?"
"অনেক ক্ষেত্রেই তাই," মিতু উত্তর দিল।
ঠিক তখন রুদ্র আবার মেহেদীর দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি কি আজ রাতের অনুষ্ঠান দেখবে?"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল, "দেখব। তবে বিশ্বাস করতে নয়। বুঝতে।"
রুদ্র হালকা হাসল। "বিজ্ঞান সবকিছুর উত্তর দিতে পারে না, ছেলে।"
মেহেদীও হাসল। "আর অন্ধবিশ্বাস কোনো প্রশ্নই করতে পারে না।"
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন ফিসফিস শুরু করল। কেউ বলল, "ছেলেটা সর্বনাশ ডেকে আনছে।" আবার কেউ বলল, "বাবার সঙ্গে তর্ক করলে ভালো হবে না।"
সন্ধ্যা নামতেই আশ্রমের মাঝখানের বড় হলঘর মানুষে ভরে গেল। সব জানালা বন্ধ। শুধু মোমবাতির আলো। ধূপের ঘন ধোঁয়ায় পুরো ঘর ঝাপসা।
মেহেদী নিচু গলায় বলল, "ধোঁয়া যত বেশি হবে, মানুষের চোখ তত বেশি বিভ্রমে পড়বে। আলো-ছায়ার ভুল ব্যাখ্যাও বাড়বে।"
মিতু লক্ষ্য করল, ছাদের চার কোণে খুব ছোট কালো রঙের কিছু বসানো আছে।
সে মোবাইলের ক্যামেরা জুম করে বলল, "ওগুলো কী?"
মেহেদী তাকিয়ে বলল, "ক্যামেরা না... ছোট স্পিকারও হতে পারে।"
অনুষ্ঠান শুরু হলো।
রুদ্র মন্ত্র পড়তে লাগল। কয়েক মিনিট পর সে একজন বৃদ্ধকে সামনে ডাকল।
"তুমি কাকে দেখতে চাও?"
বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আমার স্ত্রীকে।"
ঘরের সব আলো নিভে গেল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ অন্ধকার।
তারপর দূরের সাদা পর্দার ওপর অস্পষ্ট একটা নারীর অবয়ব দেখা গেল।
হলঘর কেঁপে উঠল।
"ওই তো!"
"ওই তো মানুষটা!"
কেউ কাঁদছে, কেউ প্রণাম করছে।
বৃদ্ধ লোকটি কাঁদতে কাঁদতে সামনে এগোতে লাগলেন।
ঠিক তখনই সেই নারীকণ্ঠ ভেসে এল।
"আমি ভালো আছি..."
"তুমিও চলে এসো..."
বৃদ্ধ লোকটি যেন সম্মোহিতের মতো হাঁটতে শুরু করলেন।
কিন্তু হঠাৎ মেহেদী সামনে লাফ দিয়ে তার হাত ধরে ফেলল।
"থামুন!"
রুদ্র গর্জে উঠল, "ছেড়ে দাও!"
মেহেদী বৃদ্ধকে টেনে নিজের দিকে আনল।
ঠিক সেই মুহূর্তে বৃদ্ধ যেখানে পা রাখতে যাচ্ছিলেন, সেখানে মেঝের কাঠ ভেঙে নিচে একটি গভীর গর্ত দেখা গেল।
গর্তের নিচে বাঁশের ধারালো খুঁটি।
সৌরভ চিৎকার করে উঠল, "ফাঁদ!"
ঘরের মানুষ আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি শুরু করল।
মারুফ দ্রুত টর্চ জ্বালালেন।
আলো পড়তেই পর্দার নারীটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
মিতু ছাদের দিকে টর্চ ধরল।
এক কোণে কাচের পাতলা শিট আর বিশেষ কোণে বসানো একটি শক্তিশালী প্রজেক্টর দেখা গেল।
মেহেদী শান্তভাবে বলল, "এটা কোনো আত্মা না। এটা Pepper's Ghost নামে পরিচিত বহু পুরোনো অপটিক্যাল ইলিউশন। সঠিক কোণে কাচ ও আলো ব্যবহার করলে মানুষ ভাসমান অবয়ব দেখতে পায়।"
লোকজন স্তব্ধ।
রুদ্রের কয়েকজন শিষ্য পালানোর চেষ্টা করতেই মারুফ তাদের ধরে ফেললেন।
কিন্তু...
রুদ্র কোথাও নেই।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অন্ধকারে সে উধাও হয়ে গেছে।
মেহেদী আশ্রমের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল।
ধূপের ছাইয়ের মধ্যে একটি ছোট ধাতব টুকরো পড়ে আছে।
সে সেটা হাতে তুলে নিল।
ওটার গায়ে খোদাই করা মাত্র দুটি অক্ষর।
NX
মেহেদীর চোখ সরু হয়ে এল।
সে ধীরে বলল,
"রুদ্র কোনো একা প্রতারক নয়..."
"...সে NEXUS-এর অংশ।"
ঠিক তখনই মারুফের ওয়্যারলেসে খবর এলো।
"স্যার, গ্রামের পশ্চিম দিকের শ্মশানে আরেকটা লাশ পাওয়া গেছে।"
"অবস্থা আগেরগুলোর মতোই..."
মেহেদী উঠে দাঁড়াল।
"তার মানে..."
"আজ রাতের অনুষ্ঠানটা শুধু আমাদের ব্যস্ত রাখার জন্য ছিল।"
"আসল খুনটা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।