কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২০: যে মানুষটি নিজের নাম ভুলে গেল
কালোছায়া গ্রামের ঘটনায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে।
সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি "পরিত্যক্ত গবেষণাগারের রহস্য" নামেই পরিচিত হয়েছে। পুলিশের অফিসিয়াল বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একটি অবৈধ গবেষণাকেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে এবং কয়েকজন অপহৃত মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু প্রজেক্ট নির্বাণ, ASTER কিংবা ড. আরিফ সালেহ সম্পর্কে একটি শব্দও প্রকাশ করা হয়নি।
মেহেদীও বিষয়টি নিয়ে কাউকে কিছু বলেনি।
কারণ সে জানত, রহস্যের মাত্র দশ শতাংশই উন্মোচিত হয়েছে।
---
কলেজে সেদিন ছিল ইন্টার পরীক্ষার প্রস্তুতি ক্লাস।
অনেক দিন পর মেহেদী, সৌরভ, শাহীনুর আর মিতু একসঙ্গে ক্লাসে বসেছে।
শিক্ষক বোর্ডে গণিতের একটি জটিল সমস্যা লিখে সমাধান করছেন।
হঠাৎ পেছনের বেঞ্চ থেকে একটি অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল।
একজন ছাত্র হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে।
তার চোখ স্থির।
মুখে ভয়ের ছাপ।
শিক্ষক বিরক্ত হয়ে বললেন,
"রাকিব, কী হয়েছে?"
ছেলেটি চারদিকে তাকাল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
"স্যার..."
"...আমি কে?"
পুরো ক্লাস স্তব্ধ হয়ে গেল।
শিক্ষক প্রথমে ভেবেছিলেন ছেলেটা হয়তো মজা করছে।
"বসো।"
"না স্যার..."
"...আমি সত্যিই মনে করতে পারছি না আমি কে।"
সে নিজের ব্যাগের দিকে তাকাল।
বইয়ের দিকে তাকাল।
চারপাশের বন্ধুদের দিকে তাকাল।
কিন্তু তার চোখে কোনো পরিচয়ের ছাপ নেই।
---
দশ মিনিটের মধ্যে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
ডাক্তাররা ধারণা করলেন, হয়তো সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ।
কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেল...
সে নিজের নাম জানে না।
বাবা-মাকে চিনতে পারছে না।
কিন্তু গণিতের জটিল সূত্র মুখস্থ বলতে পারছে।
ইংরেজিতে সাবলীল কথা বলতে পারছে।
সাইকেল চালাতে পারছে।
অর্থাৎ...
তার দক্ষতাগুলো ঠিক আছে। হারিয়ে গেছে শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি।
---
সন্ধ্যায় মারুফ ফোন করলেন।
"মেহেদী, হাসপাতালে আসতে পারবি?"
"কী হয়েছে?"
"আজকের ছেলেটা একা না।"
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
---
হাসপাতালে পৌঁছে সে দেখল, আরও তিনজন রোগী ভর্তি।
একজন ব্যাংকের কর্মকর্তা।
একজন স্কুলশিক্ষিকা।
একজন রিকশাচালক।
তিনজনের বয়স, পেশা, জীবন সম্পূর্ণ আলাদা।
কিন্তু সমস্যাটা একই।
তারা নিজেদের পরিচয় ভুলে গেছে।
---
মিতু প্রত্যেকের রিপোর্ট দেখছিল।
হঠাৎ সে বলল,
"অদ্ভুত।"
"কী?"
"চারজনেরই ব্রেন স্ক্যান প্রায় স্বাভাবিক।"
"কোনো আঘাত নেই।"
"স্ট্রোক নেই।"
"টিউমার নেই।"
"তাহলে স্মৃতি গেল কীভাবে?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
---
মেহেদী রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
সে প্রথমে রাকিবকে জিজ্ঞেস করল,
"এটা কী?"
সে একটি কলম দেখাল।
"কলম।"
"এটা?"
"ঘড়ি।"
"বাংলাদেশের রাজধানী?"
"ঢাকা।"
"দুই আর দুই যোগ করলে?"
"চার।"
সব ঠিক।
তারপর মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"তোমার বাবার নাম কী?"
রাকিবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"জানি না।"
"তোমার বাড়ি কোথায়?"
"...জানি না।"
---
মেহেদী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর পকেট থেকে একটি ছোট আয়না বের করে রাকিবের হাতে দিল।
"নিজের মুখটা দেখো।"
রাকিব আয়নায় তাকাল।
প্রায় এক মিনিট।
তারপর ফিসফিস করে বলল,
"...এই মানুষটাকে আমি চিনি না।"
ঘরে উপস্থিত সবাই শিউরে উঠল।
---
ঠিক তখনই একজন নার্স দৌড়ে এল।
"স্যার!"
"আরেকজন রোগী এসেছে!"
সবাই দ্রুত জরুরি বিভাগে গেল।
স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন প্রায় ষাট বছরের এক বৃদ্ধ।
তিনি জ্ঞান ফেরার পর প্রথম কথাই বললেন,
"আমার নাম..."
তিনি থেমে গেলেন।
তারপর মাথা চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
"আমি... আমি..."
বাকিটা বলতে পারলেন না।
---
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"এটা কি কোনো নতুন রোগ?"
মিতু মাথা নাড়ল।
"এক দিনে পাঁচজন?"
"অসম্ভব নয়, কিন্তু খুব অস্বাভাবিক।"
---
ঠিক তখনই হাসপাতালের এক জুনিয়র ডাক্তার এগিয়ে এলেন।
"স্যার, একটা কথা বলব?"
"বলুন।"
"আজ বিকেলে পাঁচজন রোগীর শরীরেই একটা জিনিস পেয়েছি।"
তিনি একটি ছোট স্বচ্ছ শিশি টেবিলে রাখলেন।
ভেতরে নীলাভ রঙের তরল।
মেহেদীর চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
সে ধীরে শিশিটা হাতে নিল।
আলোর নিচে ঘুরিয়ে দেখল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
"...না..."
"...এটা হতে পারে না।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কী হয়েছে?"
মেহেদী শিশিটা টেবিলে রেখে বলল,
"এই নীল রাসায়নিক..."
"...আমরা আগের কেসেও পেয়েছিলাম।"
ঘরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল।
ASTER আবার ফিরে এসেছে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।