কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৪২: কোড ১১৭
ইটভাটার অফিসঘরে সবাই এখনো "১১৭" সংখ্যাটার দিকে তাকিয়ে।
সৌরভ নীরবতা ভেঙে বলল,
"এটা কি রুম নম্বর?"
মিতু মাথা নাড়ল।
"হতে পারে। আবার কোনো ফাইল নম্বরও হতে পারে।"
মেহেদী ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
"না।"
"ওরা সব সময় একই নিয়ম মেনে চলে।"
"সংখ্যা কখনো সরাসরি উত্তর দেয় না।"
"সংখ্যা আমাদের সঠিক জায়গায় নিয়ে যায়।"
---
মারুফ বললেন,
"তাহলে শুরু কোথা থেকে করব?"
মেহেদী চারদিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
"এই ঘর থেকেই।"
---
মিতু পুরো ঘরটা আবার পরীক্ষা করতে শুরু করল।
টেবিল।
আলমারি।
জানালা।
মেঝে।
সবই স্বাভাবিক।
কিন্তু মেহেদী দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল।
সে আঙুল দিয়ে ইটে টোকা দিতে লাগল।
একটা...
দুইটা...
তিনটা...
হঠাৎ একটি জায়গায় শব্দ বদলে গেল।
ফাঁপা আওয়াজ।
---
"এখানে কিছু আছে।"
শাহীনুর হাতুড়ি এনে ইটটা সাবধানে খুলল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ছোট ধাতব বাক্স।
বাক্সের ওপর খোদাই করা।
117
---
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"তাহলে সংখ্যাটা বাক্সের কোড ছিল!"
---
বাক্স খুলতেই সবাই হতবাক।
ভেতরে টাকা, অস্ত্র বা নথি কিছুই নেই।
আছে...
একটি দাবার বোর্ড।
কিন্তু বোর্ডে মাত্র তিনটি গুটি।
একটি সাদা রাজা।
একটি কালো ঘোড়া।
আর একটি সাদা উজির।
---
মারুফ বললেন,
"এর মানে কী?"
মেহেদী গুটিগুলোর অবস্থান লক্ষ্য করল।
তারপর বলল,
"এটা এলোমেলো নয়।"
---
বাক্সের নিচে আরেকটি কাগজ ছিল।
তাতে লেখা।
«'যে খেলোয়াড় বোর্ডের দিকে তাকায়, সে হারবে।
যে খেলোয়াড় খেলোয়াড়দের দিকে তাকায়, সে জিতবে।'»
---
মিতু আস্তে বলল,
"এটা আবার মনোবিজ্ঞানের ইঙ্গিত।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর ইটভাটার বাইরে থেকে চিৎকার করল।
"স্যার!"
সবাই দৌড়ে বাইরে এল।
ভাটার পেছনে শুকনো ঘাসের মধ্যে অর্ধেক চাপা পড়ে আছে একটি কালো ভ্যান।
ধুলায় ঢাকা।
দেখে মনে হয় বহুদিনের পুরোনো।
---
ভ্যানের দরজা খুলতেই তীব্র রাসায়নিকের গন্ধ বেরিয়ে এল।
ভেতরে পুরোনো কম্পিউটার।
ভাঙা মনিটর।
কয়েকটি ক্যামেরা।
আর দেয়ালে ঝোলানো অসংখ্য ছবি।
সব ছবিই একই মানুষের।
মেহেদী।
কখনো সে বই পড়ছে।
কখনো চা খাচ্ছে।
কখনো থানায় ঢুকছে।
কখনো কোনো অপরাধস্থলে দাঁড়িয়ে।
---
সৌরভের গলা শুকিয়ে গেল।
"ওরা..."
"...অনেক দিন ধরে তোকে অনুসরণ করছে।"
---
মেহেদী ছবিগুলো একে একে দেখছিল।
হঠাৎ সে থেমে গেল।
একটি ছবিতে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন অচেনা মানুষ।
ছবির পেছনে লেখা।
দিন-১
আরেকটি ছবিতে একই মানুষ।
দিন-৪৩
আরেকটি ছবিতে...
লোকটি নেই।
শুধু মেহেদী।
---
মিতু জিজ্ঞেস করল,
"লোকটা কে?"
মেহেদী ধীরে মাথা নাড়ল।
"আমি চিনি না।"
---
ঠিক তখনই ভ্যানের কম্পিউটারটি হঠাৎ নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
মনিটরে কালো পর্দা।
তারপর একটি বাক্য ভেসে উঠল।
«'যদি তুমি এই লেখা পড়তে পারো, তাহলে বুঝব তুমি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত এগোচ্ছ।'»
কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটি লাইন।
«'পেছনে তাকিও না।'»
স্বাভাবিকভাবেই সবাই ঘুরে দাঁড়াল।
কিন্তু মেহেদী দাঁড়িয়েই রইল।
সে পেছনে তাকাল না।
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"তুই ঘুরলি না কেন?"
মেহেদী শান্তভাবে বলল,
"কারণ এটাই ওদের পরীক্ষা।"
"মানুষকে যখন বলা হয় 'পেছনে তাকিও না', তখন বেশিরভাগ মানুষ অজান্তেই পেছনে তাকায়।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ চিৎকার করে উঠল।
"মেহেদী!"
সে পেছনে তাকিয়ে দেখেছে...
যেখানে তারা কিছুক্ষণ আগে দাঁড়িয়েছিল, সেই ভ্যানের পাশে মাটিতে রাখা ধাতব বাক্সটি নেই।
কেউ নিঃশব্দে সেটি নিয়ে গেছে।
মেহেদী চোখ বন্ধ করল।
তারপর ধীরে বলল,
"আবার একই কৌশল।"
"ওরা চায় আমরা দৃশ্যের দিকে তাকাই..."
"...আর তারা ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলে।"
ঠিক তখনই ভ্যানের মনিটরে শেষবারের মতো একটি বাক্য ভেসে উঠল।
«'অভিনন্দন, গোয়েন্দা। এখন তুমি বুঝতে শুরু করেছ। কিন্তু এখনও তুমি জানো না... তোমার টিমের একজন ইতিমধ্যেই আমার হয়ে কাজ করছে।'»
মনিটর নিভে গেল।
ঘরের ভেতর কেউ কোনো কথা বলল না।
কারণ এবার প্রথমবারের মতো...
সন্দেহের ছায়া বাইরের কারও ওপর নয়,
তাদের নিজেদের দলের ওপর এসে পড়েছে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।