কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩১: শেষ ঘণ্টা
সকালে থানার কনফারেন্স রুমে বড় একটি মানচিত্র টাঙানো হলো।
মেহেদী লাল মার্কার হাতে নিয়ে জেলার সব স্কুলে চিহ্ন দিতে শুরু করল।
মারুফ বললেন, "এলাকায় সরকারি, বেসরকারি, মাদ্রাসা মিলিয়ে প্রায় একশোর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এক দিনে সব জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা সম্ভব নয়।"
সৌরভ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"তাহলে আমরা কী করব?"
মেহেদী উত্তর দিল না। সে শুধু স্বচ্ছ প্লাস্টিকের শিটটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
"রুদ্র কখনো অকারণে তথ্য দেয় না।"
"সে যদি শুধু 'স্কুল' লিখে থাকে..."
"...তাহলে বাকি তথ্যও কোথাও লুকিয়ে আছে।"
মিতু আবার ড. সামিউলের ডায়েরি খুলল।
"আমরা কি কিছু বাদ দিয়েছি?"
প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে তারা প্রতিটি পৃষ্ঠা পরীক্ষা করল।
হঠাৎ শাহীনুর বলল,
"এক মিনিট..."
"এই পাতাগুলোর নম্বর ঠিক নেই।"
সবাই তাকাল।
সত্যিই...
৩৮ নম্বর পাতার পর সরাসরি ৪০।
৩৯ নম্বর পৃষ্ঠা নেই।
মেহেদীর চোখে ঝিলিক দেখা দিল।
"পাতাটা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে।"
"কিন্তু কেন?"
মিতু বইটা আলোয় ধরল।
ছেঁড়া পাতার চাপ এখনো রয়ে গেছে।
কিছু অক্ষরের দাগও দেখা যাচ্ছে।
সে মোবাইল দিয়ে কয়েকটি ছবি তুলে কনট্রাস্ট বাড়াল।
ধীরে ধীরে অস্পষ্ট কিছু শব্দ ফুটে উঠল।
"...প্রদর্শনী..."
"...বিজ্ঞান..."
"...জেলা..."
সৌরভ উত্তেজিত হয়ে বলল,
"বিজ্ঞান প্রদর্শনী!"
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা অফিসে ফোন করলেন।
পাঁচ মিনিট পর তথ্য এলো।
পরদিন সকাল দশটায় জেলার মাত্র একটি জায়গায় বড় বিজ্ঞান প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।
স্থান...
চন্দ্রপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।
ঘরে আবার নীরবতা।
মেহেদী আস্তে বলল,
"রুদ্র জানত আমরা সূত্রটা বের করতে পারব।"
---
পরদিন সকাল।
স্কুল মাঠ উৎসবের মতো সাজানো।
শত শত ছাত্রছাত্রী।
অভিভাবক।
শিক্ষক।
বিজ্ঞান প্রকল্পে ভর্তি স্টল।
কেউ রোবট দেখাচ্ছে।
কেউ সৌরজগতের মডেল।
কেউ পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র।
সবকিছুই স্বাভাবিক।
হয়তো অতিরিক্ত স্বাভাবিক।
মেহেদী চারদিকে তাকিয়ে বলল,
"এটাই আমাকে ভাবাচ্ছে।"
মিতু জিজ্ঞেস করল,
"কী?"
"যে মানুষ আতঙ্ক ছড়াতে চায়, সে ভিড়ের মধ্যে লুকাতে পছন্দ করে।"
---
মারুফ সাদা পোশাকের পুলিশদের চারদিকে ছড়িয়ে দিলেন।
কিন্তু কাউকে কিছু জানানো হলো না।
কারণ আতঙ্ক ছড়ালে পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
---
মেহেদী একে একে প্রতিটি স্টল ঘুরে দেখছিল।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটি ব্যানারে।
"অলৌকিক শক্তির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা"
স্টল নম্বর...
৪২
সে থেমে গেল।
আবার সেই সংখ্যা।
---
স্টলের ভেতরে একজন তরুণ দাঁড়িয়ে।
সাদা অ্যাপ্রন।
গলায় পরিচয়পত্র।
সে হাসিমুখে বলল,
"আপনারা কি প্রদর্শনী দেখতে এসেছেন?"
মেহেদী পরিচয়পত্রের দিকে তাকাল।
নাম লেখা...
রায়হান ইসলাম।
কিন্তু পরিচয়পত্রের ল্যামিনেশন একেবারে নতুন।
আর ছবির নিচে স্কুলের সিল সামান্য বেঁকে আছে।
খুব সূক্ষ্ম ভুল।
সাধারণ চোখে ধরা পড়ার কথা নয়।
---
মেহেদী হেসে বলল,
"আপনার প্রকল্পটা কী নিয়ে?"
তরুণটি উত্তর দিল,
"মানুষ কেন অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করে।"
মেহেদী বলল,
"দেখাতে পারবেন?"
"অবশ্যই।"
সে একটি ছোট বাক্স বের করল।
ভেতরে একটি ধাতব দোলক ঝুলছে।
তরুণটি বলল,
"আপনি শুধু মনে মনে একটা প্রশ্ন ভাবুন।"
"তারপর দোলকের দিকে তাকান।"
---
মেহেদী দোলকের দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড পর দোলকটি আস্তে আস্তে দুলতে শুরু করল।
চারপাশের কয়েকজন দর্শক অবাক হয়ে গেল।
"জাদু!"
"অবিশ্বাস্য!"
---
মেহেদী শান্তভাবে নিজের ডান হাতটি টেবিলের ওপর রাখল।
তারপর বলল,
"এটা জাদু না।"
তরুণটি হেসে বলল,
"তাহলে?"
মেহেদী দোলকের সুতোটি আঙুল দিয়ে আলতো ছুঁয়ে দিল।
দোলন থেমে গেল।
সে বলল,
"এটাকে আইডিওমোটর ইফেক্ট বলা হয়।"
"মানুষ নিজের অজান্তেই খুব ক্ষুদ্র পেশি নাড়ায়। সেই নড়াচড়াই দোলককে দোলাতে পারে।"
"মনে হয় যেন বাইরের কোনো শক্তি কাজ করছে।"
চারপাশের মানুষ ফিসফিস করতে লাগল।
তরুণটির হাসি মিলিয়ে গেল।
---
ঠিক তখনই মেহেদীর চোখ পড়ল টেবিলের নিচে।
একটি কালো ব্যাগ।
ব্যাগের ভেতর থেকে খুব মৃদু...
বিপ... বিপ... বিপ...
শব্দ আসছে।
মেহেদীর মুখের রং বদলে গেল।
সে নিচু গলায় বলল,
"মারুফ আঙ্কেল..."
"সবাইকে শান্তভাবে মাঠ খালি করতে হবে।"
"এখনই।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কেন?"
মেহেদী ব্যাগের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"কারণ..."
"...এই বিজ্ঞান প্রদর্শনীর আসল প্রদর্শনী এখনো শুরুই হয়নি।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।