পর্ব ১৭: নির্বাচিত
রাত তখন প্রায় তিনটা।
ভূগর্ভস্থ গবেষণাগারের কন্ট্রোল রুমে শুধু কম্পিউটারের ফ্যানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। স্ক্রিন কালো হয়ে গেছে, কিন্তু তার শেষ দেখানো লাইনটি যেন এখনও মেহেদীর মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
"Subject Selected: Mehedi Hasan."
সৌরভ চুপচাপ মেহেদীর দিকে তাকিয়ে আছে।
"দোস্ত... কিছু বল।"
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
"ভয় পেলে ওরা জিতবে।"
তার গলায় কাঁপন নেই।
বরং আগের চেয়ে আরও শান্ত।
মারুফ মৃদু হাসলেন।
"এটাই তোকে আলাদা করে।"
---
এদিকে মিতু রায়হানের শরীর পরীক্ষা করছিল।
হঠাৎ সে অবাক হয়ে বলল,
"এক মিনিট..."
সবাই তার কাছে এগিয়ে গেল।
রায়হানের বাম কানের নিচে একটি ছোট কালো দাগ।
মিতু তুলো দিয়ে পরিষ্কার করতেই দাগটা উঠে গেল।
ওটা দাগ নয়।
একটি ক্ষুদ্র QR কোড ট্যাটু।
সৌরভ দ্রুত মোবাইল দিয়ে স্ক্যান করল।
এক সেকেন্ড...
দুই সেকেন্ড...
তারপর স্ক্রিনে একটি মাত্র সংখ্যা ভেসে উঠল।
1147
"এটা আবার কী?"
মেহেদী বলল,
"এটা কোনো আইডি হতে পারে।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর গবেষণাগারের ফাইল ক্যাবিনেট খুলে চিৎকার করে উঠল।
"এদিকে আসো!"
ক্যাবিনেটের ভেতরে শত শত ফাইল।
সবগুলোর ওপর একই ধরনের নম্বর।
1091
1092
1108
...
1147
মেহেদী ১১৪৭ নম্বর ফাইলটি বের করল।
ভেতরে লেখা,
> পরীক্ষার বিষয়: রায়হান
> বয়স: ১৭
> নির্বাচনের কারণ: উচ্চ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।
> প্রকল্প: ব্যক্তিত্ব অনুকরণ।
সৌরভ কপাল কুঁচকে বলল,
"ব্যক্তিত্ব অনুকরণ?"
মেহেদী পাতা উল্টাতে লাগল।
তারপর একটি লাইনে এসে থেমে গেল।
> Target Personality: Mehedi Hasan
ঘরের ভেতর কেউ কথা বলতে পারল না।
---
মারুফ নিচু গলায় বললেন,
"ওরা... রায়হানকে তোর মতো বানাতে চাইছিল?"
"হ্যাঁ।"
মেহেদী ধীরে উত্তর দিল।
"শুধু চেহারা নয়..."
"...আচরণও।"
ফাইলে আরও লেখা ছিল,
> ভাষা অনুশীলন সম্পন্ন।
> হাতের লেখা অনুকরণ সম্পন্ন।
> হাঁটার ভঙ্গি ৮৯% মিল।
> যুক্তি বিশ্লেষণ দক্ষতা এখনও অসম্পূর্ণ।
মিতু ফিসফিস করে বলল,
"এটা তো ভয়ংকর।"
---
হঠাৎ রায়হান আবার জ্ঞান ফিরে পেল।
সে চোখ খুলেই আতঙ্কে চারদিকে তাকাতে লাগল।
মেহেদী তার পাশে বসল।
"ভয় পেও না। আমরা পুলিশ।"
রায়হান কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দুর্বল গলায় বলল,
"তুমি... সত্যিই মেহেদী?"
"হ্যাঁ।"
রায়হানের চোখ ভিজে উঠল।
"তাহলে..."
"...আমি ব্যর্থ হয়েছি।"
"কীসের ব্যর্থতা?"
"ওরা আমাকে প্রতিদিন তোমার ভিডিও দেখাত।"
"তোমার কথা বলার ভঙ্গি।"
"তোমার হাসি।"
"তোমার রাগ।"
"তোমার লেখার স্টাইল।"
সে কষ্ট করে শ্বাস নিল।
"ওরা বলত..."
"...একদিন আমাকে তোমার জায়গায় পাঠাবে।"
ঘরের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল।
---
মেহেদীর মাথার ভেতর একের পর এক ঘটনা মিলতে শুরু করল।
তার ডিএনএ ঘটনাস্থলে পাওয়া গিয়েছিল।
তার মতো দেখতে একজন মানুষ তৈরি করা হচ্ছিল।
বহু বছর ধরে তাকে নজরদারি করা হয়েছে।
এগুলো আর আলাদা আলাদা ঘটনা নয়।
একই পরিকল্পনার অংশ।
---
ঠিক তখনই সৌরভ আরেকটি ফাইল পেল।
ফাইলের ওপর বড় অক্ষরে লেখা,
PROJECT MIMIC
ভেতরে প্রথম পাতায় একটি বাক্য।
> "কোনো মানুষকে হত্যা করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো, পৃথিবীকে বিশ্বাস করানো যে সে এখনও জীবিত।"
আর দ্বিতীয় লাইনে লেখা,
> "কোনো মানুষের পরিচয় চুরি করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো, তার থেকেও বিশ্বাসযোগ্য আরেকজন মানুষ তৈরি করা।"
মারুফ ধীরে বললেন,
"তাহলে..."
"ওরা পরিচয় বদলানোর পরিকল্পনা করছিল।"
---
ঠিক সেই মুহূর্তে গবেষণাগারের সব আলো নিভে গেল।
পুরো ভবন অন্ধকার।
তারপর জরুরি লাল বাতি জ্বলে উঠল।
স্পিকারে বিকৃত কণ্ঠ ভেসে এল।
"সময় শেষ।"
"স্বয়ংক্রিয় ধ্বংস প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।"
সৌরভ আতঙ্কে কনসোলের দিকে দৌড়ে গেল।
স্ক্রিনে বড় করে লেখা।
SELF-DESTRUCT SEQUENCE
09:59
09:58
09:57...
মিতু চিৎকার করে বলল,
"দশ মিনিট!"
মারুফ গর্জে উঠলেন,
"সবাই বের হও!"
ঠিক তখনই রায়হান মেহেদীর হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
সে কষ্ট করে বলল,
"না..."
"...বের হলে ওরা জিতবে।"
"...ডান পাশের কক্ষ..."
"...সেখানে..."
সে বাক্য শেষ করার আগেই আবার অজ্ঞান হয়ে গেল।
মেহেদী লাল আলোয় ডান দিকের করিডোরের দিকে তাকাল।
কাউন্টডাউন চলছে।
09:21...
একদিকে পুরো ভবন ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি।
অন্যদিকে রায়হানের শেষ ইঙ্গিত।
মেহেদী সিদ্ধান্ত নিল।
"আংকেল, আপনারা রায়হানকে নিয়ে বের হন।"
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"তুই?"
মেহেদী করিডোরের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
"আমি ডান পাশের কক্ষটা দেখে আসছি।"
কাউন্টডাউন: 08:59...
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।