কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১৭: জন্মনিবন্ধনের ফাইল
থানার আর্কাইভ রুমে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল।
পুরোনো ভবন।
দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ।
লোহার আলমারিগুলো ধুলোয় ঢাকা।
মারুফের পরিচয়ে আর্কাইভের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা একটি বাদামি রঙের ফাইল এনে টেবিলের ওপর রাখলেন।
ফাইলের ওপরে লাল কালি দিয়ে লেখা ছিল,
CONFIDENTIAL
তার নিচে...
ASTER ARCHIVE
---
মেহেদী ধীরে ফাইলটা খুলল।
প্রথম পাতায় একটি জন্মনিবন্ধনের কপি।
নাম...
মেহেদী হাসান
জন্মতারিখ...
ঠিক তার নিজের জন্মতারিখ।
তার বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।
কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
"পুরোটা পড়ো।"
---
মিতু নথিটা হাতে নিয়ে বলল,
"একটু থামো..."
"এখানে সমস্যা আছে।"
"কী?"
"এই জন্মনিবন্ধনের সিরিয়াল নম্বর সরকারি ফরম্যাটের সঙ্গে মিলছে না।"
সৌরভ জিজ্ঞেস করল,
"মানে জাল?"
"এখনই সেটা বলা যাবে না।"
"তবে অস্বাভাবিক।"
---
মেহেদী নিচের দিকে তাকাল।
বাবার নাম লেখা।
কিন্তু কালো কালি দিয়ে মুছে ফেলা।
মায়ের নামও একইভাবে মুছে দেওয়া।
শুধু একটি অংশ দেখা যাচ্ছে।
Guardian Code: M-7
মারুফ ফিসফিস করে বললেন,
"আবার M-7..."
---
ঠিক তখনই আর্কাইভ কর্মকর্তা অবাক হয়ে বললেন,
"স্যার..."
"আরেকটা ফাইলও ছিল।"
"কোথায়?"
"এইটার নিচেই ছিল।"
তিনি দ্বিতীয় ফাইলটি বের করলেন।
সেটির ওপর লেখা...
MEHEDI HASAN
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
---
মেহেদী দ্রুত খুলে দেখল।
এবারও একই নাম।
কিন্তু জন্মতারিখ...
এক বছর আলাদা।
বাবা-মায়ের নাম সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ঠিকানা ভিন্ন।
সবকিছু ভিন্ন।
---
সৌরভ হতবাক।
"দুইটা আলাদা ফাইল?"
মিতু বলল,
"একই নামে একাধিক মানুষ থাকা স্বাভাবিক।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু দুটো ফাইলই কেন ASTER-এর গোপন আর্কাইভে থাকবে?"
---
হঠাৎ আর্কাইভ কর্মকর্তা আবার বললেন,
"দুঃখিত স্যার..."
"আরও একটা আছে।"
তিনি তৃতীয় ফাইল বের করলেন।
আবারও...
মেহেদী হাসান।
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।
---
তিনটি ফাইল।
তিনজন ভিন্ন ব্যক্তি।
একই নাম।
তিনটি ফাইলই ASTER-এর গোপন আর্কাইভে।
---
মেহেদী গভীর শ্বাস নিল।
"না..."
"এটা আমার সম্পর্কে না।"
"এটা একটা প্যাটার্ন।"
---
ঠিক তখনই মিতু প্রথম ফাইলের শেষ পৃষ্ঠা খুলে বলল,
"এটা দেখ।"
শেষ পাতায় একটি তালিকা।
Project Echo Candidate List
তার নিচে...
১. মেহেদী হাসান
২. মেহেদী হাসান
৩. মেহেদী হাসান
তারপর আরও কয়েকটি নাম।
সব একই।
শুধু জন্মতারিখ আলাদা।
---
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"একই নামের মানুষদের নিয়ে গবেষণা?"
মেহেদী ধীরে উত্তর দিল,
"সম্ভবত না।"
"তাহলে?"
"সম্ভবত..."
"...এগুলো আসল নামই না।"
---
মারুফ অবাক হয়ে তাকালেন।
"মানে?"
"গবেষণায় অনেক সময় অংশগ্রহণকারীদের আসল পরিচয় গোপন রাখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়।"
"হতে পারে..."
"...সব Subject-এর জন্য একই ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।"
মিতু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"এটা যৌক্তিক।"
---
ঠিক তখনই ফাইলের ভেতর থেকে একটি ছোট খাম মেঝেতে পড়ে গেল।
খামের ওপর লেখা,
শুধু মেহেদীর জন্য।
মারুফ তাকিয়ে বললেন,
"খুলে দেখ।"
---
খামের ভেতরে একটি পুরোনো পোলারয়েড ছবি।
ছবিতে একটি আট-নয় বছরের ছেলে।
সে একটি আয়না হাতে দাঁড়িয়ে।
মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু ছবির পেছনে হাতে লেখা—
> "যদি এই ছবির ছেলেটিকে চিনতে পারো... তাহলে বুঝবে, তুমি ভুল প্রশ্ন করছিলে।"
আর নিচে একটি সংখ্যা।
১৮:৪০
---
মেহেদী ছবিটা অনেকক্ষণ ধরে দেখল।
তারপর হঠাৎ তার চোখ ছোট হয়ে এল।
"এক মিনিট..."
সৌরভ জিজ্ঞেস করল,
"কী পেলি?"
মেহেদী ছবির কোণায় আঙুল রাখল।
"ছেলেটাকে না..."
"...পেছনের দেয়ালটা দেখ।"
সবাই ছবির পেছনের দেয়ালের দিকে তাকাল।
সেখানে খুব ছোট করে একটি স্কুলের প্রতীক আঁকা।
মারুফ বিস্মিত হয়ে বললেন,
"এটা তো..."
মেহেদী বাকিটা শেষ করল।
"...আমাদের ইন্টার কলেজের পুরোনো লোগো।"
ঘরে আবার নীরবতা।
কারণ সেই কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র বারো বছর আগে।
কিন্তু ছবির কাগজ, রং আর ক্ষয় দেখে বোঝা যাচ্ছে...
ছবিটি তারও কয়েক বছর আগের।
তাহলে...
ছবিটি পুরোনো, নাকি কলেজের ইতিহাসটাই অসম্পূর্ণ?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।