কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২১: যে স্মৃতি চুরি হয়
হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে টেবিলের মাঝখানে রাখা ছোট কাঁচের শিশিটির দিকে সবাই তাকিয়ে আছে।
নীলাভ তরল।
ঠিক আগের কেসে পাওয়া রাসায়নিকের মতোই।
মেহেদী শিশিটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে আলোয় ঘুরিয়ে দেখল।
তারপর বলল,
"রঙ একই হলেই যে রাসায়নিকও একই হবে, এমন না। আগে পরীক্ষা করতে হবে।"
মিতু মাথা নাড়ল।
"ঠিক বলেছিস। আগের ভুল এবার করা যাবে না।"
---
দুই ঘণ্টা পর ল্যাব রিপোর্ট এল।
মিতু রিপোর্ট হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কী পেলি?"
মিতু বলল,
"আংশিক মিল আছে।"
"মানে?"
"আগের কেসের রাসায়নিকে চৌম্বকীয় ন্যানোকণা ছিল।"
"এবারও আছে।"
"কিন্তু এর সঙ্গে আরও একটি নতুন যৌগ মেশানো হয়েছে।"
মেহেদী রিপোর্টটা নিয়ে পড়তে লাগল।
"এই যৌগটা কী করে?"
মিতু উত্তর দিল,
"নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে প্রাণীর ওপর করা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হিপোক্যাম্পাস নামের মস্তিষ্কের অংশে স্নায়বিক সংকেতের স্বাভাবিক আদান-প্রদান সাময়িকভাবে ব্যাহত করতে পারে।"
সৌরভ মাথা চুলকে বলল,
"বাংলায় বল।"
মিতু হেসে বলল,
"হিপোক্যাম্পাস হচ্ছে মস্তিষ্কের এমন একটি অংশ, যা নতুন স্মৃতি তৈরি ও পুরোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি মনে করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি তার কাজ ব্যাহত হয়, তাহলে মানুষ নিজের পরিচয় বা জীবনের ঘটনা মনে করতে সমস্যায় পড়তে পারে।"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
"তাহলে এটা কোনো জাদু নয়।"
"সম্ভবত পরিকল্পিত স্নায়ুবৈজ্ঞানিক আক্রমণ।"
---
ঠিক তখনই রাকিব হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
সবাই দৌড়ে তার কেবিনে গেল।
রাকিব বিছানায় বসে কাঁপছে।
"ওরা এসেছে!"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"কারা?"
"কালো পোশাক..."
"ওরা আমার মাথার ভেতর কিছু খুঁজছে..."
মারুফ চারদিকে তাকালেন।
ঘরে কেউ নেই।
মিতু দ্রুত পরীক্ষা করল।
রাকিবের রক্তচাপ বেড়ে গেছে।
হৃদস্পন্দনও দ্রুত।
কিন্তু আরও অদ্ভুত কিছু দেখা গেল।
রাকিবের চোখ বারবার ঘরের এক কোণে স্থির হয়ে যাচ্ছে।
যেখানে বাস্তবে কিছুই নেই।
---
মেহেদী কিছুক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ করল।
তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,
"তুমি কি সত্যিই মানুষ দেখছ?"
রাকিব মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"ওরা কী করছে?"
"আমার দিকে তাকিয়ে আছে..."
"...কিন্তু মুখ নেই।"
---
ঘর থেকে বেরিয়ে সৌরভ ফিসফিস করে বলল,
"এটা কি ভূত দেখছে?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হ্যালুসিনেশন হতে পারে।"
"কিন্তু কারণটা জানতে হবে।"
---
সেই রাতেই হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ দেখা শুরু হলো।
রাকিব ভর্তি হওয়ার আগের ভিডিও।
সন্ধ্যা ৫টা ১২ মিনিট।
রাকিব কলেজ থেকে বের হচ্ছে।
৫টা ১৯ মিনিট।
একটি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে।
৫টা ২২ মিনিট।
একজন ক্যাপ পরা লোক তার পাশে এসে দাঁড়াল।
লোকটির মুখ ক্যামেরায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না।
সে মাত্র তিন সেকেন্ড রাকিবের সঙ্গে কথা বলল।
তারপর চলে গেল।
পাঁচ মিনিট পর...
রাকিব নিজের মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল।
আর দশ মিনিট পর সে নিজের নাম ভুলে গেল।
---
মেহেদী ভিডিও থামাল।
"জুম কর।"
সৌরভ ছবিটা বড় করল।
লোকটির ডান হাতে একটি আংটি।
আংটির ওপর খোদাই করা...
একটি বৃত্ত।
তার ভেতরে তিনটি ছেদ করা ত্রিভুজ।
মারুফ ধীরে বললেন,
"ASTER..."
---
মেহেদী এবার অন্য চারজন রোগীর সিসিটিভিও দেখতে চাইল।
প্রথমে ব্যাংকের কর্মকর্তা।
তার সঙ্গেও কয়েক সেকেন্ড একজন অপরিচিত লোক কথা বলেছে।
স্কুলশিক্ষিকা।
একই ঘটনা।
রিকশাচালক।
একই ঘটনা।
প্রত্যেক ক্ষেত্রেই অপরিচিত মানুষটি আলাদা।
কিন্তু...
সবার হাতেই একই প্রতীকের আংটি।
---
মেহেদী টেবিলে একটি কাগজ রেখে লিখতে শুরু করল।
মিলগুলো:
আক্রান্ত সবাই অপরিচিত কারও সঙ্গে ১০ সেকেন্ডের কম সময় কথা বলেছে।
সবার শরীরে একই ধরনের নীল রাসায়নিকের চিহ্ন।
সবার ব্যক্তিগত স্মৃতি হারিয়েছে।
আক্রমণকারীদের হাতে ASTER-এর প্রতীক।
সে কলম নামিয়ে বলল,
"ওরা কাউকে এলোমেলোভাবে বেছে নিচ্ছে না।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"তাহলে?"
"ওরা কিছু খুঁজছে।"
---
ঠিক তখনই হাসপাতালের ল্যাব থেকে জরুরি ফোন এল।
মিতু ফোন ধরতেই তার মুখের রঙ বদলে গেল।
"কী বলছেন?"
সে দৌড়ে ল্যাবে গেল।
সবাই তার পেছনে।
ল্যাবে পৌঁছে দেখা গেল, রাকিবের রক্তের নমুনা রাখা ফ্রিজ খোলা।
ভেতরের সব নমুনা আছে।
শুধু...
রাকিবের নমুনাটি নেই।
দরজা ভাঙা নয়।
জানালাও বন্ধ।
সিসিটিভিতে কেউ ঢুকতেও দেখা যায়নি।
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"এটা কীভাবে সম্ভব?"
ঠিক তখনই ল্যাবের টেবিলে রাখা একটি সাদা খাম চোখে পড়ল।
খামের ওপর লেখা,
> "তোমরা রক্ত খুঁজছ। আমরা খুঁজছি স্মৃতি।"
মেহেদী খাম খুলল।
ভেতরে মাত্র একটি পুরোনো সাদাকালো ছবি।
ছবিতে প্রায় পনেরো বছরের এক কিশোর।
ছবির পেছনে লেখা—
> "এটাই প্রথম মানুষ, যার স্মৃতি আমরা সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছিলাম।"
নিচে একটি সাল।
১৯৯৮।
মেহেদী ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো...
এই ছেলেটার মুখ কোথায় যেন আগে দেখেছে।
কিন্তু কোথায়?
ঠিক তখনই তার চোখ ছবির ডান কোণে গিয়ে থামল।
সেখানে অর্ধেক কাটা একটি মানুষের হাত দেখা যাচ্ছে।
আর সেই হাতে...
ঠিক একই ASTER-এর আংটি।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।