পেশ করছি পরবর্তী পর্ব।
কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৭১: দুই বন্ধুর গল্প
থানার জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে নিস্তব্ধতা।
বৃদ্ধ শিক্ষক ধীরে ধীরে চেয়ারে বসলেন।
তার হাত কাঁপছে।
চোখে বহু বছরের জমে থাকা স্মৃতি।
মেহেদী তার সামনে বসে বলল,
"সবকিছু শুরু থেকে বলুন।"
---
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"তোমাদের দুজনকে পুরো গ্রাম চিনত।"
"তুমি আর রুদ্র..."
"সব সময় একসঙ্গে থাকতে।"
---
"আমরা কি ভাই ছিলাম?"
---
"না।"
"রক্তের সম্পর্ক ছিল না।"
"কিন্তু তোমাদের বন্ধুত্ব..."
"...অনেক আপন ভাইয়ের চেয়েও গভীর ছিল।"
---
বৃদ্ধ টেবিলের ওপর একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি রাখলেন।
ছবিতে দুটি কিশোর।
একজনের গলায় গোল লকেট।
অন্যজনের গলায় একই রকম লকেট।
দুজনের মুখে হাসি।
পেছনে একটি বিশাল বটগাছ।
---
মেহেদী ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ তার মাথার ভেতর যেন ঝলক দিয়ে উঠল একটি দৃশ্য।
সে দৌড়াচ্ছে।
তার পাশে আরেকটি ছেলে।
দুজনেই হাসছে।
তারপর...
একটি কালো গাড়ি।
ব্রেকের বিকট শব্দ।
চিৎকার।
সবকিছু আবার অন্ধকার।
---
মেহেদী কপাল চেপে ধরল।
মিতু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
"তুমি ঠিক আছ?"
---
"আমি..."
"আমি কিছু মনে করতে পারছি।"
---
বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
"সেদিন গ্রামের মেলায় তোমরা গিয়েছিলে।"
"তারপর..."
"...একটি কালো মাইক্রোবাস আসে।"
---
মারুফ তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করলেন,
"আপনি নম্বর দেখেছিলেন?"
---
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
"না।"
"কিন্তু একটি বিষয় আজও ভুলিনি।"
---
"কী?"
---
"গাড়ির দরজায় একটি প্রতীক আঁকা ছিল।"
তিনি কাগজে দ্রুত একটি চিহ্ন আঁকলেন।
একটি বৃত্ত।
তার মাঝখানে আয়নার মতো দুটি সমান্তরাল রেখা।
---
মিতুর মুখ বদলে গেল।
"এটা..."
---
মেহেদীও চিনে ফেলেছে।
একই প্রতীক তারা Project Mirror-এর নথিতে বহুবার দেখেছে।
---
বৃদ্ধ আবার বলতে শুরু করলেন।
"গ্রামের সবাই তোমাদের খুঁজেছিল।"
"তিন দিন পর..."
"...শুধু একজনকে পাওয়া গেল।"
---
"আমাকে?"
---
"হ্যাঁ।"
"তোমাকে জঙ্গলের পাশে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়।"
"কিন্তু রুদ্রকে..."
"...আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।"
---
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।
মেহেদীর চোখে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত উপলব্ধি ফুটে উঠল।
"অর্থাৎ..."
"আমরা দুজনই অপহৃত হয়েছিলাম।"
---
ঠিক তখনই রাশেদ ল্যাব থেকে নতুন তথ্য নিয়ে দৌড়ে এল।
"স্যার!"
"পুরোনো ছবিটার পেছনে লেখা আছে কিছু।"
---
ছবিটি উল্টে দেখা হলো।
মলিন কালি দিয়ে লেখা।
«'মেহেদী আর রুদ্র।'»
«'যে আগে হারিয়ে যাবে, অন্যজন তাকে খুঁজে বের করবে।'»
তার নিচে শিশুসুলভ দুটি স্বাক্ষর।
একটি কাঁপা হাতে লেখা...
মেহেদী।
অন্যটি...
রুদ্র।
---
মেহেদীর হাত কাঁপতে শুরু করল।
সে ফিসফিস করে বলল,
"আমি..."
"আমি তাকে খুঁজে বের করার কথা দিয়েছিলাম।"
---
ঠিক সেই মুহূর্তে থানার সব মনিটর একসঙ্গে জ্বলে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল রুদ্রের মুখ।
এবার প্রথমবার...
তার মুখে কোনো মুখোশ নেই।
চোখে ক্লান্তি।
অদ্ভুত বিষণ্নতা।
সে সরাসরি মেহেদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
«"তুই এখনও কথা রাখিস, মেহেদী।"»
«"আমাকে খুঁজতে এখনও থামিসনি।"»
মেহেদীর বুক কেঁপে উঠল।
রুদ্র আবার বলল,
«"কিন্তু এবার..."»
«"আমাকে বাঁচাতে নয়।"»
সে কয়েক সেকেন্ড থামল।
তার চোখে যেন অনুশোচনার ছায়া।
তারপর খুব ধীরে বলল,
«"আমাকে থামাতে আয়।"»
ভিডিওটি শেষ হয়ে গেল।
ঘরে কেউ কোনো কথা বলল না।
কারণ এবার এই লড়াই শুধু একজন গোয়েন্দা আর একজন অপরাধীর মধ্যে নয়।
এটা দুই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর...
দুই ভিন্ন পথে হাঁটা জীবনের...
অবশ্যম্ভাবী মুখোমুখি হওয়ার শুরু।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।