পর্ব ৯: যে প্রমাণ সত্য ছিল না
ফরেনসিক রিপোর্টটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল মেহেদী।
তার নিজের ডিএনএ...
একজন খুন হওয়া মানুষের নখের নিচে?
ঘরের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এল যে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
মারুফ ধীরে রিপোর্টটা ভাঁজ করলেন। তাঁর চোখে সন্দেহ ছিল না, ছিল উদ্বেগ।
"মেহেদী... আমি জানি তুই এটা করিসনি।"
কিন্তু পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা দুই কনস্টেবল একে অপরের দিকে তাকাল।
সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গেছে।
---
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"রিপোর্টটা আবার দিন।"
সে শেষ লাইন থেকে আবার প্রথম লাইনে পড়তে শুরু করল।
হঠাৎ তার চোখ থেমে গেল মাঝখানের একটি তথ্যের ওপর।
Sample Source: Fingernail Tissue Fragment
সে মাথা তুলল।
"মিতু, একটা প্রশ্ন করি?"
"কর।"
"নখের নিচে পাওয়া কোষ কি সব সময় আক্রমণকারীরই হয়?"
মিতু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"না। অনেক সময় নিজের ত্বকের কোষও থাকতে পারে। আবার অন্য কারও সংস্পর্শ থেকেও আসতে পারে।"
মেহেদীর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
"ঠিক।"
মারুফ বললেন,
"তাহলে?"
"রিপোর্টে শুধু মিল পাওয়া গেছে। কিন্তু এটা লেখা নেই, কোষগুলো কীভাবে সেখানে গেল।"
---
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"কেউ কি ইচ্ছা করে তোর ডিএনএ সেখানে রাখতে পারে?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"মানুষ প্রতিদিন হাজার হাজার ত্বকের কোষ ঝরায়। একটা জামা, একটা চেয়ার, একটা বই... যেখানেই বসি, সেখানেই কোষ থেকে যায়।"
মিতু মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ। এগুলো সংগ্রহ করা অসম্ভব নয়।"
মারুফ গভীরভাবে বললেন,
"অর্থাৎ... কেউ আগেই পরিকল্পনা করেছিল।"
"অনেক আগে থেকেই।"
---
দুপুরে মেহেদী একা বসে নিজের ফাইলটা আবার পড়ছিল।
এবার সে একটি অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করল।
প্রতিটি পর্যবেক্ষণের নিচে একটি সময় লেখা।
Observation Time: 19:42
Observation Time: 16:18
Observation Time: 08:11
সময়গুলো খুব নির্দিষ্ট।
সে কাগজে সবগুলো সময় লিখে ফেলল।
তারপর হঠাৎ বলল,
"এগুলো সময় নয়।"
সৌরভ চমকে উঠল।
"মানে?"
"এগুলো কোড।"
সে সংখ্যাগুলোকে পাশাপাশি সাজাল।
১৯-৪২
১৬-১৮
০৮-১১
তারপর গ্রামের মানচিত্র বের করল।
অবিশ্বাস্যভাবে সংখ্যাগুলো গ্রামের পুরোনো জরিপ মানচিত্রের গ্রিড নম্বরের সঙ্গে মিলে গেল।
শাহীনুর বিস্ময়ে বলল,
"মানে এগুলো লোকেশন?"
"হ্যাঁ।"
---
বিকেলের মধ্যেই তারা ১৯-৪২ নম্বর গ্রিডে পৌঁছে গেল।
জায়গাটা ছিল গ্রামের বহু পুরোনো একটি শুকিয়ে যাওয়া পুকুর।
মাঝখানে কচুরিপানা।
চারদিকে ঝোপঝাড়।
প্রথম দেখায় সাধারণ।
কিন্তু মেহেদী হাঁটু গেড়ে বসে মাটি পরীক্ষা করতে লাগল।
হঠাৎ সে একটা ছোট্ট ধাতব দণ্ড মাটিতে গেঁথে দিল।
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"ওটা কেন?"
"মাটি ফাঁপা কি না দেখছি।"
দণ্ডটা হঠাৎ পুরোটা নিচে ঢুকে গেল।
মাটি ফাঁপা।
---
খনন শুরু হলো।
মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যেই কোদাল কংক্রিটে ঠেকল।
মাটি সরিয়ে দেখা গেল গোলাকার লোহার ঢাকনা।
ঢাকনায় সতর্কবার্তা লেখা।
AUTHORIZED PERSONNEL ONLY
মারুফ ফিসফিস করে বললেন,
"এটা গ্রামের জিনিস না।"
ঢাকনা খুলতেই নিচে লোহার সিঁড়ি।
আরও একটি গোপন স্থাপনা।
---
নিচে নেমে সবাই স্তব্ধ।
এটা আগের ল্যাবের চেয়েও বড়।
দেয়ালজুড়ে কম্পিউটার।
অসংখ্য সার্ভার।
বিভিন্ন মনিটরে গ্রামের বিভিন্ন জায়গার ভিডিও।
মিতু অবিশ্বাসের গলায় বলল,
"এরা পুরো গ্রামকে নজরদারিতে রেখেছিল!"
সৌরভ দ্রুত একটি কম্পিউটার চালু করল।
স্ক্রিনে শত শত ফোল্ডার।
প্রতিটি মানুষের নামে আলাদা ডেটা।
হৃদস্পন্দন।
ঘুমের সময়।
চলাফেরার অভ্যাস।
ভয়ের প্রতিক্রিয়া।
সবকিছু।
মেহেদীর গলা শুকিয়ে গেল।
"এটা শুধু খুনের পরিকল্পনা নয়..."
"...এটা মানুষের আচরণ নিয়ে গবেষণা।"
---
হঠাৎ একটি মনিটর নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই বিকৃত কণ্ঠের মানুষটি।
এই প্রথম তার মুখ দেখা গেল।
কিন্তু মুখের অর্ধেক অংশ অন্ধকারে ঢাকা।
সে ধীরে ধীরে বলল,
"অভিনন্দন, মেহেদী।"
"তুমি আমার দ্বিতীয় ল্যাবও খুঁজে পেয়েছ।"
মেহেদী ঠান্ডা গলায় বলল,
"তুমি কে?"
লোকটি হেসে উঠল।
"তুমি এখনও নাম খুঁজছ?"
"আমি তো অনেক আগেই তোমাকে খুঁজে পেয়েছি।"
সে স্ক্রিনে একটি বোতাম চাপল।
হঠাৎ চারপাশের সব মনিটরে একসঙ্গে শত শত ভিডিও চলতে শুরু করল।
প্রতিটি ভিডিওতে...
মেহেদী।
শৈশব।
স্কুল।
বিজ্ঞান মেলা।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা।
মারুফের সঙ্গে থানায় যাওয়া।
সব।
একটি ভিডিওতে তো মেহেদী মাত্র দশ বছরের।
তার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি পার্কে হাঁটছে।
মেহেদীর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
"অসম্ভব..."
লোকটি এবার শান্ত স্বরে বলল,
"তোমার ধারণা, আমি এক বছর ধরে তোমাকে দেখছি।"
"না, মেহেদী।"
"আমি তোমাকে দেখছি..."
সে কয়েক সেকেন্ড থামল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"...তোমার জন্মের পর থেকেই।"
ঘরের সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে মারুফের ফোন বেজে উঠল।
ওপাশ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এল।
"স্যার! আরেকটা লাশ পাওয়া গেছে!"
মারুফ দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন,
"কোথায়?"
উত্তর শুনে তাঁর মুখের রক্ত সরে গেল।
তিনি ধীরে ধীরে মেহেদীর দিকে তাকালেন।
"লাশটা..."
"...তোর নিজের বাড়ির পেছনে পাওয়া গেছে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।